
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ঘিরে আদালত অঙ্গনে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি, জামায়াত এবং আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবীদের বাধার মুখে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, ফরম জমা দিলেও কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ’। সবমিলিয়ে ঐতিহ্যবাহী এ সমিতির নির্বাচন নিয়ে আদালত এলাকায় চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীরা অন্য কাউকে ভোটে অংশ নিতে দেননি। সেবার সমঝোতার ভিত্তিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৪টি পদ পায় বিএনপি-সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। অন্যদিকে, সহ-সভাপতি ও সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ ৭টি পদ পায় জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীরা।
তবে, এবার সেই সমীকরণে ফাটল ধরেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি এবার জামায়াতকেও কোনো ছাড় দিতে নারাজ।
এবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কিংবা স্বতন্ত্র কোনো আইনজীবীকে মনোনয়নপত্র তুলতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধুমাত্র বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীরাই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তবে, মনোনয়নপত্র জমা দিলেও জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীদের আশঙ্কা, তাদের বেশিরভাগ প্রার্থীর মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৫ মে বৈধ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও ৬ মে দুপুর পর্যন্ত তা প্রকাশ করা হয়নি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার (৬ মে) বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ’। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুল আলম। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা হারিয়ে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দিতে কাজ করছে। এতে সমিতির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সময় তাদের প্রার্থীরা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। অনেককে কমিশন কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি এবং বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী ৫ মে বিকেল ৫টার মধ্যে বৈধ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, নির্বাচন আয়োজন না করে আপসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে রাজি না হওয়ায় তাদের প্রার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ ও প্রশাসন ব্যবহার করে হয়রানির আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়। সার্বিক পরিস্থিতিতে এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে তা বর্জনের ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। একই সঙ্গে বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে নিরপেক্ষ কমিশনের অধীনে দুই মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচনের দাবি জানানো হয়।
সূত্র জানায়, ১ মে নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। নির্ধারিত দিন সোমবার (৪ মে) মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে গেলে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের বাধার মুখে পড়েন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও বাম ঘরানার বিভিন্ন প্যানেলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার বিকেল ৩টার দিকে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবদুর রশিদের নেতৃত্বে একদল আইনজীবী বার লাইব্রেরিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় প্রবেশমুখে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের বাধার মুখে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও হট্টগোল সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা লাইব্রেরির দরজা বন্ধ করে দেন।
কিছু আইনজীবীর অভিযোগ, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জমা দেওয়ার সময় তা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সমিতির সাবেক এজিএস অ্যাডভোকেট রাসেল বলেন, নির্ধারিত সময়ে ফরম নিতে গেলে বিএনপি-সমর্থিত প্যানেলের অ্যাডভোকেট তারেক ও হাসান আলীর নেতৃত্বে থাকা আইনজীবীরা তাকে ঢুকতে দেননি। পরে তিনি এক জুনিয়রের মাধ্যমে অন্য নামে ৬০ হাজার টাকা জমা দিয়ে একটি ফরম সংগ্রহ করেন। কিন্তু জমা দিতে গেলে সেটি ছিঁড়ে ফেলা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় থেকে অনেক প্রার্থীকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয় এবং তার জামা ছিঁড়ে ফেলা হয়। বিএনপি-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা লাইব্রেরি দখল করে থাকলেও নির্বাচন কমিশন কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি।
আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী আবদুর রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গতবার বিএনপি ও জামায়াত ভাগাভাগি করেছিল। এবার জামায়াতও ছাড় পাচ্ছে না। তারা (জামায়াত) এখন আমাদের সঙ্গী হয়েছে। এবার মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য গেলে আমাদের বার লাইব্রেরিতে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়। ফলে আমরা মনোনয়নপত্র নিতে পারিনি। আমরা সাধারণ আইনজীবী হিসেবেই নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছিলাম। যেহেতু সুযোগ দেওয়া হয়নি, তাই আমরা এই ভোটে অংশ নেব না। আমরা এমনিতে সমিতির কোনো কার্যক্রমে অংশ নিই না। তাদের এমন বিনা ভোটের কার্যক্রমকে ঘৃণা করি।
তবে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আইনজীবী সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপিপন্থী নেতা হাসান আলী। তিনি বলেন, নিষিদ্ধঘোষিত কোনো দলকে বৈধতা দেওয়া রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। নির্বাচন কমিশন নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরাই নির্ধারিত নিয়মে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা ভিন্ন ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন। যেহেতু আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ, তাই তাদের ব্যানারে নির্বাচনের সুযোগ নেই। যারা বাধার অভিযোগ করছেন, তাদের প্রকৃতপক্ষে কোনো নির্বাচনী প্রস্তুতি নেই; তারা বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট রওশন আরার বক্তব্য জানতে কল করা হলে তিনি ‘মিটিংয়ে আছেন’ জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সমিতি এখন মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ভ্রাতৃত্বের পরিবর্তে হানাহানি এবং গণতন্ত্রের পরিবর্তে জবরদস্তি ও দখলবাজির দিকে চলে গেছে। আইনজীবীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা, পেশার মান উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই সমিতি গঠিত হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে যা ঘটছে তা সেই লক্ষ্য ও চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, ২১টি পদের বিপরীতে বিএনপি-সমর্থিত প্যানেল সব কটি পদে এবং জামায়াত-সমর্থিত প্যানেল সাধারণ সম্পাদক পদ ছাড়া ২০টি পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২১ মে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ৬ মে আপত্তি শুনানি, ৮ মে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার এবং ৯ মে চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।












































