প্রচ্ছদ জাতীয় দেড় লাখ টাকা বেতনের রাজিয়া রহমান কীভাবে ১০ কোটি টাকার ঋণ দেন?

দেড় লাখ টাকা বেতনের রাজিয়া রহমান কীভাবে ১০ কোটি টাকার ঋণ দেন?

সবাই অবাক হয়ে ভাবছেন কি ব্যাপার জনকণ্ঠ কি নিজেদের বিরুদ্ধে লেখা শুরু করল নাকি! আসলে আজ একটু নিজেদের আত্মসমালোচনা নিয়ে বসেছি। বিগত ২-৩ দিন ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কান পাতলেই একটি কথা শোনা যাচ্ছে, গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের চেয়ারম্যান শামীমা আতিকুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি। তাই ভাবলাম এসব সংবাদমাধ্যমের সহকর্মীদের সঙ্গে আমরাও একটু সহযোগিতামূলক আচরণ প্রদর্শন করি। সমালোচনা শুরু করা যাক।

সমালোচনা শুরু করার আগে আমরা প্রেক্ষাপট জেনে নেই, রাজিয়া রহমান বৃষ্টি হচ্ছেন গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের বেতনভুক্ত একজন সাবেক কর্মচারী। তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের চেয়ারম্যান শামীমা আতিকুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার চেক ডিসঅনারের একটি মামলা করেন। সেই মামলার নথিতে বলা হয়, শামীমা আতিকুল্লাহ খান নাকি তার কর্মচারী রাজিয়া রহমান বৃষ্টির কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। সেই ঋণ পরিশোধ করার জন্য শামীমা আতিকুল্লাহ খান ১০ কোটি টাকার একটি চেক রাজিয়া রহমান বৃষ্টিকে দিয়েছিলেনে, আর সেই চেক ডিসঅনার হয়েছে। তাই তিনি মামলা করেছেন। এমনকি সেই মামলায় শামীমা আতিকুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।

এবার একটু পেছনের কথায় আসা যাক। রাজিয়া রহমান বৃষ্টি শামীমা আতিকুল্লা খানের ৫৫ বছরের পুরনো বান্ধবীর মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টিকে মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। বৃষ্টির ডিভোর্সের পর থেকে টাকা পয়সার সমস্যা হওয়ার কারণে তিনি মাঝে মাঝেই তাকে সহায়তা করতেন। তবে ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে রাজিয়া রহমান বৃষ্টির পরিচালিত প্রতিজ্ঞা ফাউন্ডেশন বন্ধ হয়ে যায় অথবা আমরা বলতে পারি সে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। প্রতিজ্ঞা ফাউন্ডেশন সে কেন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল, তার যথোপযুক্ত প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। সময়মতো সেগুলো আমরা উপস্থাপন করব। যেহেতু বৃষ্টি ৩ সন্তাসহ ডিভোর্সি ছিল তাই ফাউন্ডেশনটি বন্ধ হবার পরে সে সংসার চালাতে পারছিল না।

এমনকি বৃষ্টির বাসায় বাজার করার টাকাও ছিল না। বাসায় বিদ্যুৎ বিল এত বাকি পড়ে গিয়েছিল যে, বিদ্যুতের লাইন কেটে দিতে চলে এসেছিল। তখন এই বৃষ্টি নিজের সংসার চালাতে শামীমা আতিকুল্লাহ খানের কাছে ছুটে আসে যাকাতের টাকা চাইতে, যা দিয়ে সে কোনোভাবে তার সংসার চালাতে পারবে।

প্রথম দিকে শামীমা আতিকুল্লাহ খান তাকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে দেয়া শুরু করে। পরবর্তীতে বৃষ্টির সম্মানের কথা চিন্তা করে উনি বৃষ্টিকে গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারে বিজনেস হেড হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন, যার মাসিক বেতন ছিল প্রথমে দেড় লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে ২ লাখ টাকা। চাকরি থাকাকালেই বৃষ্টি জনকণ্ঠকে কোনোরকম ইনফরমেশন না দিয়ে অন্য অফিসে কনসালট্যান্সির কিছু কাজ করতেন। গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের একজন ফুলটাইম কর্মচারী হওয়ায় যেটি ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি একটি কাজ। যাক এসব বাদ দিয়ে এবার কিছু পয়েন্টে আসা যাক।

এক. ২০২৪ সালে রাজিয়া রহমান বৃষ্টি সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিল, টাকার জন্য রিকশায় করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে, এমনকি যার বনানীর ফ্ল্যাটটি পর্যন্ত ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ রাখা ছিল- সে নাকি শামীম আতিকুল্লা খানের কাছে ২ বছর পরেই ১০ কোটি টাকা পাবে। ধরা যাক ২০২৪ থেকে যতদিন পর্যন্ত তিনি গ্লোব জনকণ্ঠে কর্মরত ছিলেন, তিনি মোট মাসিক বেতন হিসাবে ২২ লাখ টাকা পেয়েছেন। পাশাপাশি ধরে নিলাম কনসালট্যান্সি করে প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা আয় করেছেন।

দুই. তাহলে জনকণ্ঠ থেকে ২২ লাখ ও দুই বছরে কনসালট্যান্সি করে ৪৮ লাখ টাকা আয় করে থাকতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে ৭০ লাখ টাকা। এখানে কিন্তু আমরা তার মাসিক কোনো খরচের হিসাব দেইনি। ধরে নিলাম তিনি কোনো টাকাই খরচ করেনি খাওয়া-দাওয়াও করেননি, বাচ্চাদের স্কুলের বেতনও দিতে হয়নি, পুরোটাই তিনি ব্যাংকে জমিয়েছেন। তাহলে রাজিয়া রহমান বৃষ্টি গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের চেয়ারম্যান শামীমা এ খানকে ১০ কোটি টাকা ঋণ দিলেন কী করে। প্রশ্ন জাগে না, অবশ্যই জাগে! প্রশ্ন হচ্ছে, এই ১০ কোটি টাকা বৃষ্টি কোথায় পেলেন! বাংলাদেশের ব্যাংকে কি হঠাৎ করে ইন্টারেস্ট রেট অনেক বৃদ্ধি পেয়ে গেছে? যাতে করে বৃষ্টির জমানো ৭০ লাখ (কাল্পনিক) টাকা দুই বছরে বুলেট ট্রেনের গতিতে ১০ কোটি হয়ে যাচ্ছে!

তিন. অন্যদিকে বৃষ্টির দ্বিতীয় স্বামী মো. মেজবাহ উদ্দিন, যার সঙ্গে ২০২৫ সালের শেষের দিকে ঢাকার নামিদামি পাঁচ তারকা হোটেলে চারটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। একটি কথা বলাই বাহুল্য মেজবাহ উদ্দিনেরও এটি দ্বিতীয় বিয়ে ছিল, তার আগের সংসারে দুটি সন্তান আছে। তাদের দায়িত্ব কিছুটা হলেও মেজবাহ উদ্দিনকে নিতে হয়। প্রাপ্ত তথ্য মতে, মেজবাহ উদ্দীনের মাসিক বেতন ছিল ৫ লাখ টাকার কাছাকাছি। একজন দেড় লাখ আরেকজন ৫ লাখ টাকা মাসিক বেতনের দুজন কর্মচারী ২ কোটি টাকার কাবিন এবং ৫ তারকা হোটেলে ৪টি অনুষ্ঠান সম্পাদন করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অর্থ খরচ করে তাদের দ্বিতীয় বিয়ের সম্পাদন করেন। বিয়ের পোশাক এবং জুয়েলারিও কিন্তু এসেছিল দেশের বাইরে নামি-দামি ব্র্যান্ড থেকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারা এত টাকা কোথায় পেলেন? এ টাকার উৎস কী? আসল রহস্য এখানে, রহস্য হচ্ছে- রাজিয়া রহমান বৃষ্টি দম্পতি গ্লোব জনকণ্ঠ থেকে ৮০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার পর তাদের এই বিলাসবহুল বিবাহ ও রিসিপশন হয়েছিল।

চার. আমরা কিন্তু এতক্ষণ ধরে যে ১০ কোটি টাকা পাওনার কথা বৃষ্টি বলছেন, সে টাকার উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলাম। সবকিছু বিশ্লেষণ করে মনে হলো বৃষ্টি বোধ হয় রূপকথার আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে পেয়েছিলেন! হয়তো সেখান থেকে জিন বের হয়ে তাকে ১০ কোটি টাকা দিয়েছে। এবং সেই টাকা সে শামীমা আতিকুল্লাহ খানকে ঋণ দিয়েছিলেন। সেই টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য এখন এসব মামলা হামলা হচ্ছে!

এত কথা বলার কারণ হচ্ছে, গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের কাছ থেকে আমাদের পাঠক, আমাদের সংবাদমাধ্যমের সহকর্মী এবং আমাদের আইন ব্যবস্থার কাছে একটি ছোট্ট প্রশ্ন- রাজিয়া রহমান বৃষ্টি যে শামীমা আতিকুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার মামলা করেছেন, আপনারা কি কেউ একবার জানতে চেয়েছেন দেড় লাখ টাকা বেতনের একজন কর্মচারী কোথা থেকে ১০ কোটি টাকা পেল? তার সোর্স অব ইনকামটা কী? তিনি এই কোম্পানির কোনো সাপ্লাইয়ার না, কিংবা তিনি কোম্পানির বিজনেস পার্টনারও না, ছিলেন শুধু একজন সাধারণ কর্মচারী। তাহলে শামীম আতিকুল্লা খানের কাছে তার ১০ কোটি টাকা পাওনা হলো কীভাবে?

গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের চেয়ারম্যান শামীমা আতিকুল্লাহ খান আইন বিভাগকে শুধু একটি প্রশ্ন করেছেন, কীভাবে একজন দেড় লাখ টাকার কর্মচারী তার কাছে ১০ কোটি টাকা পেতে পারেন, এর সুনির্দিষ্ট উৎস কেন আদালত জানতে চাইলেন না? বৃষ্টির এই ১০ কোটি টাকার সোর্স অব ইনকাম কী?

এবার এ প্রশ্নটি আমাদের সব পাঠক, আমাদের সব গ্রাহক এবং আমাদের সব সংবাদমাধ্যমের সহকর্মীদের কাছে দেড় লাখ টাকা বেতনের একজন কর্মচারীর কাছে কোথা থেকে ১০ কোটি টাকা এলো, এ টাকার উৎস কী? এটা কি আপনারা কেউ জানতে চেয়েছেন? আসল কথা জানতে না চেয়ে খবরের ওপর খবর ছাপা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের করা প্রশ্নগুলো একটু নিজেদের জিজ্ঞেস করে দেখুন হয়তো বা আসল উত্তরটি পেয়ে যাবেন!