
সন্তান জন্মের কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের বিছানায় কাঁদতে কাঁদতে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী কল্পনা মিশ্র। পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ মৃত্যুর আগে ধারণ করা সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর কল্পনা ও তার নবজাতক দুজনেরই মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়ার একটি সরকারি হাসপাতালে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই মা ও নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। খবর এনডিটিভির।
মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওতে কল্পনাকে হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডে কান্নাকাটি ও চিৎকার করতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যদের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্যও তিনি অনুরোধ করছিলেন।
ভিডিওতে কল্পনাকে তার মাকে বলতে শোনা যায়, ‘এভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে, এই মানুষগুলো আমাকে মেরে ফেলবে।’ এরপর তিনি বলেন, ‘আমি বাঁচব না। দয়া করে আমাকে বাঁচাও, আমার জীবন বিপদের মধ্যে।’
এর কয়েক ঘণ্টা পরই তার মৃত্যু হয়। একই সময়ে মারা যায় তার নবজাতক সন্তানও।
পরিবারের অভিযোগ, কল্পনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও চিকিৎসকদের বারবার জানানো সত্ত্বেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল মেনেই তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে দায়িত্বে থাকা দুই নার্সিং কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ। তদন্তে কারও দায় প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
কল্পনা রেওয়া জেলার হাতওয়া এলাকার বাসিন্দা। এটি ছিল তার প্রথম সন্তান। পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তান প্রসবের জন্য ২৫ আগস্ট রাতে তাকে সঞ্জয় গান্ধী-গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরদিন ২৬ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকেরা তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের পর তিনি একটি সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সন্তান জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যেই মা ও নবজাতক দুজনের মৃত্যু হয়।
কল্পনার চাচা ধর্মেন্দ্র মিশ্র জানান, সন্তান প্রসবের সময় কল্পনার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়।
এদিকে মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওটি সামনে আসার পর ঘটনাটি আরও আলোচনায় আসে। ভিডিওতে কল্পনাকে হাসপাতালের ওয়ার্ডের ভেতরে অস্থির অবস্থায় দেখা যায়। তিনি কান্না করছিলেন, চিৎকার করছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
ভিডিওতে কয়েকজন নার্সিং স্টাফকে তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করতে এবং হাসপাতালে থাকার জন্য বোঝাতে দেখা যায়। একপর্যায়ে একজন স্টাফ তাকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?’
তবে কল্পনা তখনও সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের দিকে হাত বাড়িয়ে কান্না করতে থাকেন এবং অভিযোগ করেন, তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
কল্পনার বাবা রামশরণ মিশ্র মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, মেয়ের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি একাধিকবার চিকিৎসকদের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
রামশরণের দাবি, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় কল্পনার অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘কল্পনা আমার একমাত্র মেয়ে ছিল। তার বিয়ের জন্য আমি ১৫ লাখ রুপির জমি বিক্রি করেছিলাম। আজ সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। যারা গাফিলতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে হবে। দায়িত্বে থাকা ডাক্তার ও স্টাফদের সাসপেন্ড করতে হবে। আমাদের দাবি মানা না হলে আমরা পোস্টমর্টেম করতে দেব না।’
অ্যানেস্থেশিয়া নিয়েও অভিযোগ তুলেছে কল্পনার পরিবার। স্বজনদের দাবি, অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়ার পর কল্পনা আর জ্ঞান ফিরে পাননি। অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তারা। তবে এ অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলাফলের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
মা ও নবজাতকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতাল এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কল্পনার স্বজনেরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ করেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
প্রায় চার ঘণ্টা ধরে হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ছিল। পরিবার প্রথমদিকে ময়নাতদন্ত করাতেও রাজি হয়নি। তাদের বক্তব্য ছিল, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তারা ময়নাতদন্ত করতে দেবেন না।
পরে হাসপাতালের ডিন ডা. সুনীল আগরওয়াল এবং সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাহুল মিশ্র ঘটনাস্থলে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠকের পর সমঝোতা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের মাধ্যমে কল্পনার ময়নাতদন্ত করা হবে।
এরপর প্রাথমিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দায়িত্বে থাকা দুই নার্সিং কর্মকর্তা সাধনা বর্মা ও সীমা মুজালদেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
হাসপাতালের ডিন ডা. সুনীল আগরওয়াল ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, পরিবারের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্ত কমিটি গঠন এবং দুই নার্সিং কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তের কথাও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, রোগী কেন জ্ঞান ফিরে পাননি, সেটি তদন্তের বিষয়। তদন্তে যার দায় প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. রাহুল মিশ্র চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, নির্ধারিত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করেই কল্পনার চিকিৎসা করা হয়েছে। তবে পরিবারের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশে চিকিৎসক সংকটও বড় প্রশ্ন
কল্পনা ও তার নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা এমন একটি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র সামনে এনেছে, যেখানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে।
২০২৫-২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশে অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রায় চারটি পদের মধ্যে তিনটিই শূন্য। রাজ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য মোট ৫ হাজার ৪৪৩টি পদ অনুমোদিত থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৪৯৫ জন।
ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ৩ হাজার ৯৪৮টি পদই বর্তমানে খালি। অনুমোদিত পদের তুলনায় শূন্যতার হার ৭২ শতাংশের বেশি।
মেডিকেল অফিসার পদেও একই ধরনের সংকট রয়েছে। এই পদে মোট ৬ হাজার ৫১৩টি পদ অনুমোদিত হলেও ২ হাজার ৬৮৯টি পদে কোনো কর্মকর্তা কর্মরত নেই। অর্থাৎ প্রতি ১০টি অনুমোদিত মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে চারটিরও বেশি পদ শূন্য রয়েছে।
এখন তদন্তের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—সন্তান জন্মের পর কল্পনার শারীরিক অবস্থার অবনতি কীভাবে হলো এবং মা ও নবজাতকের মৃত্যুর পেছনে আসলে কী কারণ ছিল।
এই খবরটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন










































