প্রচ্ছদ আন্তর্জাতিক দালালদের ৪৮ লাখ টাকা দিয়েও বাঁচলেন না তছির

দালালদের ৪৮ লাখ টাকা দিয়েও বাঁচলেন না তছির

দালালদের ৪৮ লাখ টাকা দিয়েও বাঁচলেন না তছির

লিবিয়ায় নির্যাতনে মৃত্যু

রাশেদ কামাল, মাদারীপুর

লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের নির্যাতনে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার তছির ফকির (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যুর খবর এলে পুরো বাড়িতে কান্নার রোল ওঠে। স্বজনদের অভিযোগ, তছিরকে ছাড়াতে দালালদের হাতে কয়েক দফায় ৪৮ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু দালালরা সেই টাকা নিয়ে লাপাত্তা। তারা টাকা নিয়েও ছেলেটিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

এ ঘটনায় দালাল চক্রের সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন তছিরের স্বজনরা। এদিকে তছিরের মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পরই মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য রফিকুল ইসলাম বাঘা ও তার পরিবারের লোকজন এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।

তছিরের পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত তছির ঘোষালকান্দি গ্রামের কালু ফকিরের ছেলে। তিন মেয়ে, স্ত্রী, বাবা-মাসহ সাত সদস্যের সংসার তার। টেকেরহাট বন্দরের বাস কাউন্টার এলাকায় চায়ের দোকান দিয়ে কোনোমতে চলত সংসার। পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তছির। মাত্র এক মাসের মধ্যে ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখায় পার্শ্ববর্তী পূর্ব স্বরমঙ্গল গ্রামের মানব পাচারকারী চক্রের দালাল রফিকুল ইসলাম বাঘা। চুক্তি অনুযায়ী সুদে ও জমি বিক্রি করে আনা ২৫ লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দেয় তছিরের পরিবার। আট মাস আগে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন তিনি। পরে তছিরকে পাঠানো হয় লিবিয়া। সেখানে মাফিয়াদের বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে আরও ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় দালাল রফিকুল। নির্মম নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তছিরকে লিবিয়ার একটি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি রাখা হয়। এরপর চিকিৎসার কথা বলে আরও ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেয় দালাল চক্র। কিন্তু নির্যাতনে তছিরের মৃত্যু হয়। পরে লাশ গুম করার জন্য ‘গেম ঘরে’ নিয়ে যায় মানব পাচারকারীরা। অথচ, গত ১০ মে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভূমধ্যসাগর পথে ইতালি পাঠানোর জন্য ‘গেম’ দেওয়ার কথা বলে আরও ১৪ লাখ টাকা দাবি করে লিবিয়ায় অবস্থানরত দালালরা। এরই মধ্যে মঙ্গলবার রাতে লিবিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি সহচররা তছিরের মৃত্যুর খবরটি তার বাড়িতে জানায়।

নিহত তছিরের স্ত্রী ইসমত আরা বেগমের কান্না যেন থামছেই না। তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। সংবিৎ ফিরলেই বলছিলেন, ‘শেষ সম্বল জায়গা-জমি বিক্রি করে দিয়েছি। আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে আরও প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ধার করে দালালের হাতে দিয়েছি। ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়া নিয়ে আটকে রেখে কয়েক ধাপে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা নিয়েছি দালাল রফিক। কিন্তু মারধর করে মেরে ফেলল। এখন আমার সব শেষ। কীভাবে দেনা পরিশোধ করব, আর কীভাবে মেয়েদের নিয়ে বাঁচব!’

দালালদের কঠোর বিচার দাবি চেয়ে ইসমত আরা বলেন, ‘সরকারের কাছে দাবি আমার স্বামীর লাশটি যেন দেশে ফিরিয়ে এনে দেয়।’

তছিরের ছোট ভাই শাহীন ফকির বলেন, ‘মৃত্যুর খবর পেয়ে দালাল রফিকুলের বাড়ি গিয়ে কাউকে পাইনি। তারা আগেই পালিয়ে গেছে। আমার ভাইকে শেষবারের মতো একবার দেখতে চাই। তার লাশটি যেন সরকার দেশে আনার ব্যবস্থা করে দেয়।’

বাবা কালু ফকির কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘যে বয়সে ছেলেরা আমার কবরে মাটি দেওয়ার কথা, সেই বয়সে ছেলের মৃত্যুর খবর শুনতে হয়। আমার ছেলেটাকে দেশে ফিরিয়ে দেন। একবার ওর মুখটা দেখতে চাই। অন্তত কবরে যেন মাটি দিতে পারি, সরকারের কাছে আমার দাবি এটাই। আর কিছু চাওয়ার নেই।’

রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুল হক বলেন, ‘লিবিয়ায় নির্যাতনে এক যুবকের মৃত্যুর খবর এরই মধ্যে অবগত হয়েছি। তবে এখনো নিহতের পরিবার থেকে কোনো লিখিত আবেদন পাইনি। আবেদন পেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করে লাশটি দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সহযোগিতা করা হবে। এ ছাড়া দালালদের বিরুদ্ধে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইউএনও পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালি যাওয়ার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। এ পথ থেকে সরে আসতে হবে।’ প্রশিক্ষণ নিয়ে বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।