
ফেনীর পরশুরামের বক্সমাহমুদে ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের সঙ্গে তার আপন বড় ভাইয়ের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ঘটনায় ফাঁসানো হয়েছিল মোজাফফর আহমদ (২৫) নামের এক ইমামকে। এক মাস দুদিন কারাভোগের পর এই মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন।
ফরেনসিক পরীক্ষাসহ পুঙ্খানুপঙ্খ তদন্ত শেষে গত ১৭ এপ্রিল মামলা থেকে মোজাফফরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কিশোরীর বড় ভাই মোরশেদকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে পুলিশ। অব্যাহতি সংক্রান্ত নথি হাতে আসার পর তা গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন মোজাফফর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে মক্তবের পাঠ শেষ করে ওই কিশোরী (১৪)। এর পাঁচ বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান প্রসব করে সে। এর দায় চাপানো হয় ওই মক্তবের শিক্ষক মোজাফফর আহমদের কাঁধে। ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার হয়ে একমাস কারাভোগের পর ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, তিনি নিরপরাধ ছিলেন। ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, গর্ভজাত সন্তানের সঙ্গে কিশোরীর আপন বড় ভাই মোরশেদের ডিএনএর মিল রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ওই কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে একই গ্রামের স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক মোজাফফরের বিরুদ্ধে পরশুরাম মডেল থানায় মামলা করা হয়। নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করলেও ছাড় পাননি মোজাফফর। অভিযোগ মিথ্যা উল্লেখ করে ওই পরিবারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর ফেনীর আদালতে মামলা করতে যান মোজাফফর। এসময় আদালত প্রাঙ্গণ থেকে গ্রামের মাতুব্বর ও এক নারী তাকে জোরপূর্বক পুলিশের হাতে তুলে দেন। এরপর একমাস দুদিন কারাভোগ করেন তিনি।
একই বছরের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফরকে ঢাকার মালিবাগে পুলিশের সিআইডি বিভাগের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সশরীরে ও কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ঢাকার মালিবাগের ফরেনসিক ল্যাবরেটরি থেকে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ডিএনএ প্রতিবেদন পান পরশুরাম মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল ইসলাম।
ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, পরীক্ষায় ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ভ্যাজাইনাল সোয়াবে বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত না হওয়ায় মোজাফফরের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তুলনা করে মতামত দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর ওই কিশোরী ও তার সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুকন্যা সন্তানের জৈবিক পিতা নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য তাদের পরীক্ষাগারে উপস্থিত হয়ে ডিএনএর নমুনা দিতে আদালতে আবেদন করা হয়।
এরমধ্যে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে বিস্ময়কর তথ্য। ডিএনএ রিপোর্টে কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএর মিল না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিশোরীকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে সে তার আপন বড় ভাই মোরশেদ তাকে গণহারে ধর্ষণ করেছে বলে স্বীকারোক্তি দেয়।
পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে বড় ভাই মোরশেদকে (২২) গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আপন বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ২০ মে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন মোরশেদ। এ ঘটনায় গ্রেফতারের পর থেকে তিনি ফেনী জেলা কারাগারে।
আদালতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই কিশোরী ও তার ভূমিষ্ঠ সন্তান এবং বড় ভাই মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য একই বছরের ৪ আগস্ট ঢাকায় পুলিশের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ভিকটিমের সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুকন্যার সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ নমুনা মিলে যাওয়ায় তিনি তার জৈবিক পিতা।
ডিএনএ পরীক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডিএনএ পরীক্ষায় মোরশেদের সঙ্গে শিশুটির পিতা হিসেবে ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত করে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর অভিযোগপত্র থেকে তার (ইমাম) নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর জন্য চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক ছিলেন মোজাফফর আহমেদ। এ ঘটনার পর মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারান তিনি। মামলার খরচ জোগাতে বিক্রি করেন পাঁচ শতক জমি। প্রতিনিয়ত সামাজিকভাবে হেয় হয়েছেন। এসব কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ওই গ্রামের আবুল বশরের ছেলে মোজাফফর আহমদ।
মোজাফফর আহমদ বলেন, অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। এ ঘটনায় আমি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছি। মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশে মূল্যবান জায়গা বিক্রি করেছি। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এসময় কারাভোগ, সামাজিক মর্যাদাহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি।
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্নি, কওমি বা সরকারি বুঝি না, সে একজন মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। ক্ষতিগ্রস্ত ইমামের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তাকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়ার পাশাপাশি, আর্থিক ও আইনিভাবে সহযোগিতা করা উচিত।’
মোজাফফর আহমেদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা বিরল। তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় সত্য উদঘাটন হয়েছে।’
সূত্র : জাগো নিউজ













































