প্রচ্ছদ জাতীয় ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে?

ভারত কি শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে?

বাংলাদেশের পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা অনেকদিন ধরে। তবে সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি মন্তব্যের পর বিষয়টি ঘিরে গুঞ্জন কিছুটা বেড়েছে।

গত ১৭ এপ্রিল দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের ‘অনুরোধটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’ এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আইনি প্রক্রিয়ার অংশ।

এতে একদিকে যেমন হাসিনাকে ফেরত দিতে বাংলাদেশের অনুরোধ পাওয়ার কথা স্বীকার করে নেন জয়সওয়াল, অন্যদিকে এও পরিষ্কার হয় যে এটি নিয়ে ভারত সরকার যাচাই-বাছাই করছে।

নিশ্চিতভাবে কিছু না বললেও এই মন্তব্য কি নয়াদিল্লির তরফে পরিবর্তনের আভাস?

এর আগে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে এবং হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকেও প্রসঙ্গটি তোলেন।

হাসিনার প্রত্যর্পণ সংবেদনশীল বিষয়। সেই নিরিখে ধারণা করা হয়, পুরো বিষয়টি সুরাহা করতে আইনি বিতর্কের চেয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা ও কূটনৈতিক তৎপরতাই বেশি গুরুত্ব রাখবে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। তবে জয়সওয়াল যে আইনি প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, তা ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

মানবাধিকার ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, ‘এই আইনের নিয়মগুলো মেনেই সব ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাওয়ার পর ভারত সরকার একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করবে। সেই ম্যাজিস্ট্রেট খতিয়ে দেখবেন যে হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর ভিত্তি কতটুকু।’

প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেটকে সেই ‘পলাতক অপরাধীর’ (আইনের ভাষায়) বিরুদ্ধে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে হয়, যেন তাকে হাজির করা যায়। অবশ্য এই মামলায় সেটার প্রয়োজন হবে না। কারণ, হাসিনা বর্তমানে ভারত সরকারের আশ্রয়েই আছেন।

হাসিনা যখন আদালতে হাজির হবেন, তখন ম্যাজিস্ট্রেট প্রত্যর্পণ অনুরোধের সঙ্গে দেওয়া প্রমাণাদি, তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখবেন—ঠিক যেন মামলাটির বিচার ভারতেই হচ্ছে।

বিচারক যাচাই করবেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ যৌক্তিক মনে হয় কি না। অর্থাৎ, ভারতে বিচার হলেও এসব অভিযোগ ও প্রমাণ ধোপে টিকত কি না।

ভিত্তি পাওয়া গেলে ম্যাজিস্ট্রেট হাসিনাকে ভারতের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিতে পারেন এবং ‘তদন্তের ফলাফল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রিপোর্ট করবেন।’ সেই রিপোর্টের সঙ্গে সরকারের কাছে বিবেচনার জন্য হাসিনা যদি কোনো লিখিত বক্তব্য দিতে চান, সেটিও পাঠাতে পারেন।

প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, অনুরোধকারী পক্ষ অপরাধের প্রমাণ দিতে বাধ্য না, শুধু গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পরিচয়ের প্রমাণ দিলেই চলে। দিল্লি হাইকোর্টের আইনজীবী উজ্জয়িনী মনে করেন, এই মামলাটি জটিল এবং এখানে অনেকগুলো স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ যে প্রাথমিকভাবে নির্ভরযোগ্য, তা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি অবশ্যই সরবরাহ করা উচিত।’

প্রত্যর্পণ চুক্তি ও ভারতের প্রত্যর্পণ আইন দুটিতেই কিছু শর্ত রয়েছে, যার কারণে একটি দেশ চাইলে প্রত্যর্পণে নাও রাজি হতে পারে। সেটা হাসিনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

উজ্জয়িনী ব্যাখ্যা করেন, ‘আইন ও চুক্তি অনুযায়ী ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। যদি অভিযোগগুলো রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, অথবা যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি (এক্ষেত্রে হাসিনা) প্রমাণ করতে পারেন যে বাংলাদেশে তিনি ন্যায্যবিচার পাবেন না, তাহলে ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকার করতে পারে।

তবে আইন ও চুক্তি উভয়ক্ষেত্রেই বলা আছে, হত্যা, অপহরণ ও গুমের মতো অপরাধগুলো রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।

এই আইনজীবী আরও উল্লেখ করেন, হাসিনাকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত, বিচার ও দণ্ডিত করা হয়েছে। সাধারণ হত্যা মামলার চেয়ে এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণের মানদণ্ড অনেক বেশি উঁচু।

ভারতে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো বিশেষ আইন নেই। তবুও একই ধরনের অপরাধের বিচার ভারতে হতে পারে। কারণ, ভারতের নিজস্ব আইনে হত্যাযজ্ঞ, হত্যায় প্ররোচনা ও অপহরণ বা গুমের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

উজ্জয়িনী বলেন, ‘সেদিক থেকে চিন্তা করলে ওই অপরাধ থেকে ভারতেও আইনি সুরক্ষা পাওয়া যাবে।’

তিনি আরও বলেন, তবে মূল বিবেচ্য বিষয় হবে অনুরোধটি ‘সদিচ্ছা’ থেকে করা হচ্ছে কি না এবং হাসিনা সেখানে সুষ্ঠু বিচার পাবেন কি না। ‘ব্যতিক্রম আছে বটে, তবে আমার মনে হয় আইনি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে মনোযোগের মূল জায়গা হবে ঘটনার প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ও এই বিচার প্রক্রিয়াটি প্রতিহিংসামূলক কি না, সেটা দেখা।’

তিনি মনে করেন, কর্তৃপক্ষের উচিত ন্যায্যতা ও আইনি প্রক্রিয়ার যথাযথ অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা দেখা। এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে।

এই আইনজীবী বলেন, অনুরোধটি সদিচ্ছা থেকে করা হয়েছে কি না এবং হাসিনা সুষ্ঠু বিচার পাবেন কি না, তা নির্ধারণ করবে ভারত সরকার। ম্যাজিস্ট্রেট এই সিদ্ধান্ত দেবেন না।

ভারত এখনো হাসিনার অবস্থা স্পষ্ট করেনি। তিনি কি রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন, নাকি দিল্লিতে শরণার্থী হিসেবে আছেন—তাও জানায়নি। ভারত কেবল এটুকু বলেছে, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ সেখানে রয়েছেন।

শরণার্থী সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা কিংবা মর্যাদা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

ভারত যদিও আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, তবে ভারতের নিজস্ব আইন ও রীতিতে শরণার্থী সুরক্ষার বিধান রয়েছে। তবে এই আইন ভারত সবক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করে না।

ভারত যাদের আশ্রয় দিয়েছে তাদের রক্ষা করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আছে কি না, জানতে চাইলে উজ্জয়িনী বলেন, ‘ভারতের পক্ষ থেকে অন্তত জনসম্মুখে এমন কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতির কথা জানা যায় না। তবে যদি তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি থেকেও থাকে, ন্যায়ের স্বার্থে সেই প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে কাউকে তার দেশে ফেরত পাঠানোই যেতে পারে।’

এর আগে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় নাগরিকদের প্রত্যর্পণের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তাতে পুরো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে।