
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলমের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ দেখা করার ঘটনা আলোচনা তৈরি করেছে।
এমনও আলোচনা ছড়িয়েছে যে আসন্ন মেয়র নির্বাচনে চট্টগ্রাম থেকে মনজুর আলমকে নিজেদের প্রার্থী করতে চায় এনসিপি।
এখন পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত জানান, বাকি সাত সিটি করপোরেশনেও তারা অল্প কিছুদিনের মাঝেই প্রার্থী ঘোষণা করবে। খবর বিবিসি বাংলার।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ে কাজ করছে। তারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনাও করছেন প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে।
যে সাত সিটি করপোরেশনে এখনো প্রার্থী দেওয়া বাকি রয়েছে, তার মাঝে অন্যতম চট্টগ্রাম।
এখন প্রশ্ন হলো, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশস নির্বাচন হলে সেখানে মনজুর আলমকে এনসিপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে যে গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে, তা কতটা সত্যি?
কী হয়েছিলো
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) চট্টগ্রামের কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এই খবর পেয়ে মনজুর আলমের বাসার সামনে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কিছু মানুষ জড়ো হয়।
পরে মনজুর আলমের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় উপস্থিত জনতা হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে ধরে নানা প্রশ্ন করে। তেমন কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তাদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, মনজুর আলম ‘আওয়ামী লীগের দোসর’; হাসনাত আবদুল্লাহ নিজে জুলাই যোদ্ধা, যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কথা বলেছেন; তাহলে তিনি কেন মনজুর আলমের বাসায়, সেটিও জানতে চান তারা হাসনাত আবদুল্লাহর কাছে।
সেখানে ঠিক কী হয়েছিল, জানতে বুধবার (১৬ এপ্রিল) হাসনাত আবদুল্লাহর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
তবে এ বিষয়ে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলম।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামে হাসনাত আবদুল্লাহ সাহেবের একটি প্রোগ্রাম ছিল। হাসনাত চট্টগ্রামে এসে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন দুপুরে। বলেছিলেন আমার বাসায় আসবেন। আমি তাকে দুপুরে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাই।
সাবেক এই মেয়র জানান, বিকাল তিনটার দিকে হাসনাত আবদুল্লাহ তার বাসায় আসেন এবং দুপুরের খাবারও খান।
মনজুর আলম বলেন, এর কিছুক্ষণ পরে লোকাল কিছু ছেলে বাইরে জড়ো হয়েছিল। পরে হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজে গিয়ে তাদের কাছে কথা বলে সাড়ে পাঁচটা ছয়টার দিকে চলে যান।
জড়ো হওয়া ওই ব্যক্তিদের অনেককে মনজুর আলমকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিতে শোনা যায়। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মনজুর আলম বলেন, আমার নামে তো কোনো মামলাও নাই। আমি আওয়ামী লীগও করি না। আমি আওয়ামী লীগের দোসর কোথা থেকে হইলাম?
তিনি বলেন, আমি তো বিএনপির মেয়র ছিলাম। আমি কী আওয়ামী লীগে যোগ দিছিলাম নাকি? আওয়ামী লীগের তো আমি কিছুই ছিলাম না।
মনজুর আলম দাবি করেন, এখানে যারা এসেছিল সবাই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত এবং তাদের সবার বাসা তার বাসা ও আশপাশের এলাকায়,
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের নির্বাচনের পর তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। এখন তিনি সমাজসেবামূলক কাজের সাথে জড়িত।
তিনি কি আগামীতে এনসিপির হয়ে মেয়র নির্বাচন করতে চান?
এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই মেয়র আরও বলেন, মানুষ এটা নিয়ে কানাঘুষা করতেছে। আমি তো কাউকে বলি নাই আমি নির্বাচন করবো।
এ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর সাথেও তার কোনো কথা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
উল্লেখ্য, মনজুর আলম ২০১০ সালে বিএনপির সমর্থন নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালেও তিনি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু ওই বছর তিনি ভোট বর্জন করেছিলেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এরপর তাকে আর বিএনপির রাজনীতিতে দেখা যায়নি এবং পরবর্তীতে দুই দফায় জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন।
এনসিপি যা বলছে
মনজুর আলমকে মেয়র প্রার্থী করা নিয়ে গুঞ্জনের সত্যতা কতটা, কেন-ই বা হাসনাত আবদুল্লাহ তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন- জানতে এনসিপির একাধিক শীর্ষ নেতার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও দলটির উত্তরবঙ্গের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলমের সঙ্গে কথা হয়েছে।
এনসিপি নেতা ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, মনজুর আলমের মনোনয়ন নিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকে আলোচনা করতে পারে, কিন্তু আমাদের ‘দলীয় ফোরামে এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, এমনকি এখনও আলোচনাও হয়নি’।
একই মন্তব্য সারজিস আলমেরও। তার বক্তব্য হলো, মনজুর আলমকে এনসিপির মেয়র প্রার্থী করা হবে, এরকম কোনো আলোচনা আমাদের (দলের) মাঝে হয়নি।
তবে সারজিস আলম ধারণা করছেন, হাসনাত আবদুল্লাহ হয়তো তার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে দেখা করতে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, যতটুকু শুনেছি, দাওয়াত দিয়েছিলো…দলীয় রাজনীতির বাইরেও আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিবর্গের সাথে ব্যক্তিগত একটা জায়গা (সম্পর্ক) থাকে।
সারজিস আরও বলেন, যখন কোনো দলের বা নেতার সমালোচনা করার মতো যৌক্তিক বিষয় আসে, তখন তাদের বা তার যৌক্তিক সমালোচনা করা হলেও, রাজনীতির বাইরেও ওই ব্যক্তির সাথে আলাদা একটা সম্পর্ক থাকে। সেখান থেকেই হয়তো বাসায় দাওয়াতে অংশগ্রহণ করা।
এই এনসিপি নেতা মনে করেন, এই দেখা করা নিয়ে যা হচ্ছে, তা আসন্ন মেয়র নির্বাচনে চট্টগ্রামে বিএনপির যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইচ্ছাকৃতভাবে করছেন।
তার ভাষায়, উনি (মনজুর আলম) তো এবার, বিএনপির রানিং নির্বাচনে প্রচারণায় ছিল…সেখানে বিএনপির মেয়র ডা. শাহাদাৎ-এর সাথে প্রচারণায় ছিল। উনি খালেদা জিয়ার দোয়া মাহফিলে ছিল। বিএনপি নেতা আমির খসরুর সাথে ছিল। সেগুলা নিয়ে তখন ইস্যু হয়নি।
সারজিস ব্যাখ্যা করে বলেন, ওখানে বিএনপির পটেনশিয়াল মেয়র ক্যান্ডিডেটরা তাদের ইনসিকিউরিটির জায়গা থেকে ইন্টেনশনালি এই সিন ক্রিয়েট করেছে…যে ওনার (মনজুর আলম) সাথে হাসনাত আব্দুল্লাহর দেখা হয়েছে ওই উদ্দেশ্যেই (মেয়র নির্বাচন) কি না…উনি (মনজুর আলম) যদি আবার এনসিপির মেয়র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়, তখন তো ওনাদের জেতার চান্স কমে যাবে। তাই সম্ভবত তারা এই ইস্যু ক্রিয়েট করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় সমালোচিত হয়েছিলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক দল এনসিপি, যারা সাধারণত আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরোধিতাই করে থাকে।
কিন্তু একসময় সেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথেই যুক্ত ছিল, এমন একজনের সাথে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের একজনের দেখা করায় দল হিসেবে এনসিপি সমালোচনার মুখে পড়েছে কি না, এই প্রসঙ্গে আখতার হোসেন বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সাথে নীতিগত অবস্থানে আমরা কখনোই কম্প্রোমাইজ করবো না। তাদের বিচার হতে হবে এবং তাদেরকে অবশ্যই তাদের ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ বাতিল করতে হবে। আর ব্যক্তির ক্ষেত্রে নানা আলোচনা থাকতে পারে। আমরা এসব ক্ষেত্রে দেখবো যে তিনি (ব্যক্তি) জনগণের উপরে অন্যায় করেছে কি না। আমরা এ ব্যাপারে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।
একই প্রশ্ন করলে জবাবে সারজিস আলম বলেন, উনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম যে ওনার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জায়গা থেকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে উনি বিএনপির সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, আমি জানি না…হয়তো সেই জায়গা থেকেই হাসনাত আবদুল্লাহ যখন দেখলো যে উনি বিএনপির সাথে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে বা আমির খসরুর সাথে বসে গল্প করছে বা বিএনপির মেয়রের সাথে আড্ডা দিচ্ছে… তাই হয়তো হাসনাত আবদুল্লাহ এটা নিয়ে আর চিন্তা করে নাই যে মাঝখানে একসময় উনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিও করেছে। আর এটা তো তারাই, মানে বিএনপি-ই নরমালাইজ করেছে।
তবে এনসিপির মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনজুর আলমকে এনসিপি বিবেচনায় রেখেছে কি না, এ বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে সারজিস আলম সোজাসাপ্টা কোনো উত্তর দেননি।
তিনি বলেছেন, উনি বিএনপির রাজনীতিও করেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিও করেছেন, সবার সাথে ওনার একটা ভালো সম্পর্ক-বোঝাপড়া আছে, স্থানীয়ভাবেও গ্রহণযোগ্যতা আছে… আমরা মনে করি, ওনার বিরুদ্ধে যদি কোনো প্রমাণিত অপরাধ না থাকে এবং উনি যদি এনসিপির সাথে রাজনীতি করতে চান, ওনার যদি মনে হয় যে উনি ওখানে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন, তাহলে সেটা উনিও হতে পারেন; আমরা সেটা বিবেচনা করবো।
তিনি আরও বলেন, এক্ষেত্রে ওনার বিরুদ্ধে বিএনপি যদি এই পলিসিতে না যায় যে ওনাদের সাথে থাকলে ভালো, আমির খসরু গিয়ে একসাথে মিটিং করবেন; আর ওনাদের সাথে না থাকলে তখন ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হবে, এটা তো রাজনৈতিক জায়গা হতে পারে না।
এদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছেন যে, মনজুর আলমকে মেয়র প্রার্থী করা নিয়ে এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামে ‘কংক্রিট কোনো’ আলোচনা হয়নি, কিন্তু ইনফর্মালি দলের মাঝে এটা নিয়ে আলোচনা চলছে।
প্রার্থী হিসেবে নতুন মুখ খুঁজছে এনসিপি
দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
বাকি তিনটির মাঝে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন থেকে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম, সিলেট থেকে দলটির সিলেট মহানগরের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান আফজাল এবং রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে রাজশাহী মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলীকে প্রার্থী করা হয়েছে।
কিন্তু বাকি সাত সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের জন্য নতুন মুখ খুঁজছে এনসিপি।
এ নিয়ে সারজিস আলম বলেন, আমরা যে জায়গাগুলোতে এখনো মনোনয়ন দেইনি, সেখানে আমরা নতুন মুখ খুঁজছি। কেউ যদি এনসিপির বাইরে থেকে স্বতন্ত্র জায়গা থেকেও আসে, ধরা যাক কেউ বিএনপি থেকে আসতে চাইলো বা ভালো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা আছে, তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধ নেই, খুব স্বাভাবিকভাবে সম্মানের সাথে জীবনযাপন করছে…সেই ধরনের মানুষদের যে কেউ-ই আগ্রহ দেখাতে পারে। আমরাও আমাদের জায়গা থেকে খোঁজার চেষ্টা করছি।
এনসিপি যে যে জায়গায় এখনো মনোনয়ন দেয়নি, সেগুলো হলো- চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ।









































