
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতো কেবিনেটের বাইরে। অর্থাৎ সরকারের ভেতরে আরেকটি সরকার। যাকে ‘কিচেন কেবিনেট’ বলে উল্লেখ করেছেন সেই সরকারের তিন উপদেষ্টা। প্রশ্নে উঠেছে কারা ছিলেন সেই কেবিনেটের সদস্য, যারা অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং যাদের কথায় সরকার চলতো।
এ নিয়ে প্রথম মুখ খোলেন শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। তার মতে, তিনি এই কেবিনেটের বিষয়ে জানতেন না। তবে সেখানে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো হতো। আর মূল কেবিনেটে নেওয়া হতো সাধারণ সিদ্ধান্ত। সর্বশেষ গত ২৫ মে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে একই কথা বলেন তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, এই কেবিনেট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিসহ নীতিনির্ধারণী সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটি তিনি জানতেন না। এর একদিন পর এ বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন আরেক সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে তিনিও এতে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। তাহলে আলোচিত এই কিচেন কেবিনেটে ছিলেন কারা? এ নিয়েও বিশ্লেষণ হচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমি সাধারণভাবে দেখছি, তখনকার অনেক উপদেষ্টা দায় এড়াতে চাচ্ছেন। অথচ ড. ইউনূস তো বলছেন, তিনি টিমওয়ার্ক করেই কাজ করেছেন। আমি মনে করি, তাদের সব কর্মকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে।’’ তাদের কার কী ভূমিকা ছিল, তা আলাদা প্রকাশের দাবি করেন এই নেতা।
কিচেন কেবিনেট কী
‘কিচেন কেবিনেট’ হলো কোনও সরকারের অনানুষ্ঠানিক মন্ত্রী বা উপদেষ্টা, পরামর্শক বা নিকটজন— যারা সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কিংবা নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারাই মূলত সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সরকার তাদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখে। রাষ্ট্রের সংবেদনশীল বিষয়, বা রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকারের প্রধান নির্বাহী কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন কেবিনেটে প্রধান উপদেষ্টার ব্যক্তিগত পছন্দের কিছু উপদেষ্টা ছিলেন বলে জানিয়েছেন সাবেক তিন উপদেষ্টা।
ড. ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন যারা
শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল, মানবাধিকারকর্মী আদিলুর রহমান খান, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন।
এ তালিকায় আরও ছিলেন— বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ, উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার এবং ব্রতী’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মুর্শিদ। পরবর্তীকালে শপথ নেন চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী। আর জুলাই আন্দোলনের প্রতিনিধি হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। অবশ্য নির্বাচনের আগে এই তিনজন পদত্যাগ করেন। আর হাসান আরিফ দায়িত্ব পালনকালেই মারা যান।
কী বলেছিলেন সাবেক দুই উপদেষ্টা
সর্বপ্রথম কিচেন কেবিনেট নিয়ে কথা বলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সব সরকারেরই একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকে, এমন মন্তব্য তিনি শুনেছেন। তবে সেখানে কারা ছিলেন, তা তিনি জানেন না।
বলেন, এমন কিছু সিদ্ধান্ত হতো যা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জানানো হতো সাধারণ বিষয়ে। হয়তো ওই মনোভাবের লোক আমি ছিলাম না। তারা ধরে নিয়েছেন, আমি তাদের সঙ্গে একমত হতে পারবো না। যারা এসব করেছেন, তারা পরিচিত। আমি শুধু নাম শুনেছি। তারা আমার সহকর্মী ছিলেন।
একই বিষয়ে গত ২৫ মে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে এ নিয়ে কথা বলেন আরেক সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বড় সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটে হতো না, বরং কেবিনেটের বাইরে আলোচনা হতো। সব সরকারেরই একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকে, তবে সেখানে কারা ছিলেন তা তিনি জানেন না।
তিনি আরও জানান, কিচেন কেবিনেটের একটা বৈঠকে তাকে যেতে হয়েছিল, যমুনাতে। পরে জানতে পারেন প্রতি মঙ্গলবার তারা বসেন। সিদ্ধান্ত নেয় কেউ কেউ, এ ধরনের কথাবার্তা শোনা যেতো। আমার কানেও আসতো। কিন্তু এর বাইরে আসলে আমার জানা ছিল না যে, এ রকম একেবারে একটা গ্রুপ আছে, যারা নিয়মিত বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
দুই সাবেক উপদেষ্টার পর অনেকে এ নিয়ে আঙুল তোলেন প্রভাবশালী আরও তিন উপদেষ্টার দিকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, এই কেবিনেটে যুক্তরা হলেন— আসিফ নজরুল ইসলাম, রিজওয়ানা হাসান ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এর বাইরেও আরও চার জনের কথা জানায় সূত্রটি।
তবে আলোচনায় নাম আসা তিন জনের মধ্যে প্রথমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। মঙ্গলবার (২৬ মে) এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলীয় সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, কিচেন কেবিনেটের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। এ সময়
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে নিজের সংশ্লিষ্টতাও অস্বীকার করেন আসিফ। তিনি এ জন্য তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে দায়ী করেন।
সাবেক এই উপদেষ্টার দাবি, চুক্তির বিষয়ে এনসিপির সঙ্গেও কোনও আলোচনা হয়নি। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী (তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা) খলিলুর রহমান বিএনপির পরামর্শে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর দায় চাপিয়েছে। এ চুক্তি তারেক রহমান করিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিচেন কেবিনেট নিয়ে কতিপয় সাবেক উপদেষ্টার মন্তব্য ‘ঠাকুর ঘরে কেরে আমি কলা খাই না।’ তারা একে অপরে দায়মুক্তি নিতে চান। আমার মনে হয়, কয়েকদিন পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসও এ নিয়ে বলবেন তিনি কিছু জানেন না। আমরা মনে করি, এত কিছুর দরকার নেই। বরং সে সরকারের কে কী করেছেন তা আলাদা আলাদা করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক। তাহলেই বোঝা যাবে, আসলে দেশবিরোধী চুক্তি বা লুটপাটের সঙ্গে কারা সম্পৃক্ত ছিলেন।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের পরিচালক মাহবুব আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে কিচেন কেবিনেটে সম্পৃক্ত অনেকের নাম আসছে। এটি তদন্ত হতে পারে। তবে আসিফ মাহমুদের নাম সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর ব্যাখ্যা তিনি নিজেও দিয়েছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, যাদের বিরুদ্ধে কিচেন কেবিনেটে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত করা যেতে পারে।













































