
তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে স্বাধীনতার পর থেকেই ঢাকা ধারাবাহিকভাবে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে যৌথ নদী কমিশন, কূটনৈতিক বৈঠক এবং উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগে আলোচনা অনেক দূর এগোলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। সর্বশেষ ২০১১ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিজেপি সরকার চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত করেছিল। সেখানে উল্লেখ ছিল, ভারত পাবে ৪২.৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পাবে ৩৭.৫ শতাংশ পানি। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের স্বার্থের কথা তুলে ধরে এতে তীব্র আপত্তি জানান। এরপর নানা চেষ্টা সত্ত্বেও আলোচনা থমকে যায় এবং চুক্তিটি আর বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি।
তবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির প্রেক্ষাপটে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তিস্তা নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষ এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণে চুক্তির পথে বড় কোনো বাধা আর নেই। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার আন্তরিক হলে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়া সম্ভব।
হিমালয়ের সিকিমের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য ৪১৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩০৫ কিলোমিটার ভারতের ভেতরে এবং ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এই নদীর পানির ওপর দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। ভারতের প্রায় ৯ লাখ ২২ হাজার হেক্টর এবং বাংলাদেশের ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমির সেচ এই নদীর পানির ওপর নির্ভর করে।
শুষ্ক মৌসুমে ভারতের গজলডোবা বাঁধে পানি আটকে রাখার কারণে নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায় এবং কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যায়। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ধান উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে তিস্তার প্রবল স্রোত দুই কূল উপচে পড়ে এবং লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এতে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় থেকেই তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। নদীর উৎপত্তি ভারতে হওয়ায় এই ইস্যু জটিল হয়ে ওঠে। সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের প্রায় প্রতিটি বৈঠকে তিস্তা ইস্যু থাকলেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। যদিও ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। ১৯৮৩ সালের একটি অস্থায়ী চুক্তি অনুযায়ী ভারত পেত ৩৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পেত ৩৬ শতাংশ পানি। অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ অনির্ধারিত ছিল। বাংলাদেশ ৫০ শতাংশ পানি দাবি করেছিল, কিন্তু সেই চুক্তি পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ ২০১১ সালে প্রস্তাবিত একটি চুক্তিতে ভারতকে ৪২.৫ শতাংশ ও বাংলাদেশকে ৩৭.৫ শতাংশ পানি দেওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র আপত্তিতে তা থমকে যায়।
ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সফরসঙ্গী হিসেবে নাম ঘোষণার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশ সফর বাতিল করেন। তিস্তা চুক্তিতে তার সমর্থন না থাকাই ছিল এই সিদ্ধান্তের কারণ।
পরবর্তী সময়ে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ এবং জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার চীনের সহযোগিতায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৬ সালের একটি স্মারক চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটির সূচনা হয়। কয়েক বছরের সমীক্ষার পর ২০১৯ সালে চীনের সহায়তায় ‘তিস্তা কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ তৈরি করা হয়। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে এই প্রকল্পটিও বাস্তবায়িত হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির অভাবনীয় সাফল্যে তিস্তার পানি নিয়ে আশার আলো দেখছেন রংপুর অঞ্চলের মানুষ। তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম হক্কানী কালবেলাকে বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি এখন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়ও বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসায় তিস্তাপারের মানুষের মধ্যে পানি পাওয়ার আশাবাদ তৈরি হচ্ছে। তবে আমরা তিস্তার পানি যেমন চাই, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের ভেতরেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চাই।
রিভারাইন পিপলের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব এবং নদী গবেষক শেখ রোকন বলেন, ভারত সরকার বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে আগ্রহী। তিনি মনে করেন, যদি তারা আন্তরিকভাবে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে তা আগের তুলনায় সহজ হতে পারে। তার মতে, কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার একই দলের হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, স্থলসীমান্ত চুক্তি লোকসভায় পাসের ক্ষেত্রে একই দলের সরকার থাকায় সিদ্ধান্ত সহজ হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার আগে থেকেই তিস্তা চুক্তির পক্ষে ছিল। এখন তারা পশ্চিমবঙ্গেও ক্ষমতায় এলে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে চাপ তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা উত্তেজনা থাকলেও সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনে এই ইস্যু ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় না থাকলেই চুক্তি হয়ে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তার মতে, বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক খুব ভালো অবস্থায় না থাকলেও আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতির দিকে রয়েছে। তিনি মনে করেন, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়ের মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আনতে হবে এবং এরপর গুরুত্বের সঙ্গে সমাধানের পথে এগোতে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, পশ্চিমবঙ্গে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এর প্রভাব পড়বে না। তিনি জানান, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে গঙ্গা ও তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ৯ ঘণ্টার ফল গণনায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে এগিয়ে রয়েছে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি। ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ৩৪টি আসনে জয় পেয়েছে এবং ১৭০টি আসনে এগিয়ে আছে। অন্যদিকে গত তিন মেয়াদ ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস ১৩টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং ৭০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে, মমতা যুগের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।
সূত্র: কালবেলা












































