
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। দুই দেশের জনগণই এ সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি। আর সংবেদনশীলতা ও পারস্পরিক স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চান দুই দেশের নেতারা।
গত সোমবার বিকেলে নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ভারত সফররত বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে এসব কথা বলেন বিক্রম মিশ্রি। অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ঢাকা-দিল্লির ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, বাণিজ্য বিনিয়োগ, পানি বণ্টন, জ্বালানি, সীমান্ত সমস্যাসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি সার্ক, বিমসটেকসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা মন্তব্য করেন।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের ৪০টিরও বেশি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। গত দেড় বছরে (অন্তর্বর্তী সরকারের আমল) স্থবির হয়ে পড়া প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোকে ভারত পুনরুজ্জীবিত করে সেগুলোকে ধীরে ধীরে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। এটি চলমান রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে একটি সতর্ক, কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগের ইঙ্গিত।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, গত দেড় বছরে গতি হারানো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের ‘সাধারণ বোঝাপড়া’ রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে যোগাযোগ হয়েছে এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ সময় আওয়ামী লীগ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি বলেন, অতীতে আমরা আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি। বাংলাদেশে যখন যে সরকার থাকবে, আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করব। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সব পদক্ষেপ যে বাংলাদেশের সব জনগণকে সন্তুষ্ট করেছে, তা আমরা মনে করি না। তবে এটা স্পস্ট করেই বলি, অতীতে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কোনো ধরনের সমর্থন বা সহযোগিতা করেনি ভারত।
বিক্রম মিশ্রি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির ইস্যু দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিটি ফলপ্রসূভাবে কাজ করেছে এবং বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা হবে।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জানান, দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে এবং পানি খাতে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গঙ্গা, তিস্তাসহ পানি বণ্টনের বিষয়গুলো নিয়ে যৌথ নদী কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি সংস্থার বৈঠক শিগগির অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এখনো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে আছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি আনতে পারে কি না—জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, এ বিষয়ে আমি আগে থেকে অনুমান করতে চাই না। তবে এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন উদ্যোগ আর সার্ককে পুরোদমে সক্রিয় করার বিষয়টি নিয়ে ভারতের ভাবনা কী—জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, সার্ককে ফলপ্রসূ করতে অতীতে আমরা অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। কিন্তু আশানুরূপ কোনো ফল আসেনি। একটি দেশ এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটানোয় সার্ক স্থবির হয়ে পড়েছে। কাজেই যে দেশটি অতীতে এখানে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করেছে, তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে, এটা বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। এমন প্রেক্ষাপটে আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিমসটেক নিয়ে আশাবাদী। আর বাংলাদেশ যখন এ মুহূর্তে বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে, এখানে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা দেখি।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি দৃশ্যমান। দুই দেশের সম্পর্কের এ পরিবর্তনকে ভারত কীভাবে দেখে জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, সেটা আমার বলার কথা নয়। এটা বাংলাদেশই ঠিক করবে। আমি শুধু এটুকু বলব, কোনো নেতিবাচক পদক্ষেপ যেন আমাদের দুই দেশের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে ব্যাহত না করে, সে বিষয়টিতে আমার গুরুত্ব থাকবে।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জানান, ভারতে বৈধ কাগজপত্র না থাকার কারণে বিদ্যমান একটি প্রক্রিয়ার আওতায় লোকজনকে ফেরত পাঠানো হয়ে থাকে। সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ভারতে অবস্থানরত সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বেশ কিছু লোকজনের জাতীয়তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে প্রায় তিন হাজার লোকের জাতীয়তা যাচাইয়ের বিষয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। গত পাঁচ বছরে প্রায় তিন হাজারটি এমন মামলা এখনো যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য পুরোদমে ভারতীয় ভিসা চালুর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ জানাননি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব। তবে বিষয়টি দ্রুত সুরাহার জন্য ভারত পুরোদমে কাজ করছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল এবং বিএম বিভাগের (বাংলাদেশ মিয়ানমার বিভাগ) যুগ্ম সচিব বি শ্যাম মতবিনিময়ের সময় উপস্থিত ছিলেন।












































