প্রচ্ছদ আর্ন্তজাতিক তারেক রহমানের দিল্লি সফরে ঢাকার শর্তকে ‘কঠিন’ বলছে ভারতীয় গণমাধ্যম

তারেক রহমানের দিল্লি সফরে ঢাকার শর্তকে ‘কঠিন’ বলছে ভারতীয় গণমাধ্যম

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সফরের আগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোসহ ঢাকার দেওয়া কয়েকটি শর্তকে ‘কঠিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রত্যর্পণের এই জোরালো দাবি পূরণ না হলে দ্বিপক্ষীয় সফরটি স্থগিত হতে পারে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে ঢাকার এই অবস্থানকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তারেক রহমানের সফরের জন্য বাংলাদেশ কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বিষয়টিকে সফরের ক্ষেত্রে ঢাকার ‘চূড়ান্ত সীমারেখা’ বা ‘রেড লাইন’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোই এখন প্রধান শর্ত।

ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, দেশের ভেতরে কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো রাজনৈতিক মিত্রদের চাপে পড়েই সরকার নয়াদিল্লিকে এসব শর্ত দিয়েছে। শর্তের মূল বিষয়বস্তু হলো—শেখ হাসিনাসহ পলাতক অন্যান্য অপরাধীকে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো এবং এই সফরের জন্য ভারতকে একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরি করা। ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, অবিলম্বে এসব শর্ত মেনে নেওয়া নয়াদিল্লির জন্য আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব।

ঢাকার এই কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম জানিয়েছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে এই সফর নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করার বিষয়টি সেই পরিবেশকে নষ্ট করেছে বলে ঢাকা মনে করে।

মুখপাত্র তার বিবৃতিতে বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এ প্রক্রিয়ার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি।’

বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত পাঠাতে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যায় অভিযুক্তদেরও হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।

ভারতের সরকারি সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলন এবং দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া আমন্ত্রণ এখনো বহাল রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য ২১ আগস্ট সম্ভাব্য তারিখ প্রস্তাব করেছিল ভারত। তবে এখন চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণ ঢাকার ওপরই নির্ভর করছে। শেখ হাসিনাকে ফেরানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব আইন ও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে।

দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, এর আগে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার বিষয়টি বাণিজ্য, জ্বালানি বা পানিবণ্টনের মতো বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান বদলেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ২০২৪ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রথম হাসিনাকে ফেরানোর অনুরোধ করেছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমানের সরকারও একই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলনের পর। সেখানে তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন এবং প্রাণনাশের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে ভারত সরকারের দাবি, ওই সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং হাসিনাকে তারা সমর্থনও করেনি।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উভয় দেশই কূটনৈতিক উপায়ে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সূত্রগুলোর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, জ্বালানিসংকটসহ অভ্যন্তরীণ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে চাপে রয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ইস্যুটির সুরাহা না হলে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি থমকে যেতে পারে। ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সফরের জট খোলা বেশ কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে।