প্রচ্ছদ জাতীয় বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছি যেন জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না আসতে পারে

বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছি যেন জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না আসতে পারে

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। দেশের বেশ কয়েকটি মাদ্রাসায় বুখারি পড়াচ্ছেন তিনি। জমিয়তের রাজনীতির হালচাল, নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটে না যাওয়া, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব, বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা ও নির্বাচনে একটি আসনও না পাওয়ার কারণ ইত্যাদি বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ

এশিয়া পোস্ট: ১৯৬৬ সাল থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে আছেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কী?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: জমিয়তের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯১৯ সালে। জমিয়তের প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত দেশের যে কোনো পরিস্থিতি এবং যে কোনো অবস্থায় দলকে ধরে রেখেছি। মানুষ রাজনৈতিকভাবে একবার এদিকে যায়, আবার অন্যদিকে দিকে যায়। জমিয়তের নেতাকর্মীদের নিজস্ব আদর্শের ওপর ধরে রেখেছি। এ দেশে যখনই ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ হয়েছে, এর বিরুদ্ধে মাঠে-ময়দানে ছিলাম। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবাদ জানিয়েছি। বিভিন্ন সরকারকে পরামর্শ দিয়েছি। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতকে আমরা লালন করেছি এবং হেফাজত করেছি। রাজনীতি দিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী মুসলিম জাতীয়তাবাদকে লালন করেছি।

এশিয়া পোস্ট: জমিয়ত সবচেয়ে পুরোনো ইসলামপন্থি দলগুলোর একটি। তবু বর্তমান রাজনীতিতে দলটির প্রভাব সীমিত কেন?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতি ছাড়া কোনো কাজ নেই। সাধারণ রাজনীতিবিদরা ২৪ ঘণ্টা রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করেন। আমরা ২৪ ঘণ্টা ইসলামকে লালন ও ধারণ করি। রাজনীতির ময়দানে নিরেট নিরামিষ রাজনীতি করা লোক নয়। আমাদের মূল কাজ হলো, দেড় হাজার বছর থেকে যে ইসলাম চলে আসছে, এই ইসলামের হেফাজত করা। আমরা ছাড়া বিকল্প এমন ধারা নেই, যে ধারায় কোরআন-হাদিস বা ইসলামি শিক্ষাকে লালন করছে। অন্য কোনো রাজনৈতিক দলেরও এমন কোনো প্রোগ্রাম নেই। অন্যান্য দলের যেমন জীবনের উদ্দেশ্য রাজনীতি করা, আমাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য রাজনীতি নয়। আমরা ইসলামকে ধারণ ও রক্ষা করে রাজনীতি করি। আমাদের থেকে বৈপ্লবিক রাজনীতি পাবেন না, যে রকম অন্য দল করতে পারে। এ দেশের মানুষ কালিমা, অজু, গোসল ও নামাজ জানে দেওবন্দি বা কওমি আলেমদের কারণে। কওমি অঙ্গনের মানুষরাই জমিয়ত করে। আগে সবাই করত। এখন অনেকে এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় হয়ে শিক্ষায় ব্যস্ত আছে। রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে শ্রম দিই না আমরা।

এশিয়া পোস্ট: তাহলে কি আপনারা ইসলামের বিপ্লবের জন্য রাজনীতি করেন না?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: রাজনীতি করলে ইসলামি বিপ্লব সাধিত হয় না। যারা মনে করে হয়, এটা তাদের ভুল ধারণা। ইসলামি বিপ্লব আসে স্বচ্ছ আকিদা, স্বচ্ছ চরিত্র, স্বচ্ছ ইবাদত ও মানুষ ইসলামের দিকে ধাবিত হওয়ার মাধ্যমে। মানুষ তার চাহিদা মতো চলবে আর ইসলামি বিপ্লব এসে যাবে, এটা হবে না। স্লোগানের ইসলামি বিপ্লব করি না, এটাকে বিশ্বাসও করি না। স্লোগানে কোনো দিন ইসলাম আসে না। ইসলাম আসে জাতির পরিবর্তনে।

এশিয়া পোস্ট: জমিয়তের রাজনীতি করার মূল লক্ষ্য কী?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: এ দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যারা যখন থাকবে বা এ দেশের প্রশাসনে যারা থাকবে, তাদের মনমানসিকতাকে পরিবর্তনের চেষ্টা করা। শিক্ষা ছেড়ে রাজনীতিতে একবারে চলে যাব, এটা হবে না। রাজনীতি করে দেশ পরিচালনা করা জমিয়তের লক্ষ্য নয়। যারা দেশ চালাচ্ছে, তাদের মধ্যে যেন ইসলামি ভাবাদর্শ থাকে, ইসলামের বিরোধিতা যেন না করে, জাতিকে যেন ইসলামবিরোধী করে গড়ে না তুলে, আমরা তাদের সে বিষয়ে বোঝাব। তাদেরকে ইসলামের ওপর রাখার চেষ্টা করব।

এশিয়া পোস্ট: জমিয়ত থেকে বেরিয়ে অনেক নেতা ও দল তৈরি হয়েছে। এত বিভক্তির মূল কারণ কী?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: মানুষ বাড়ছে, পরিবারও বাড়বে। আওয়ামী লীগের বয়স আর কত, কিন্তু তাদের থেকে বহু দল হলো। বিএনপি থেকে কত দল জন্ম নিল? আমরা তো দেড়শ বছরের পুরোনো দল, এখানে নানা মতের মানুষ আছে, নানা মানসিকতার মানুষ আছে, কেউ ক্ষমতা চায়, কেউ নেতৃত্ব চায়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পর্যায়ে একেকটা দল হয়েছে। কিন্তু জমিয়ত থেকে বের হয়ে বড় দল হয়নি। আমরাই বড় আছি।

এশিয়া পোস্ট: অধিকাংশ ইসলামপন্থি দল ১১ দলীয় জোটে গেলেও জমিয়ত কেন বাইরে থাকল?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: ওই জোটে তো ইসলাম নেই। ওই জোটে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। জামায়াতে ইসলামী একটা সেক্যুলার (ধর্ম নিরপেক্ষ) দল, আওয়ামী লীগ সেক্যুলার দল, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, এনসিপি সেক্যুলার দল, এদের তো ইসলাম নিয়ে কর্মসূচি নেই। জামায়াত সেক্যুলার, কথাও বলে সেক্যুলারিজমের। জামায়াতের মধ্যে দ্বিমুখী নীতি আছে। তারা মানুষের কাছে বলে ইসলাম করবে, কিন্তু ইশতেহারে বলে শরিয়া আইন করবে না, ইসলামি হুকুমত করবে না। জামায়াতের ইসলাম নিয়ে আইডিয়া নেই। মওদুদি সাহেবের (সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী) কয়েকটি বই-ই তাদের সর্বোচ্চ তহবিল। এখানে কোরআন, হাদিস, ফিকহ নেই। জামায়াতের যে যোগ্যতা, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একই যোগ্যতা। তাদের মধ্যে ইসলামের কোনো প্রোগ্রামই নেই, আমি সেখানে কেন যাব? যারা জামায়াতে গেছে, তারা ভুল বোঝাবুঝিতে গেছে। অন্যথায় ধোঁকায় পড়ে তারা গেছে। জামায়াত তার আদর্শের ওপরে পৃথিবীতে কোনো মহল্লাও গড়তে পারেনি। এই ব্যর্থ শক্তির কাছে কেন যাব?

এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে জমিয়তের আদর্শিক আপত্তি কী?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: ইসলাম একটা ধর্ম, এর মূল ভিত্তি কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস। জামায়াত ইজমা ও কিয়াস মানে না। মওদুদী সাহেব যেসব হাদিসের স্বীকৃতি দিয়েছেন, সেগুলো ছাড়া অন্যগুলো মানে না। মওদুদী বলেছেন, ‘মুহাদ্দিসরা যেসব হাদিসকে বিশুদ্ধ বলে, আমরা সেগুলো বিশুদ্ধ বলি না। আমরা যাচাই-বাচাই করে বলি।’ ফলে সাড়ে তিনটা পয়েন্টই তাদের মধ্যে নেই। তারা কোরআনও মানেন মওদুদীর ব্যাখ্যায়। জামায়াতের ডজন ডজন পয়েন্ট আছে, যেগুলো ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মওদুদী তার দলের নাম জামায়াতে ইসলামী দিয়েছিলেন। যেদিন দিয়েছিলেন, যে সভায় দিয়েছিলেন ওই সভায় হিন্দুস্তানের ৮০ জন বড় বড় আলেম ছিলেন, কেউ তার সঙ্গে থাকেননি। সবাই ওই সভায় তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। এটা এমন নাম, যার মধ্যে কোনো ইসলাম নেই।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলো কেন এখনও একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যে পৌঁছাতে পারছে না?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: আমাদের নেতা মুফতি ওয়াক্কাছ, মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী ও মাওলানা শামুসদ্দীন কাসেমী (রহ.)-এর নেতৃত্বে জমিয়তের ব্যানারে ইসলামের পক্ষে বিভিন্ন আন্দোলনে শরিক ছিলাম আমরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চরমোনাইসহ সবাইকে নিয়ে একটা ঐক্যবদ্ধ শক্তি করতে চেয়েছিলাম। এ বিষয়ে জমিয়তের অফিসে মিটিং করা হলো। পরে চরমোনাইয়ের অফিসে আরেকটি মিটিং হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে দেখি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতের সঙ্গে মিশে ইসলামী আন্দোলন বিশাল সভা করছে। আমরা হতাশ হলাম। এরপর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ওই গ্রুপে গেছে। তারা আসন পর্যন্ত ঘোষণা করে দিয়েছে। তখনও আমরা বিএনপির সঙ্গে যাইনি। তাদের জোটে না যাওয়ার কারণে আমাদেরকে বিএনপির দালাল ইত্যাদি বলা শুরু করল। অথচ মনোনয়ন দাখিলের কয়েক দিন আগে বিএনপির সঙ্গে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছি। প্রার্থীও ঘোষণা করেছি তাদের প্রার্থী ঘোষণার মাসখানেক পর। বিভিন্ন ধাপে ধাপে ঘোষণা দিয়েছি। আকাঙ্ক্ষা ছিল, জামায়াত ছাড়া সমমনা ইসলামি দলগুলো নিয়ে শক্তিশালী ঐক্য গড়া হবে। ইসলামের পক্ষে বৃহত্তর ঐক্য হবে। কিন্তু তা হলো না।

বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছি, যেন জামায়াত এ দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না আসতে পারে। জামায়াতকে দেশ ও ইসলামের জন্য অকল্যাণকর মনে করছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনি বলেছেন, ‘সব আলেম এক হলেও এ দেশে ইসলামি হুকুমত কায়েম হবে না।’ কেন এমন মনে করেন?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: মানুষের স্বাস্থ্য, ধন-সম্পদ ও ভালো সন্তান আল্লাহর দান। এর চেয়ে বড় দান ইসলামি হুকুমত। ইসলামি হুকুমত পরিকল্পনা ও প্রোগ্রামে হয় না। এটি হয় দেশের মানুষের মধ্যে ইসলামি বিপ্লব আসার পর। মানুষের আকিদা, আল্লাহর ভয়, চরিত্র ও আচরণ সম্পূর্ণ ইসলামকেন্দ্রিক হতে হবে। এগুলো হলে আল্লাহ ক্ষমতা দান করবেন। এ ঘোষণা তিনি কোরআনে দিয়েছেন।

দেশের নারীদের মধ্যে পর্দা নেই, মানুষ নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না, মদ পান করে, মানুষের মধ্যে হালাল-হারামের পার্থক্য নেই; এসব অনৈসলামিক কার্যক্রম থাকার পর মানুষ ভোট দিয়ে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবে, এটা হতে পারে না। যাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান নেই, তারা এসব কথা বলে। পৃথিবীতে প্রোগ্রাম করে ইসলামি হুকুমত হয় না। আদর্শিক পরিবর্তন আসতে হবে। ইসলাম আসবে, এরপর হুকুমত হবে ইসলামি। পরিকল্পনা করে ইসলামি হুকুমত আসার বিষয়টি ইসলামেও নেই, কোরআন-হাদিসেও নেই। এটা অসম্ভব জিনিস। মানুষ অনৈসলামিক কার্যকলাপে ডুবে আছে, আর আল্লাহ ইসলামি হুকুমত দিয়ে দেবেন, এটা অযৌক্তিক কথা।

এশিয়া পোস্ট: অনেকের ধারণা করেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলামপন্থি দল যেতে পারলে পরবর্তীতে দেশে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা সম্ভব?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: এটা জামায়াতে ইসলামের ইসলাম, এটা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের ইসলাম নয়। জামায়াতের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছেন কিছু আলেম। পুলিশের ভয়ে নামাজ-রোজা রাখলে তো হবে না। দ্বীন করতে হয় নিজে উদ্বুদ্ধ হয়ে। আগে সরকার গঠন করা হবে, এরপর ইসলাম আসবে, এটা তো ইসলাম নয়। এই ইসলাম কাউকে মুক্তি দেবে না। এরা তো পুলিশ থেকে জীবন বাঁচাতে দ্বীন করবে। এ দ্বীনে মানুষ কাফের হবে।

এশিয়া পোস্ট: আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিএনপির সঙ্গে জোট করার যৌক্তিকতা কী ছিল? ভিন্ন লক্ষ্য ও ভিন্ন বিশ্বাসীদের সঙ্গে জোট করা সঠিক হয়েছে বলে মনে করেন?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: যারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সবাই ভিন্ন ভিন্ন মেরুর। জামায়াত বা বিএনপি—কারও লক্ষ্য ইসলাম নয়। যদি একদিকে ইসলাম ও অন্যদিকে অনৈসলাম হতো, তাহলে এ প্রশ্ন আসত। জামায়াত-বিএনপি দুদলই বলেছে, তারা শরিয়া আইন করবে না। আমি যেহেতু এ দেশে থাকব, এ দেশের মানুষ নিয়ে চলব, তাই আমি সেক্যুলারদের মধ্যে দেখব, কার হাতে দেশ নিরাপদ থাকবে।

বিএনপির মসজিদ-মাদ্রাসা দখলের ইস্যু নেই। বিএনপির রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠ হওয়াই লক্ষ্য। জামায়াতের লক্ষ্য রাষ্ট্র ক্ষমতা পাওয়া বা না পাওয়া হোক, কিন্তু তারা এ যাবৎ বহু মাদ্রাসা-মসজিদ দখল করেছে। বহু ইমামকে সরিয়ে দিয়েছে। বিএনপির টার্গেট আমার বাড়ি দখল নয়, কিন্তু জামায়াতের লক্ষ্য আমার বাড়ি দখল করা। বিএনপির তুলনায় জামায়াত বেশি ক্ষতিকর। ‍বিএনপি মন্দের ভালো।

এশিয়া পোস্ট: গত নির্বাচনে জোটগত সুবিধা পেয়েও জমিয়ত কেন কোনো আসনে জয়ী হতে পারেনি?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: জমিয়তের আসনগুলো বিএনপি খালি করে দেয়নি। যারা দাঁড়িয়েছিল, তাদেরকে প্রথমেই দল থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছে বিএনপি। তাদের সঙ্গে কথা না বলে হুট করে সরিয়ে দিয়েছে। বিএনপির ভালো মনোভাব থাকলে তাদের ডেকে নিয়ে আসতেন। বসাতেন। ম্যানেজ বা ব্যবস্থা করতেন। ম্যানেজ করা হলো সমস্যার সমাধান। দল থেকে বহিষ্কার করলে তো মানুষকে আরও জেদ পেয়ে বসে। বিএনপির এই আচরণ আমরা ভালো চোখে দেখেনি। আমার বিপরীতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন)। আমি ৬৯ হাজার ভোট পেয়েছি। চাকসু মামুন পেয়েছে ৪৯ হাজার ভোট। এগুলো সব ধানের শীষের ভোট। এ ভোটগুলো ব্যবস্থা করতে বিএনপির থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিএনপির আচরণই রহস্যজনক আচরণ।

এশিয়া পোস্ট: বিএনপির এই আচরণকে কীভাবে দেখছেন?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: আমাদের সঙ্গে বিএনপির ভালো আচরণ ছিল না। এর বড় প্রমাণ হলো, নির্বাচনের পর আমাদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো কুশল নেই। বৈঠক নেই। জোটের অন্যদের পাস করালেন, তাদের নিয়ে চললেন, কিন্তু আমাদের নিয়ে একটা বৈঠকও করলেন না। এটা রহস্যজনক বিষয়। বিএনপি আমাদের উপেক্ষা করছে।

এশিয়া পোস্ট: তাহলে বিএনপির সঙ্গে জোট নিয়ে আপনাদের চিন্তা-ভাবনা কী?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: বিএনপির সঙ্গে আমাদের নিয়মিত কোনো জোট হয়নি। নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির সমঝোতা হয়েছে। বিএনপি আমাদের নিয়ে চললে এটা জোট হতো। আমরাও সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় থাকতাম। তারা আসন ভাগাভাগি পর্যন্তই রয়েছে, তারা আমাদের জোট হিসেবে নেয়নি। আমরাও জোট হিসেবে যায়নি। নির্বাচনি সমঝোতা হলো নির্বাচন হয়েছে, সমঝোতা হয়েছে। আবার নির্বাচন হলে আবার হবে অথবা হবে না। আমরা বিএনপির সঙ্গে নেই। স্থানীয় নির্বাচনে আমরা একক নির্বাচন করব।

এশিয়া পোস্ট: আপনি বলেছেন, বিএনপির আচরণের কারণে তারা ভুগবে। ঠিক কোন বিষয় বা আচরণে আপনি হতাশ?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: প্রথমত বিএনপি আমাদের আসন ম্যানেজ করে দেয়নি। ইচ্ছা করলেই তারা পারতেন। দ্বিতীয়ত, আমাদের মহাসচিব মঞ্জরুল ইসলাম আফেন্দীর নীলফামারী-১ আসন আমাদের সম্ভাবনাময় আসন ছিল। কিন্তু তারেক রহমানের খালাত ভাই (শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন), তার জন্য তিনি নিজে বিএনপির নেতাদের রিজার্ভ করে রাখছেন, তারা যেন খেজুর গাছে ভোট না দেন। তারা খেজুর গাছে ভোট দেয়নি।

নির্বাচনের পর আমাদের সঙ্গে অপরিচিত মানুষের মতো আচরণ করছে। নির্বাচনের পর আমাদের নিয়ে আলোচনায় বসার প্রয়োজন অনুভব করেনি বিএনপি। এমনও একদিন আসবে, আমাদেরকে ডাকাডাকি করবে। এখন তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছে, অন্য দিকে নজর নেই। এ দেশে অনেকের ইতিহাস আমরা দেখেছি। শেখ মুজিবের ইতিহাস দেখছি, হাসিনার দেখেছি। সবই দেখলাম। তারা কি এভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠ থাকবেন। ওনারা একসময় সাঁতার কাটবেন। তখন আশ্রয় নিতে চাইবেন। তাই বলেছি, তারা ভোগবে।

আমরা তাদের সঙ্গে জোটের কারণে তাবলিগিদের ভোট তারা পেলেন। হেফাজতের ভোট পেলেন, কওমি অঙ্গনের ভোট পেলেন। জোট না করলে ৭০ থেকে ৮০ আসনে বিএনপি পাস করতে পারত না।

এশিয়া পোস্ট: আপনি বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে জোট করে দেশ, জাতি ও কওমি মাদ্রাসাকে রক্ষা করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে জোট না করলে কী ক্ষতি হতো বলে মনে করেন?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে এক বছরের মধ্যে অনেক মাদ্রাসা দখল করে নিত। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশকে আমেরিকার গোলাম বানিয়ে ফেলত। জামায়াত অনির্ভরযোগ্য দল। তারা কখনও দেশ চালাননি। একটা মহল্লাও তাদের আদর্শ অনুযায়ী গড়ে তুলেননি। তাদের হাতে দেশ সঁপে দেব কীভাবে। বিএনপি তিনবার দেশ চালিয়েছে, তারা পরীক্ষিত। আশা করি, দেশের আর ক্ষতি হবে না। বিএনপি যতটুকু দেশ বাঁচাবে, ততটুকু জামায়াতে বাঁচাবে না। দেশ বিক্রি করেও জামায়াত ক্ষমতায় থাকতে পারলে, তারা করবে।

এশিয়া পোস্ট: বর্তমান সরকারের প্রতি জমিয়তের অবস্থান কী—সহযোগিতা, সমালোচনা নাকি ইস্যুভিত্তিক সমর্থন?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: আমরা তাদের সঙ্গে ছিলাম, এর অর্থ এই নয় যে, হারাম-হালাল সব মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে চলব। সরকার ভালো কাজ করলে ধন্যবাদ জানাব। সম্ভব হলে সহযোগিতা করব। খারাপ কাজ করলে বিরোধিতা করব। প্রয়োজন হলে রাজপথে নামব। আমরা কারও সঙ্গে কন্ট্রাক্টে চলি না।

এশিয়া পোস্ট: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আপনি কোন ভিত্তির ওপর দেখতে চান?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: ইউরোপে এক দেশের ভিসা হলে বিভিন্ন দেশে যাওয়া যায়। তাদের বর্ডারে অপরাধ নেই, হত্যা নেই। তারা একসঙ্গে চলছে। আমাদের সীমান্তে যে আচরণ করা হয়, এটা ভদ্র মানুষের আচরণ নয়। গুলি করে এক দেশের মানুষকে আরেক দেশের মানুষ মেরে ফেলছে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এই ধরনের আচরণ উভয় দেশের জন্য ক্ষতিকর মনে করি। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ চাই। আশা রাখব, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা যেভাবে জামাই আদরে আছে, মুসলমানরাও হিন্দুস্তানে সেভাবে থাকবে। সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, এটা ভারত আমাদের থেকে শিখতে পারে।

এশিয়া পোস্ট: আগামী দশ বছরে জমিয়তকে কোথায় দেখতে চান?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: অনেকগুলো আসনে জমিয়ত যেন বিজয়ী হতে পারে। আমরা অনেকগুলো নির্দিষ্ট আসন নিয়ে পলিকল্পনামাফিক কাজ করছি।

এয়িশা পোস্ট: তরুণ প্রজন্মকে জমিয়তের রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করতে আপনার পরিকল্পনা কী?

উবায়দুল্লাহ ফারুক: সাধারণ ছাত্রদের ছাত্র জমিয়তে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। জমিয়তের সিলেবাসভুক্ত বইয়ে সাধারণ ছাত্রদের জন্য নানাবিধ উপাদান রেখেছি। সাধারণ মানুষদেরও সম্পৃক্ত করতে নানামুখী পরিকল্পনা নিয়েছি।

এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

উবায়দুল্লাহ ফারুক: আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ।