প্রচ্ছদ জাতীয় ক্ষমতার অনিয়ন্ত্রিত দাপট

ক্ষমতার অনিয়ন্ত্রিত দাপট

চারপাশে দেখতে পাই মানুষ সচরাচর একটু বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠলেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায়ও মহাদাম্ভিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ নিয়ন্ত্রণহীনতা ভালোভাবেই দেখিয়েছেন। পাঠকরা হয়তো ঘটনাটা জানেন। যদি কারো অজানা থাকে, তাহলে তাদের সুবিধার্থে অন্যদের খানিকটা বিরক্তি উৎপাদন করে আবার জানাচ্ছি।

বসনিয়ার সঙ্গে খেলায় যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগান নামের এক খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেছিলেন। ফিফার আইন অনুযায়ী বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে পরবর্তী রাউন্ডের খেলায় বালোগানের মাঠের বাইরে বেঞ্চে বসে থাকার কথা ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে কথা! তিনি ফিফার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনোকে ফোন করে আইন বদলাতে নির্দেশ দিলেন। এই ইনফান্তিনো লোকটি ট্রাম্পের এতটাই বশংবদ যে আইন, খেলোয়াড়ি ভব্যতা, ইত্যাদিকে বিসর্জন দিয়ে সাজাপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়টিকে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে খেলতে দিলেন।

তাতে অবশ্য কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খেলায় বেলজিয়াম ৪-১ গোলে যুক্তরাষ্ট্রকে উড়িয়ে দিয়েছিল। সারা পৃথিবীর মানুষ মার্কিনিদের পরাজয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছে। সবাই একবাক্যে বলেছে, উচিত শিক্ষা। এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে শুধু এই একটি বিষয়েই তার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেখিয়েছেন, তা কিন্তু নয়। তার নির্দেশে ইরানের ফুটবল দলের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, সেটি আন্তর্জাতিক খেলার সব শিষ্টাচার ও নিয়মকানুনের পরিপন্থী। ইরানি খেলোয়াড়দের যে পরিমাণ হয়রানি এবং অপমান করা হয়েছে, তার দায় ফিফাকে দীর্ঘকাল বহন করতে হবে। আমি তো মনে করি আমেরিকার মতো উদ্ধত দেশে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করাই অনুচিত।

ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো এতটাই নির্লজ্জ ব্যক্তি যে তিনি চরম যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খুশি করতে তাকে কথিত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ফিফার তরফ থেকে এক নতুন ও আজব পুরস্কার আসমান থেকে নামিয়ে এনে প্রদান করেছেন। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটার মতো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নোবেল না পাওয়ার আক্ষেপ হয়তো ভুয়া পুরস্কারে খানিকটা প্রশমিত হয়েছে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে, ট্রাম্পের এই পুরস্কার ভবিষ্যতে আর কাউকে দেওয়া হবে না। বিশ্বকাপ শেষ হলে ফিফার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত হবে ইনফান্তিনোকে ‘ইমপিচ’ করা। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ফুটবল এবং ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলাধুলার আন্তর্জাতিক প্রায় সব সংগঠন ‘খেলোয়াড়ি স্পিরিট’ কিংবা আইন নয়, শুধু অর্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কাজেই এবারও টাকা দিয়েই ইনফান্তিনো সবাইকে কিনে ফেলবেন। তার কোনো সাজাই সম্ভবত হবে না।

শুধু ফুটবল খেলাতেই নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বিষময় ফল আমরা বিশ্ব ভূরাজনীতিতেও দেখতে পাচ্ছি। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আমি কোনো ভালো শাসক বলে মনে করি না। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও তিনি অঢেল জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন করতে পারেননি এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নির্লজ্জভাবে হরণ করেছিলেন। শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর কোনো উপায় মাদুরো রাখেননি।

কিন্তু তাই বলে কোনো আন্তর্জাতিক আইনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে এই ক্ষমতা দেয় না যে, তিনি বিমান ও নৌবাহিনী পাঠিয়ে একটি সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিজ দেশে এনে বিচারের তামাশা করবেন। এটি রীতিমতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুন্ডামি। একইভাবে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার পরিবারের প্রায় সব সদস্য এবং অন্যান্য বেসামরিক ও সামরিক নেতাদের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি যৌথবাহিনী যেভাবে হত্যা করেছে, সেটিও আন্তর্জাতিক আইনবিরুদ্ধ।

ইরান এখনো যে এক অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, সেটি বিস্ময়কর। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ভিন দেশের শাসকদের যেভাবে টার্গেট করে হত্যা করে চলেছে, তাতে বিশ্বব্যবস্থার কবর হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যে বিশ্ব জনমতের কোনো তোয়াক্কা না করে ভূরাজনীতি ও খেলার মাঠে যে স্বেচ্ছাচারিতা দেখাতে পারছেন, তার মূলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা। এখন আঞ্চলিক শক্তিগুলো যদি ট্রাম্প দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিবেশী ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর সব অপছন্দের নেতাকে ধরে ধরে বন্দি কিংবা হত্যা করা শুরু করে, তাহলে দুনিয়ার হাল কী হবে, সেটি কারা ভাববেনÑএটাই তো ভেবে পাচ্ছি না।

মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের পতিত ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনাও নিজের ক্ষুদ্র চৌহদ্দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতোই দাপট দেখাতেন। শেখ হাসিনার কিসিমের শাসকদের জন্য ইংরেজিতে ‘টিনপট ডিক্টেটর’ নামে একটি কথা চালু আছে। সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের ওই নামে ডাকা হয়ে থাকে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আটক ভেনেজুয়েলার মাদুরোকেও নিশ্চয়ই অনেকে একই নামে ডাকবেন।

প্রসঙ্গক্রমে শেখ হাসিনার কাজকারবার স্মরণ করা যাক। তিনিও নোবেল পুরস্কারের জন্য দেওয়ানা হয়ে গিয়েছিলেন। প্রফেসর ইউনূসের নোবেলপ্রাপ্তির ‘অপরাধ’ তিনি কোনো দিন ক্ষমা করতে পারেননি। নোবেল না পাওয়ার দুঃখে শেখ হাসিনা দুনিয়ার ছোট-বড় রাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পেলেই সেখান থেকে নাম না জানা সব পুরস্কার কিনে আনতেন। বিএ পরীক্ষায় কোনোক্রমে কম্পার্টমেন্টাল পেয়ে পাস করা হাসিনা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা দিয়ে ডজনখানেক ‘সম্মানসূচক ডক্টরেট’ ডিগ্রি জোগাড় করেছিলেন। তিনি ম্যাডামের পরিবর্তে স্যার ডাক শুনতে পছন্দ করতেন।

শেখ হাসিনার এক তথাকথিত সাংবাদিক চামচা একাত্তর টেলিভিশনের মোজাম্মেল বাবু তাকে গণভবনের কথিত সংবাদ সম্মেলনে তেল দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আপা, আপনি তো বিশ্বনেত্রী হয়ে গেছেন, আপনাকে আর আমরা পাব না।’ সেই তেলবাজিতে শেখ হাসিনা সেদিন একেবারে গলে গিয়েছিলেন। এসবই তার প্রচণ্ড ইগো এবং সেই সঙ্গে প্রবল হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ ছিল।

অন্যদিকে তিনি ভয়ানক রকম নির্মম ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো কোনো বিদেশি রাষ্ট্রে আগ্রাসন চালানোর ক্ষমতা তার না থাকলেও তিনি নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর সব ধরনের নির্যাতন চালিয়েছেন। তার অতোষণীয় রক্ততৃষ্ণা ছিল। স্বজন হারানোর বেদনার কথা বলে তিনি শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ এবং নারী, পুরুষ নির্বিশেষে নির্বিচারে খুন করিয়েছেন। বিরোধীদের রিমান্ডে নিয়ে তাদের ওপর নির্যাতনের গল্প শুনতে তিনি পছন্দ করতেন।

জানতে চাইতেন নির্যাতনের সব যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কি না! বিশ্বস্ত সূত্র থেকে শুনেছি, বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষের ওপর শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশ ছিল, যাতে ম্যাডামের দৈনন্দিন অপমান ও হয়রানির ছবি তুলে তাকে পাঠানো হয়। অবাক লাগে ক্ষমতাপ্রাপ্তির আনন্দে বিভোর বিএনপির মন্ত্রীদের আজ আর এগুলো জানতে ইচ্ছে করে না। তারা তো নাকি সব জেনে মহত্ত্ব দেখিয়ে ফ্যাসিস্টদের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন। যাহোক, ‘টিনপট ডিক্টেটর’ হাসিনার একটানা ফ্যাসিস্ট শাসন পনেরো বছরের বেশি টেকেনি। তাকে প্রতিবেশী দেশের সমচরিত্রের প্রভুর আশ্রয়ে শরণ নিতে হয়েছে। যুগে যুগে বিশ্বের সর্বত্র এটাই ‘টিনপট ডিক্টেটরদের’ অবধারিত পরিণতি। পবিত্র কোরআন শরিফে আল্লাহতায়ালা মানুষের ক্ষমতার অনিয়ন্ত্রিত দাপট দেখানোর বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

সুরা বাকারার ২৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আমি যদি মানুষের একটা দলকে অন্য একটি দল দিয়ে দমন না করতাম, তাহলে দুনিয়ার শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যেত।’ অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, তাই যদি হবে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এভাবে সারা পৃথিবীর ওপর কেমন করে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার চর্চা করছে? তাদের কেন অন্য কেউ দমন করতে পারছে না? উত্তর হলো, ইতিহাস একদিনে রচিত হয় না। আজ যুক্তরাষ্ট্র যে ক্ষমতা দেখাচ্ছে, একসময় পারস্য সাম্রাজ্যের প্রায় তেমনই ক্ষমতা ছিল।

যিশুখ্রিষ্টের জন্মের অন্তত পাঁচশ বছর আগে পারস্য সম্রাট সাইরাস এবং দারিউসের জমানায় তারাই বিশ্বে প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। হিন্দুস্তান থেকে ইউরোপ পর্যন্ত পারস্য সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি ছিল। প্রাচীন ব্যাবিলন সভ্যতার পতন হয়েছিল পারস্যের হাতে। আবার পরবর্তী পারস্য সম্রাট পরাজিত হয়েছিলেন ম্যাসিডোনিয়ার আলেক্সজান্ডারের কাছে।

সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি জোরোস্ত্রিয়ান পারস্য এবং খ্রিষ্টান বাইজেন্টাইনের মিলিত শক্তিকে পরাভূত করেছিলেন হজরত ওমরের (রা. আ.) মুসলিম আরব বাহিনী। পনেরো শতকে তুরস্কের উসমানীয় খিলাফতের আকারও প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে তুলনীয় ছিল। আজ থেকে মাত্র দেড়শ বছর আগে রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনামলে বলা হতো, পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে নাকি সূর্য অস্ত যায় না। আড়াইশ বছর আগে আমেরিকা ব্রিটেনের কলোনি ছিল।

আজ সেই মহাপ্রতাপশালী ব্রিটেন সংকুচিত হতে হতে শুধু ইউরোপের অভ্যন্তরের এক ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। এভাবেই পৃথিবীতে ক্ষমতার চাকা অনবরত ঘুরে চলেছে, যার কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা সুরা বাকারায় বলেছেন। সুতরাং, আজকে যারা ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন, তাদের আয়ুষ্কালও সীমিতই হবে। এশিয়ায় যেভাবে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান হচ্ছে, তাতে করে দীর্ঘ সময় বর্তমানের একপক্ষীয় জায়োনিস্ট বিশ্বব্যবস্থা টিকে থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। স্যামুয়েল হান্টিংটন নব্বইয়ের দশকে তার ভাষায় ‘জুডো-ক্রিশ্চিয়ান’ বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামিক বিশ্ব এবং কনফুসিয়ান চীনের সভ্যতার লড়াইয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। আমরা এই অনর্থক যুদ্ধবিবাদ চাই না। বিশ্বব্যবস্থায় ভারসাম্য ফেরার মাধ্যমে ক্ষমতায় মদমত্ত মানুষদের সংবিৎ ফিরে আসুক—এটাই প্রত্যাশা করি।