প্রচ্ছদ জাতীয় ভারতে খোলা পরিবেশে ঈদের নামাজ পড়তে পারবেন না মুসলিমরা!

ভারতে খোলা পরিবেশে ঈদের নামাজ পড়তে পারবেন না মুসলিমরা!

ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি ছোট মসজিদের ভেতরে ঈদুল আজহার নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করতে জড়ো হয়েছেন মুসলিম পুরুষদের একটি দল। বাইরে উত্তপ্ত উত্তর ভারতের তাপদাহ থেকে বাঁচতে ভেতরে সিলিং ফ্যান ঘুরছে, আর প্রায় ৫০ জন মুসল্লি মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। মসজিদটি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

আলোচনাটি কোরবানির পশু বা দানের বিষয়ে নয়, বরং তাদের সামনে থাকা আরও জরুরি বিষয়- রাস্তা, ব্যারিকেড, পুলিশ অনুমতি এবং ঠিক কোথায় ও কীভাবে ঈদের নামাজ আদায় করা হবে তা নিয়ে। এ সময় একজন নির্দেশনা দেন যে, ‘দয়া করে মসজিদের গেটের বাইরে ভিড় করবেন না। মসজিদ পূর্ণ হয়ে গেলে পরবর্তী নামাজের জামাতের জন্য অপেক্ষা করুন। কোনো তর্কে যাবেন না। ভিডিও করবেন না। উসকানির জবাব দেবেন না।’

উপস্থিত মুসল্লিরা নীরবে মাথা নাড়েন। কেউ কেউ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আসা স্থানীয় পুলিশ নির্দেশনা দেখছেন, যেখানে মুসলমানদের প্রকাশ্যে নামাজ না পড়ার অনুরোধ করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা শুনে কয়েকজন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকান।

মালিয়ানার একটি ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৭ সালের মে মাসে এখানে ৭২ জন মুসলমানকে স্থানীয় হিন্দু জনতা ও রাজ্য সরকারের প্রাদেশিক সশস্ত্র কনস্ট্যাবুলারির (পিএসি) সদস্যরা নৃশংসভাবে হত্যা করে। ৩৬ বছর ধরে বিচার চলার পর ২০২৩ সালে আদালত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের খালাস দেয়। তবে ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক সময়ের।

‘মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভীত’
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ডানপন্থি হিন্দু সংগঠনগুলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শুক্রবার বা ধর্মীয় উৎসবে প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে তারা। তাদের দাবি, এটি একটি শক্তি প্রদর্শন।

এই সংগঠনগুলো এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির কিছু নেতাও রাস্তা, পার্ক বা খালি জায়গায় নামাজে বাধা দিয়েছে। প্রকাশ্যে নামাজের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন প্রকাশ্যে নামাজ বা উৎসব পালনের অনুমোদন দিয়েও পরে তা বাতিল করেছে। গত সপ্তাহে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সারা ভারতে রাস্তায় নামাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। তবে মুসলমানদের মতে, বাস্তবতা ভিন্ন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মসজিদ বা ঈদগাহ অনেক সময় বড় জমায়েত ধারণ করতে পারে না।

ঈদুল আযহার আগের দিন মুসলমানদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো, তারা কোনো রকম কড়া নজরদারি, সংঘাত বা জনরোষের শিকার না হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ পড়ার অনুমতি পাবেন কি না; বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত উত্তর প্রদেশে? রাজ্যটির জনসংখ্যা প্রায় প্রতিবেশী পাকিস্তানের সমান এবং সেখানে প্রায় কোটি ৯০ লাখ মুসলমানের বাস, যা সৌদি আরবের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।

২০১৭ সাল থেকে যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে থাকা উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষের জন্য পরিচিত। বিশেষ করে যোগীর শাসনামলের পুরো সময়েই রাস্তা ও খোলা জায়গায় মুসলমানদের নামাজের ওপর দমন-পীড়ন আরও তীব্র করেছে। গত ১৮ মে তিনি বলেন, ‘মুসলমানদের ঈদের নামাজ পালা করে আদায় করা উচিত। যদি তারা শান্তিপূর্ণভাবে মানে, তবে ভালো; না মানলে অন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

মীরাটের এক মুসলিম ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে বলেন, ‘গত বছর খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার জন্য মানুষকে মামলা দেয়া হয়েছে। কোথাও বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্ট যাচাইও বাতিল করা হয়েছে। এসব দেখে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভয় পায়।’

আলিগড় জেলার এক দোকানদার বলেন, ‘একটি খোলা মাঠে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য নামাজ পড়েছিলেন, কিন্তু এরপর পুলিশ মুসল্লিদের তাড়িয়ে দেয়।’

উত্তর প্রদেশের মুসলমানরা বলছেন, ঈদের নামাজের ওপর বিধিনিষেধ এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে সাধারণ ধর্মীয় উৎসবগুলোও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন শহরে মসজিদ কমিটিগুলো নীরবে ঈদের আয়োজন পুনর্বিন্যাস করছে। কিছু মসজিদ জামাতের আকার ছোট করছে। অন্যগুলো মুসল্লিদের ছোট ছোট দলে আসতে বা নামাজের পর দ্রুত চলে যেতে বলছে। লোকজন যাতে অল্প সময়ের জন্যও কাছাকাছি রাস্তায় ভিড় না করে, তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। এখন আর শুধু ঈদের নামাজ কোথায় পড়া হবে তা নয়, বরং ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে প্রকাশ্যে একত্রিত হওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতীয় মুসলিমরা।

মিরাটের একজন বাসিন্দা মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘ঈদকে ক্রমশ সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। লোকেরা নিজেদের দৃশ্যমানতা, চলাচল এবং এমনকি নামাজের মাদুর কোথায় পাতবে, তা নিয়েও চিন্তায় রয়েছে।’

একই জেলার ৩৩ বছর বয়সী দোকানদার আরশাদ বলেন ‘আমরা সামান্য কোনো ভুল হয়ে যাবে কিনা তা নিয়েও ভয় পাচ্ছি। আগে ঈদের সকালগুলো আনন্দময় ছিল। এখন আগের রাত থেকেই এক ধরনের উদ্বেগ থাকে। লোকেরা সারাক্ষণ দেখতে থাকে পুলিশ আসবে কিনা বা কেউ ভিডিও করে অনলাইনে আপলোড করবে কি না।’

অনেক মুসলমানের জন্য, এই ধরনের বিধিনিষেধ এবং লক্ষ্যবস্তু হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব শুধু প্রার্থনার জায়গার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নুমান খান আল জাজিরাকে বলেন, ‘শারীরিকভাবে কিছু না ঘটলেও, মানুষ ভিডিও করা, অনলাইনে লক্ষ্যবস্তু হওয়া, বা কোনো কিছুর জন্য অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে থাকে। অভিভাবকরা তরুণদের মসজিদের বাইরে দাঁড়াতে বারণ করেন কারণ তারা কোনো ঝামেলা চান না।’

পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার একজন ইমাম এই প্রস্তুতিকে ‘ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ঈদ নিয়ে আলোচনার থেকে বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা করতেই বেশি সময় ব্যয় করি। বিতর্ক এড়ানোই আমাদের অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।’

আরেক ইমাম আল জাজিরাকে বলেন, ‘নামাজ কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। এর পরপরই রাস্তাগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়। আগে এটিকে কখনো বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হতো না। এখন এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন সরকারি জায়গা দখল করার চেষ্টা করছে মুসলমানরা।’ এই উদ্বেগ শুধু উত্তর প্রদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লিসহ অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেও জারি করা হয়েছে একই ধরনের আদেশ।

আল জাজিরার সাথে কথা বলা বেশ কয়েকজন মুসলিম বলেছেন, হিজাব পরার অধিকার, হালাল খাবার খাওয়া কিংবা আযান দেয়ার অধিকার নিয়ে বারবার বিতর্কের একটি সম্মিলিত প্রভাব মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি করেছে।

নয়াদিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত ঘনবসতিপূর্ণ উপশহর নয়ডার একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ফয়জান আলী আল জাজিরাকে বলেন, ‘আপনার মনে হতে শুরু করে যে আপনার পরিচয়ের সাথে যুক্ত সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।এমনকি প্রার্থনা করার আগেও আপনাকে দুবার ভাবতে হয়।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, মুসলিমদের প্রকাশ্যে প্রার্থনাকে ঘিরে এই বিতর্ক ভারতে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন, যেখানে মুসলিমদের দৃশ্যমানতাই একটি বিতর্কিত ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা