প্রচ্ছদ জাতীয় আওয়ামী সুবিধাবাদী, ওয়ার্ড বিএনপি নেতার কাছে অসহায় পুলিশ

আওয়ামী সুবিধাবাদী, ওয়ার্ড বিএনপি নেতার কাছে অসহায় পুলিশ

কুমিল্লায় আব্দুল কুদ্দুস নামে এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও হামলাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে থানায় একাধিকবার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ কুদ্দুসকে তলব করলেও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাড়া দেননি তিনি। স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারাও অনেকটা অসহায়।

আব্দুল কুদ্দুসের বাড়ি কুমিল্লার সদর উপজেলার ১ নম্বর কালীর বাজার উত্তর ইউনিয়নের পশ্চিম জাঙ্গালিয়া গ্রামে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। অন্যদিকে ভুক্তভোগী আব্দুল বারেক তারই বড় ভাই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ছিলেন কুদ্দুস।

সেসময় এক আওয়ামী লীগ নেতার ছাত্রছায়ায় নিজের বড় ভাইয়ের পরিবারের নামে বেশ কয়েকটি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর রাতারাতি হয়ে যান বিএনপি নেতা। হয়ে ওঠেন আরো বেপরোয়া।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে বড় ভাই বারেকের সঙ্গে জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে কুদ্দুসের।

এ নিয়ে বেশ কয়েকবার সালিশ বসে। সালিশের সিদ্ধান্ত বারেক মেনে নিলেও কুদ্দুস মানেননি। ২০২০ সালে বারেক ও তার পরিবারের নামে প্রথম মামলা করেন কুদ্দুস। এর কয়েক দিন পর আরো একটি মামলা করেন। এই দুই মামলা খারিজ হলে আরো একটি করেন।
এভাবে এখন পর্যন্ত সাতটি মামলা করেছেন কুদ্দুস। এর মধ্যে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ দিতে না পারায় ৬টি খারিজ হয়ে যায়। গত এপ্রিলে সপ্তম মামলাটি করেন কুদ্দুস।

ভুক্তভোগী আব্দুল বারেকের অভিযোগ— গত বছরের ১৮ অক্টোবর তার বসতবাড়ির সীমানার গাছ কাটতে গেলে বাধা দেন কুদ্দুস। এ সময় কুদ্দুস বলেন, ‘গাছ কাটলে কোপাইয়া ফানা ফানা করে ফেলমু’। সে সময় ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সহযোগিতা চান বারেক। পরে পুলিশ গিয়ে বিষয়টি মিমাংসার জন্য দুইপক্ষকে ফাঁড়িতে যেতে বলে। পুলিশ চলে যাওয়ার পরপরই কুদ্দুস তার দলবল নিয়ে হামলা চালান বারেকের পরিবারের ওপর। এতে বারেকের স্ত্রীর পা ভেঙে যায়। পরে পুলিশ দুই দফা দুইপক্ষকেই ফাঁড়িতে ডাকে, তবে কুদ্দুস এতে সাড়া দেননি।

এর আগে গত বছর কুরবানির ঈদের দিন কুদ্দুস বারেকের ঘরের পাশে গরুর নাড়ি-ভূড়ি ফেলে রাখেন। প্রতিবাদ করায় বারেককে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনার সপ্তাহখানেকের মাথায় বারেক ও তার দুই ছেলের নামে মামলা দেন কুদ্দুস।

সবশেষ গত ২৮ এপ্রিল সকালে ঝড়ে কুদ্দুসের একটি গাছ ভেঙে পড়ে বারেকের ঘরের ওপর। এতে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হলেও সারা দিনে গাছ সরানোর ব্যবস্থা নেননি কুদ্দুস। ভুক্তভোগী পরিবার ক্ষতিপূরণ চাইলে উল্টো হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলে গত ১ মে পুলিশ সরেজমিনে গিয়ে দুইপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দুইদিন পর ফাঁড়িতে যেতে বলে। তবে বারেক ও তার ছেলে মাহবুব থানায় গেলেও এবারও যাননি কুদ্দুস।

এ বিষয়ে নাজিরা বাজার পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আবু তাহের বলেন, ‘দুইপক্ষকেই ফাঁড়িতে ডাকা হয়েছিল। এক পক্ষ এলেও কুদ্দুস আসেননি। তিনি আসবেন না, সেটাও জানানি। পরে তাকে ফোন করলে জানান, তিনি ফাঁড়িতে আসবেন না।’

শুধু বারেকের ঘরেই নয়, কুদ্দুসের আরো একটি গাছ প্রতিবেশী কবিরের ঘরের ওপর পড়েছে। এতে ওই ঘরেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। বর্ষা মৌসুমে আরো বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা করছেন প্রতিবেশীরা।

স্থানীয়রা জানান, এলাকায় কুদ্দুসের বেপরোয়া আচরণ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে মামলার আসামি হয়েছেন, জেলও খেটেছেন। ২০০৬ সালের একটি মামলার নথি অনুযায়ী, ওই বছরের ১০ মার্চ নিজের মা শামসুন্নাহার ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রী লুৎফা বেগমকে বেধড়ক পেটান তিনি। ওই মামলায় জেলেও যেতে হয়। ২০০৭ সালের ২৯ জুন রাতে রফেজা খাতুন নামে এক নারীর ওপর এডিস ছোড়েন কুদ্দুস। এ ঘটনায় রফেজা খাতুনের মামলায় কিছু দিন জেল খাটেন তিনি। একই বছর রাতের আঁধারে রফেজার ধানি জমি থেকে সব ধান কেটে নিয়ে আসেন কুদ্দুস ও তার লোকজন। এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এলাকায় ফিরেই প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে প্রতিবেশী এক নারীর ঘরে আগুন দেন কুদ্দুস। আগুন নেভাতে সবাই এগিলে গেলে কুদ্দুস রামদা হাতে বাধা দেন।

একই বছর বিদ্যুতের পিলারের টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বে রশিদ নামে এক প্রতিবেশীকে মারধর করেন কুদ্দুস। রশিদের ছোট ভাই মনির এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তাকে রামদা হাতে ধাওয়া করেন। এ ছাড়া আলী আশ্রাফ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে তার ছেলে শাহজালালকে ধরে নিয়ে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক পেটান কুদ্দুস।

প্রায় ছয় বছর আগে নিজের ছোট ভাই আব্দুর রবকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন কুদ্দুস। আব্দুর রবকে বাঁচাতে বারেক এগিলে গেলে তাকেও মারধর করা হয়।

আব্দুল বারেক বলেন, ‘২০ বছর ধরে কুদ্দুস আমাদের ওপর অত্যাচার করছে। জোর করে আমার জমি দখল করে রেখেছে। আমার জমিতে গাছ লাগিয়েছে, সেই গাছ কটাতে যাওয়ায় আমার পরিবারের ওপর হামলা করছে। শুধু তাই নয়, আমার ও আমার ছেলে-মেয়ের নামে ৬টি মিথ্যা মামলা করেছে। এর মধ্যে একটি জমি সংক্রান্ত মামলা। এই মামলায় আদালতের রায় আমার পক্ষে এলেও সেই জায়গায় থাকা গাছ কাটতে দিচ্ছে না।

স্থানীয় বিএনপির কমিটিতে পদ পেয়ে কুদ্দুস আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলেও অভিযোগ করেন আব্দুল বারেক।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুম বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়গুলো শুনেছি। আগামী শনিবার ভুক্তভোগীর বাড়িতে যাব। দুইপক্ষকে নিয়ে বসে সমাধান করার চেষ্টা করব।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে আব্দুল কুদ্দুসকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি নামাজের পর কথা বলব।’ এরপর কয়েকবার কল করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবার থানায় অভিযোগ দিয়েছিল। তাদের জিডি করতে বলা হয়েছে। জিডি করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’