প্রচ্ছদ জাতীয় নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় যে তিন নেতার নাম

নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় যে তিন নেতার নাম

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগের খবর সামনে আসার পর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবে রাজনৈতিক মহল ও দলীয় সূত্রে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় উঠে এসেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং নজরুল ইসলাম খানের নাম।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শিগগিরই দায়িত্ব ছাড়তে পারেন। জানা গেছে, তিনি ইতোমধ্যে বঙ্গভবন ছাড়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নীতিনির্ধারণী ফাইলে স্বাক্ষর করা থেকেও বিরত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য পদত্যাগ-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। দায়িত্ব ছাড়ার পর কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়া এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নিজেই দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সরে যেতে চাই।’ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে রয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই জ্যেষ্ঠ সদস্য দীর্ঘদিন ধরে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কুমিল্লা-১ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই নেতা দলের দুঃসময়ে নেতৃত্বের প্রতি অনুগত ছিলেন। কারাবরণসহ নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দল ছাড়েননি কিংবা দল ভাঙার কোনো উদ্যোগে যুক্ত হননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য শক্তিশালী একজন সম্ভাব্য প্রার্থী।

এর আগেও তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখার আলোচনা হয়েছিল। ২০২৩ সালে বিএনপির এক বিভাগীয় সমাবেশে দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী এবং ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় কার্যক্রমে কিছুটা নীরব থাকলেও দলীয় সূত্রের ভাষ্য, এটি পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে, যাতে তাকে ঘিরে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি না হয়।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় থাকা আরেক নাম বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা এই নেতা বিএনপির অন্যতম পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে একাধিকবার কারাবরণসহ নানা রাজনৈতিক চাপ ও নির্যাতনের মুখেও তিনি দলের নেতৃত্বের প্রতি অনুগত ছিলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে, নানা প্রলোভন ও চাপ সত্ত্বেও তিনি বিএনপি ভাঙার কোনো উদ্যোগে সাড়া দেননি।

দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করেন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে মির্জা ফখরুল চাইলে রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং এ ধরনের সাংবিধানিক পদ গ্রহণে আগ্রহী কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামও আলোচনায় রয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য, বিবৃতি ও কৌশলগত নথি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। দক্ষ বক্তা হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, রাষ্ট্রপতি না হলে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা কিংবা জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবেও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন সূত্রে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিবের নামও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে তার পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়া বিএনপির আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা ড. আবদুল মঈন খানের নামও বিভিন্ন মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তবে এসব আলোচনা নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও এ বিষয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে একাধিক নাম আলোচনায় আসা স্বাভাবিক, তবে এখনো এ বিষয়ে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

ফলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ বাড়ছে। যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি, তবুও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং নজরুল ইসলাম খান—এই তিন নেতার নামই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।