প্রচ্ছদ জাতীয় ভিসা সুবিধায় উগান্ডার চেয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট

ভিসা সুবিধায় উগান্ডার চেয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই ‘উগান্ডা’ শব্দটি নানা ট্রল ও ব্যঙ্গাত্মক উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সুবিধার ক্ষেত্রে উগান্ডা এখন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

সর্বশেষ হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী, উগান্ডার নাগরিকরা বাংলাদেশিদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক দেশে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় ভ্রমণ করতে পারেন।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত ২০২৬ সালের জুলাই পাসপোর্ট সূচকে দেখা গেছে, উগান্ডার পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ৬৫টি দেশে ভিসামুক্ত বা ভিসা অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় প্রবেশ করতে পারেন। অন্যদিকে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য সেই সুযোগ রয়েছে মাত্র ৩৫টি দেশে।

সর্বশেষ সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নেমে এসেছে ৯৭তম স্থানে। জানুয়ারি ২০২৬ সালের তুলনায় বাংলাদেশ দুই ধাপ পিছিয়েছে। একই অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়াও। বিপরীতে আফ্রিকার দেশ উগান্ডার অবস্থান তালিকার ৭২তম স্থানে।

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট এবং ২২৭টি সম্ভাব্য ভ্রমণ গন্তব্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ সূচক প্রকাশ করে। কোনো দেশের নাগরিক আগাম ভিসা ছাড়াই বা ভিসা অন-অ্যারাইভাল সুবিধায় কতটি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন, সেটিই এই সূচকের মূল ভিত্তি।

সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকরা বর্তমানে ৩৫টি দেশে ভিসামুক্ত, ভিসা অন-অ্যারাইভাল বা ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) সুবিধা পান। জানুয়ারি ২০২৬ এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়েও এ সংখ্যা ছিল ৩৭টি।

আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৩৯টি দেশে এবং ২০২৪ সালের শুরুতে ৪২টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই বা সহজ ভিসা সুবিধায় ভ্রমণ করতে পারতেন। অর্থাৎ মাত্র আড়াই বছরে বাংলাদেশের জন্য সহজে ভ্রমণ গন্তব্যের সংখ্যা ৪২ থেকে কমে ৩৫-এ নেমে এসেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ১৭টি দেশে সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত সুবিধা পান। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে বাহামাস, বার্বাডোজ, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, হাইতি, জ্যামাইকা, ফিজি, ভানুয়াতু, কিরিবাতি, মাইক্রোনেশিয়া, কুক আইল্যান্ডস, মন্টসেরাট, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, রুয়ান্ডা, জাম্বিয়া, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো এবং সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনস।

তবে সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনসের ক্ষেত্রে বাস্তবে বাংলাদেশিদের জন্য আগে থেকেই প্রি-এন্ট্রি ভিসা অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দেশটির সরকারি ইমিগ্রেশন বিধিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের নাগরিকদের আগেই অনুমোদন নিয়ে সেখানে ভ্রমণ করতে হয়।

এ ছাড়া ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, কম্বোডিয়া, তিমুর-লেস্তে, বুরুন্ডি, কোমোরোস, জিবুতি, গিনি-বিসাউ, মাদাগাস্কার, সিয়েরা লিওন, নিউই, সামোয়া ও টুভ্যালুতে বাংলাদেশিরা ভিসা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা পান। শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, সেশেলস ও সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসে যেতে হলে আগে অনলাইনে ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) নিতে হয়।

এবারের সূচকে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে ৯৭তম অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। দুই দেশের নাগরিকরাই ৩৫টি দেশে ভিসামুক্ত বা সহজ ভিসা সুবিধা পান। তবে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত দেশের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অধিকাংশ গন্তব্যে তাদের নাগরিকরা ভিসা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা পান।

গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থানে ধারাবাহিক ওঠানামা রয়েছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯৮তম। ২০২১ সালে তা নেমে যায় ১০৮তমে। ২০২২ সালে অবস্থান হয় ১০৩তম এবং ২০২৩ সালে ১০১তম। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ আবার ৯৭তম স্থানে উঠে এলেও ২০২৫ সালে নেমে যায় ১০০তমে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অবস্থান উন্নীত হয়ে ৯৫তম হলেও জুলাইয়ের হালনাগাদে আবার ৯৭তম স্থানে নেমে এসেছে।

এবারের সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের মর্যাদা ধরে রেখেছে সিঙ্গাপুর। দেশটির নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়াই বিশ্বের ১৯২টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এসব দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত বা সহজ প্রবেশযোগ্য গন্তব্য ১৮৮টি।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে সুইডেন, যার পাসপোর্ট দিয়ে ১৮৭টি দেশে ভ্রমণ করা যায়।

চতুর্থ স্থানে রয়েছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও স্পেন। এসব দেশের নাগরিকরা ১৮৬টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন।

পঞ্চম স্থানে রয়েছে অস্ট্রিয়া, গ্রিস, মাল্টা, পর্তুগাল ও সুইজারল্যান্ড। এসব দেশের নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে ১৮৫টি গন্তব্য।

ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য। সপ্তম স্থানে আছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, লাটভিয়া, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও স্লোভেনিয়া। অষ্টম স্থানে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া ও এস্তোনিয়া। নবম স্থানে লিচেনস্টেইন ও লিথুনিয়া এবং দশম স্থানে রয়েছে আইসল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট মালদ্বীপের। দেশটি ৫২তম অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের নাগরিকরা ৯৩টি দেশে ভিসামুক্ত বা সহজ প্রবেশ সুবিধা পান।

এরপর রয়েছে ভারত, যার অবস্থান ৮১তম এবং ভিসামুক্ত গন্তব্য ৫৫টি। ভুটান রয়েছে ৮৮তম স্থানে, মিয়ানমার ৯১তম এবং শ্রীলঙ্কা ৯৪তম অবস্থানে।

বাংলাদেশ রয়েছে ৯৭তম স্থানে, যেখানে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধার দেশ ৩৫টি। বাংলাদেশের ঠিক পরেই ৯৮তম অবস্থানে রয়েছে নেপাল। দেশটির নাগরিকরা ৩৪টি দেশে সহজে ভ্রমণ করতে পারেন।

অন্যদিকে পাকিস্তান রয়েছে ১০১তম অবস্থানে এবং তাদের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত গন্তব্য ২৯টি। সিরিয়া ১০৩তম, ইরাক ১০২তম এবং আফগানিস্তান ১০৪তম অবস্থানে রয়েছে। আফগানিস্তানের নাগরিকরা মাত্র ২২টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন, যা সূচকের সর্বনিম্ন।