
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পরপরই নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছে। ফলে বর্তমানে ফাঁকা আসনটিতে আগামী তিন মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে উপনির্বাচন। এর মধ্যে পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন সবখানেই আলোচনার মূল বিষয় কে হচ্ছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের পরবর্তী কান্ডারি? কে হবেন বিএনপির প্রার্থী? এখনো দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি বিএনপি। তবে জেলার বেশিরভাগ নেতাকর্মী মনে করছেন, উপনির্বাচনে মির্জা পরিবার থেকেই মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তারা মির্জা ফয়সালকেই দলের কান্ডারি মনে করছেন। এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইনকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এখন বিএনপির সিদ্ধান্তের অপেক্ষার পালা। এক্ষেত্রে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শেষ সিদ্ধান্ত বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের। জেলা বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, দল যাকে মনোনয়ন দেবে, সবাই তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ভোট করেছিলেন দেলাওয়ার হোসেন। তিনি প্রায় ৯৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১১ হাজার ৬১৯ জন। তার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩ জন নারী ২,৫৬,৫৭২ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
জানা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতি আর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই মির্জা পরিবারের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। আসন্ন উপনির্বাচনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিনেই আস্থা রাখতে চাইছে বিএনপির হাইকমান্ড। মির্জা ফয়সাল ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সাবেক মেয়র। দলীয় মনোনয়ন পেলে তিনিও বাবা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন ও বড় ভাইয়ের মতো পৌর ভবন থেকে সংসদ ভবনে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। অন্যদিকে মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জা। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক শামারুহ মির্জা গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাবার পক্ষে ভোটের মাঠে সক্রিয় ছিলেন। তাই বাবার অনুপস্থিতিতে তিনিই আসনের দায়িত্ব নেবেন এমন আলোচনাও রয়েছে।
তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী মির্জা ফয়সাল আমিনকে এগিয়ে রাখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন জেলা বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে শামারুহ মির্জা অস্ট্রেলিয়ায় সরকারি চাকরি করেন। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জার্নালে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। গত নির্বাচনে বাবার পক্ষে ভোটের প্রচারণায় থাকলেও নিজে নির্বাচনে খুব বেশি আগ্রহী নন। যে কারণে মির্জা পরিবার থেকে জেলা বিএনপির সভাপতি ও মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনের প্রার্থী হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন কালবেলাকে বলেন, আমার বাবা ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় আমি স্কুলের ছাত্র। তখন থেকেই রাজনীতি শুরু আমার। আমাদের পরিবার ব্রিটিশ আমল থেকে রাজনীতি করে আসছে। আমাদের খাবার টেবিলে রাজনীতির চর্চা হয়। আমার বাবা জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, আমার ভাই সেও জেলা বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমিও দলের সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে, তারা আমাদের কখনো ছেড়ে যায়নি আমরাও তাদের সুখে-দুখে পাশে ছিলাম।
তিনি আরও বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ অনেকেই আমাকে এমপি হিসেবে দেখতে চান। আবার কেউ কেউ আমার ভাতিজি শামারুহ মির্জাকেও দেখতে চান। তবে সবার চাওয়া আমাদের পরিবারের মধ্য থেকেই। দলের এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ব্যাপারে দলের মনোনয়ন যাকেই দেবে, তার জন্য জেলা বিএনপি সভাপতি হিসেবে আমার যে দায়িত্ব সেটি পালন করতে হবে আমাকে। দল যোগ্যতার বিচারে যে কাউকে মনোনয়ন দিতে পারে। ঠাকুরগাঁওয়ে যে উন্নয়নের ধারা, সেটিকে অব্যাহত রাখতে হলে উপনির্বাচনে অবশ্যই বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকে জয়ী করতে হবে, না হলে উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হতে পারে। এ সময় তিনি আরও বলেন, একটি মহল এখন থেকেই বিভিন্ন অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছে। নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, জেলায় বিএনপিতে কখনো গ্রুপিং বা বিভক্তি ছিল না। দলের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ও মনোনয়ন বোর্ড যাকে মনোনয়ন দেবেন, তিনিই আমাদের দলের প্রার্থী হবেন। আমরা তার জন্য কাজ করব। আমরা ঐক্যবদ্ধ, আমাদের বিজয় হবে।
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মামুন উর রশিদ কালবেলাকে বলেন, দল যাকে মনোনয়ন দেবে, আমরা তার হয়ে কাজ করব। বিগত নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় হয়েছে ধানের শীষের। উপনির্বাচনে এর চেয়ে বেশি ভোটে নির্বাচিত হবো ইনশাআল্লাহ।
অন্যদিকে উপনির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে থাকা ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য। গত রোববার ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক দায়িত্বশীল বৈঠকে দলের পক্ষ থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম।
ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি কফিল উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, আসন্ন উপনির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে দেলাওয়ার হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এর আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, উপনির্বাচনে বিজয়ী হবো। সেভাবে আমাদের কার্যক্রম ও প্রস্তুতি অব্যাহত আছে। যে কোনো মূল্যে আমরা বিজয়ী হবো ইনশাআল্লাহ।










































