প্রচ্ছদ হেড লাইন রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট: নুরকে ছাড়ার পরই নুসরাতের ভাগ্য বদল

রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট: নুরকে ছাড়ার পরই নুসরাতের ভাগ্য বদল

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতিকে নির্বাচিত এমপি হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মাধ্যমে সর্বকনিষ্ঠ এমপিদের একজন হিসেবে জাতীয় সংসদে যাচ্ছেন তিনি। ২০১৮ সালে রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখা নুসরাত মাত্র ৭ বছরের মধ্যেই এমপি হলেন। বর্তমানে তার বয়স মাত্র ২৫ বছর।

২০০১ সালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের বাগোয়ান গ্রামে জন্ম নুসরাত তাবাসসুমের। বাবা-মা উভয়ই শিক্ষক। তিনি স্থানীয় বাগোয়ান কে সি ভি এন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন ড. ফজলুল হক গার্লস ডিগ্রি কলেজে। তিনি বিতর্ক, হস্তশিল্প, আবৃত্তি ও নাটকেও সক্রিয় ছিলেন।

২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে (২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ) ভর্তি হন নুসরাত। থাকতেন শামসুন্নাহার হলে। সাত কলেজ অধিভুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন, বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যা ও ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তখনকার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হলে তাদের হাতে নির্যাতনের শিকারও হন তিনি।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যাত্রা শুরু হওয়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহবায়ক এবং দলটির নারী শাখা জাতীয় নারী শক্তির প্রধান সংগঠক নুসরাত। তিনি ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় রাজনীতির হাতে খড়ি নেন। কলেজ শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি আন্দোলনে সক্রিয় হয়েছিলেন। সে সময় তিনি ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আন্দোলনকারীদের নির্যাতনের শিকার হতে দেখেন।

২০২৪ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন নুসরাত। ৮ জুলাই ৬৫ সদস্যের সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়কের মধ্যে তিনি প্রভাবশালী ছিলেন। এরইমধ্যে ২৮ জুলাই তাকে মিরপুরের এক আত্মীয়ের বাসা থেকে ১০-১৫ জন সাদা পোশাকধারী সশস্ত্র ব্যক্তি ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যান। সেদিন আরও আটক হন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আবু বকর মজুমদার।

২০২১ সালে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে একই শাখার যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০২৩ সালে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করলেও পরাজিত হয়ে সহকারী সাধারণ সম্পাদক হন।

পরবর্তীতে গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) সভাপতি এবং বর্তমানে ছাত্র, যুব ও প্রবাসী অধিকার পরিষদের সমন্বয়ক নুরুল হক নুরের দলের কর্মকাণ্ডে হতাশ হয়ে পড়েন নুসরাত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

সংগঠনটির কার্যক্রম নিয়ে হতাশা থেকে আসিফ মাহমুদসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পুরো কমিটি নিয়ে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন নুসরাত। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি গঠন হলে নুসরাত যোগ দেন এবং প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম সংগঠক সম্পাদক ছিলেন। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর আখতার হোসেনের নেতৃত্বে এ সংগঠনটি গঠিত হলে নাহিদ ইসলামকে সদস্য সচিব করা হয়।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়ক হিসেবে নুসরাত ব্যাপক পরিচিতি পান। এ আন্দোলনের ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং আওয়ামী লীগ সরকার পতন ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নুসরাত অভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র হলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক হন। ওই বছরের ২৮ জুলাই ডিবি পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। সে সময় আটক হওয়া ছয় নেতার মধ্যে তিনি একমাত্র নারী সমন্বয়ক ছিলেন। তাকে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হলেও ১ আগস্ট মুক্তি পেয়েই ফের আন্দোলনে যোগ দেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র হলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক হন।

অভ্যুত্থান চলাকালে নুসরাত নারী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে অভিহিত করার পর তিনি সমন্বয়ক আশরেফার সঙ্গে হল থেকে নারী শিক্ষার্থীদের বের করে আনেন এবং প্রায় সব নারী হলের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগদান করাতে সক্ষম হন। এটি দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ছিল।

২০২৪ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন নুসরাত। ৮ জুলাই ৬৫ সদস্যের সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়কের মধ্যে তিনি প্রভাবশালী ছিলেন। এরইমধ্যে ২৮ জুলাই তাকে মিরপুরের এক আত্মীয়ের বাসা থেকে ১০-১৫ জন সাদা পোশাকধারী সশস্ত্র ব্যক্তি ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যান। সেদিন আরও আটক হন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আবু বকর মজুমদার।

ডিবি হেফাজতে তাদের তীব্র মানসিক নির্যাতন করা হয়। তাদের আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে পরে তারা দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ডিবি কার্যালয়েই অনশন শুরু করেন। এর ৩২ ঘণ্টা পর ডিবি প্রধান ছয় সমন্বয়ককে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

১ আগস্ট নুসরাতসহ অন্য মুক্তি পেয়ে ফের আন্দোলনে যোগ দেন এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপি গঠনের পর নুসরাত এতে যোগ দেন এবং যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পান। চলতি বছরের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দলটির নারী শাখা জাতীয় নারী শক্তির যাত্রা শুরু হয়।

নুসরাতকে এ সংগঠনের প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত মাসে ১৩তম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে তাকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে ২১ এপ্রিল শেষ দিনে তিনি নির্ধারিত সময়সীমার (বিকাল ৪টা) ১৯ মিনিট পর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন প্রথমে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিল। তবে তিনি এটি পুনর্বহাল চেয়ে হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করেন। পরে নির্বাচন কমিশনকে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। গত ২ মে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে তা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

মানবাধিকার সংস্থা ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডাস্র্ নুসরাত তাবাসসুমকে মানবাধিকার রক্ষাকর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থান তাকে আটক ও নির্যাতনের ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে। তিনিসহ আরও পাঁচ সমন্বয়কের আটক ও হয়রানির নিন্দা জানিয়ে এটিকে তাদের বৈধ মানবাধিকার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নুসরাতসহ সমন্বয়কদের ভূমিকাকে বিশ্বের প্রথম সফল ‘জেন-জি বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এতে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিলে, যেখানে নুসরাত ছিলেন সমন্বয়কের ভূমিকায়। স্বল্প সময়ে ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের নুসরাত এবার জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধি হিসেবে ভূমিকা রাখবেন।

সূত্র : The Daily Campus