
রাজনীতিতে ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয়— এমন কথাই আমরা বেশি শুনে এসেছি। ক্ষমতা আসে, সঙ্গে আসে নিরাপত্তার বলয়, আড়ম্বর, বিলাসিতা, দূরত্ব। অনেকের জীবন তখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। কিন্তু এ প্রচলিত ছবির একেবারে বিপরীত একটি চরিত্রের নাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি হয়েছেন সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, পরে পূর্ণমন্ত্রী। এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব। এখন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। অথচ এই দীর্ঘ পথচলা শেষে তার ব্যক্তিজীবনে চোখে পড়ে না ক্ষমতার কোনো চাকচিক্য, সম্পদের কোনো প্রদর্শন; কিংবা প্রভাবের কোনো অহংকার।
ইন্দিরা রোড হয়ে উত্তরার দুটি ভাড়া বাসায় রাজনৈতিক জীবনের বহু বছর পার করেছেন। মন্ত্রী হওয়ার আগের কয়েকটি বছর মির্জা ফখরুল ঢাকার অভিজাত এলাকায় যে ফ্ল্যাটে ছিলেন, সেটিও তার নিজের নয়; সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম পারিবারিকভাবে পেয়েছেন সেটি। বহু বছর পর্যন্ত তিনি চলাফেরা করেছেন একটি ছোট, পুরনো টয়োটা মডেলের গাড়িতে— সেটিও ছিল তার স্ত্রীর। রাজধানীতে নিজের নামে নেই কোনো অট্টালিকা, নেই বিত্তের প্রদর্শনী। অথচ চাইলে তিনি ভিন্ন জীবনও বেছে নিতে পারতেন। কারণ তিনি জন্মেছেন এক বনেদি রাজনৈতিক পরিবারে। বাবা মন্ত্রী- এমপি ছিলেন, চাচারাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু মির্জা ফখরুল যেন সচেতনভাবেই বেছে নিয়েছেন অন্য এক পথ— সাদামাটা জীবন, সংযত চাহিদা আর মানুষের পাশে থাকার পথ।
একজন মানুষের ভেতরের মানুষ: ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকার সাদা রঙের ছোট্ট, ছিমছাম বাড়িটি যেন মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি। চারদিকে সবুজ গাছপালা, নেই অযথা জাঁকজমক। কিন্তু এই বাড়ির সবচেয়ে বড় পরিচয় এর স্থাপত্য নয়, এর দরজা।
স্থানীয়দের ভাষায়, মির্জা ফখরুল শহরে এলেই ভোর থেকে শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে দিনমজুর, শিক্ষক, কৃষক, ব্যবসায়ী— যে কেউ অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারেন তার বাড়িতে। কাউকে ফিরিয়ে দেন না। তিনি ধৈর্য নিয়ে শোনেন মানুষের কথা। সবার সমস্যার সমাধান দিতে না পারলেও চেষ্টা করেন পাশে দাঁড়ানোর।
আজও ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের অনেকেই তাকে ডাকেন ‘মির্জা আলমগীর’ বলে। জাতীয় নেতা হওয়ার আগে তিনি যেভাবে ছিলেন, স্থানীয়দের কাছে আজও ঠিক সেভাবেই আছেন। নির্বাচনী সফর হোক কিংবা ব্যক্তিগত— রাস্তার পাশের টং দোকানে বসে চা-পান, দোকানির সঙ্গে গল্প করা, পথচারীর খোঁজ নেওয়া কিংবা পুরনো পরিচিত কাউকে দেখে গাড়ি থামিয়ে কুশল বিনিময়— এসব দৃশ্য ঠাকুরগাঁওবাসীর কাছে নতুন কিছু নয়। ক্ষমতা তাকে মানুষের কাছ থেকে দূরে নেয়নি; বরং আরও কাছে এনেছে।
রাজনীতি তার কাছে পেশা নয়, দায়বদ্ধতা: মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল বাম রাজনীতি দিয়ে। তরুণ বয়সে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী এ মানুষটি পরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যোগ দিলেও, মানুষের জন্য রাজনীতি করার বিশ্বাস থেকে কখনো সরে আসেননি। নিজের জীবন-দর্শন সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘এটাই আমার লাইফস্টাইল। এভাবেই আমি বড় হয়েছি। এভাবেই চিন্তা-ভাবনা করি। মানুষের জন্য রাজনীতিটা করার চেষ্টা করি। যেহেতু একসময় বাম রাজনীতি করতাম, দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম— সেটা হয়নি। এখন নিজেরা যতটুকু পারি, সহজ-সরল থাকার চেষ্টা করি।’ এই কয়েকটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে তার রাজনৈতিক দর্শনের সারাংশ।
আজকের রাজনীতিতে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদকে প্রায়ই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখা হয়, সেখানে মির্জা ফখরুল সম্পদের প্রতি অনাগ্রহ দেখিয়ে এক ভিন্ন উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জন্য রাজনীতি করতে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তিও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুবই বিরল ঘটনা।
সংগ্রামের পথ ধরে নেতৃত্বে: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জনজীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ছাত্ররাজনীতির উত্তাল দিনগুলোতে। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপিএসইউ) রাজনীতিতে। সংগঠনটির এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি ছিলেন আন্দোলনের সামনের সারিতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের মাধ্যমে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষের চেয়ে রাজপথই তাকে বেশি টেনেছে। সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। তৃণমূল থেকেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক পথচলা। ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে দলটির অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি।
রাজনীতি তার কাছে কখনোই শুধু একটি পেশা ছিল না; ছিল বিশ্বাস, আদর্শ এবং মানুষের জন্য কাজ করার একটি দীর্ঘ অঙ্গীকার। ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে জনপ্রতিনিধি— প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে তিনি পৌঁছেছেন জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে।
সতেরো বছরের ঝড়ের মাঝখানে অবিচল এক অধিনায়ক: বিএনপি মহাসচিব হিসেবে তার সময়টা ছিল দলের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। একদিকে দলের চেয়ারপারসন কারাগারে, অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে। দেশের ভেতরে দলকে টিকিয়ে রাখা, নেতাকর্মীদের সাহস জোগানো, আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন মানুষ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই দীর্ঘ সময়ে তার বিরুদ্ধে করা হয়েছিল ১১১টি মামলা। ১১ বার যেতে হয়েছে কারাগারে। প্রায় সাড়ে তিন বছর বন্দি ছিলেন; কিন্তু তিনি থেমে যাননি। তার বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ বললেন, ‘এত অত্যাচার-নির্যাতনের পরও আব্বু কোনোদিন হতাশ হননি। তিনি সবসময় এর শেষ দেখতে চেয়েছেন।’
অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের যে অধ্যায় রচিত হয়, সেখানে সম্মুখসারির অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল। তাই বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীর কাছে তিনি শুধু একজন মহাসচিব নন; তিনি ধৈর্যের প্রতীক, সংগ্রামের প্রতীক।
ক্ষমতার নয়, মানুষের রাজনীতি: রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। গণতন্ত্রে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যক্তিগত সৌজন্য, ভদ্রতা ও মার্জিত আচরণের জন্য মির্জা ফখরুলের সুনাম রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়েও আলোচিত। অনেকেই তাকে ‘ক্লিন ইমেজ’-এর রাজনীতিবিদ হিসেবে মূল্যায়ন করেন। উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশেও তার সংযত ভাষা, প্রতিপক্ষের প্রতি ব্যক্তিগত সম্মান এবং শালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের ভালোবাসাই একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তার নিজের ভাষায়, ‘মানুষ যে আমাকে ভালোবাসে, আমাকে বিশ্বাস করে— এটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
শিকড় যার অহংকার: মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নেপথ্যে রয়েছে তার পরিবারের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন। সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন, যাতে স্বামী নির্ভার হয়ে রাজনীতি করতে পারেন। তাদের দুই সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে ড. মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ায় সরকারি চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। পোস্টডক্টরাল গবেষণা শেষ করে সেখানেই স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুল অকপটেই স্বীকার করলেন, ‘পরিবারকে বঞ্চিত করেছি। মেয়েদের সময় দিতে পারিনি। আমি যে রাজনীতি করতে পেরেছি, সেটা আমার স্ত্রীর জন্যই সম্ভব হয়েছে।’ রাহাত আরা বেগমও খুব সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর একটি কথায় যেন তাদের দাম্পত্যজীবনের দর্শন তুলে ধরলেন, ‘সম্পত্তির প্রতি তার কোনোদিন কোনো আগ্রহ ছিল না। আর তার যেহেতু ছিল না, আমারও আগ্রহ হয়নি।’
বাবার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বড় মেয়ে শামারুহ বললেন, ‘আব্বু বিএনপি মহাসচিব হওয়ার পর তার পুরো সংগ্রামটাই ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। জেল-জুলুম, এত বড় একটি রাজনৈতিক দলকে এক রাখা, সামনে এগিয়ে নেওয়া— সবকিছুই তিনি করেছেন। এত অত্যাচার-নির্যাতনের পরও কোনোদিন হতাশ হননি। তিনি সবসময় এর শেষ দেখতে চেয়েছেন।’
শেষ বয়সেও স্বপ্ন তরুণদের জন্য: জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া যেন খুবই সীমিত। হাসিমুখে মির্জা ফখরুল অাগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা তো এখন যাওয়ার পথে। যে কদিন আছি, মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাব। তরুণদের জন্য একটা ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করে দিয়ে যেতে চাই।’ এ কথাগুলো নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাবাস, সাফল্য-ব্যর্থতা আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া এক জীবনের সারসংক্ষেপ।
একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক চরিত্র: বাংলাদেশের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে নানাজনের মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে। তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কেউ কেউ বসে যেতে পারেন অনাহূত বিতর্কে। কিন্তু তার ব্যক্তিজীবনের সংযম, সহজ জীবনযাপন, শালীন রাজনৈতিক আচরণ এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক— এসব গুণের কথা তার সমর্থক, সহকর্মী এবং অনেক সমালোচকও স্বীকার করেন।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে যথার্থই বললেন, ‘তার (মির্জা ফখরুল) সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা।’ বিএনপি মহাসচিবকে দীর্ঘ ২৩ বছর কাছ থেকে দেখেছেন মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান। তার অভিব্যক্তি, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যারের সঙ্গে যখন থেকে সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন থেকে আজ পর্যন্ত তার মধ্যে সবসময় একটা সহনশীল রাজনৈতিক চিন্তা ধারণ করতে দেখেছি। তিনি আপাদমস্তক একজন যৌক্তিক রাজনীতিক। আওয়ামী লীগের নিষ্ঠুর দমনপীড়নের মধ্যেও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ধারণ করে তিনি মাঠের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে সফল হয়েছেন।’
সময়ের প্রবাহে রাজনীতিক আসবেন, যাবেন। ক্ষমতার পালাবদলও হবে। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন থেকে যান তারা, যারা পদ-পদবির চেয়ে মানুষকে বড় করে দেখেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গল্প তাই শুধু একজন রাজনীতিকের গল্প নয়; এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি বিশ্বাস করেন— ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অলংকার বিলাসিতা নয়, মানুষের আস্থা। আর সে আস্থাই একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় অর্জন












































