
শিরোনামের দুটি বাক্যেরই রয়েছে চমৎকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। প্রথমটি উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার জামানার। আর দ্বিতীয়টি হলো মহাকালের অন্যতম সেরা শাসক সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজদরবারের কাহিনী। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব; কিন্তু তার আগে বান্দর ও বারবনিতা নিয়ে কিছু বলা আবশ্যক।
সুবে বাংলায় বান্দরের প্রমিত বা ভদ্র প্রতিশব্দ হলো বানর বা বাঁদর। কিন্তু বাঙালির যে স্বভাব তাতে বানরকে বান্দর না বললে তাদের মনের ঝাল মেটে না। বাঙালির বান্দরপ্রীতির দুটি নমুনার কথা বলি। প্রথমটি হলো বাংলাদেশের একটি বৃহত্তম জেলার নাম বান্দরবান।
আর দ্বিতীয়টি হলো জাতীয় চিড়িয়াখানায় বান্দরের খাঁচা। আপনি যদি ঢাকা চিড়িয়াখানায় ঢোকেন, তাহলে সবার আগে দেখতে পাবেন শত শত লোক বান্দরের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে বান্দরের অসভ্যতা দেখছেন এবং এক অপার্থিব আনন্দে ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ হেসে কুটি কুটি হচ্ছে।
বান্দর প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত প্রাণী। তারা পশুদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং আচার-আচরণে মানুষের কাছাকাছি।
পৃথিবীতে ২৬০ প্রজাতির বান্দর রয়েছে। এগুলোর মধ্যে নতুন দুনিয়া বা New World Monkey-রা দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় বাস করে। অন্যদিকে পুরনো দুনিয়ার বা Old World Monkey-রা বসবাস করে এশিয়া ও আফ্রিকায়। সুতরাং আমাদের বান্দরগুলো সব প্রাগৈতিহাসিক জামানা থেকে একই রকমভাবে বাঁদরামি চালিয়ে যাচ্ছে।
বান্দর দল বেঁধে বসবাস করে এবং একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য এরা পরস্পরের লোম ধরে টানাটানি—একে অপরের শরীরে চুলকিয়ে কিংবা পরস্পরের লোম পরিষ্কার (Grooming) করে থাকে।
রাজনীতির বান্দরনাচ! রাজদরবারে বারবনিতা!এবার বান্দর বাদ দিয়ে বারবনিতা নিয়ে কিছু তথ্য দিই। বাংলা ভাষায় বারবনিতা শব্দটি এসেছে বার বা সাধারণ বা সর্বজনীন শব্দ থেকে। অন্যদিকে বনিতা শব্দের অর্থ নারী। সুতরাং বারবনিতা শব্দের অর্থ যিনি সর্বসাধারণের জন্য লভ্য। বারবনিতার প্রতিশব্দ গণিকা ও পতিতা। গণিকা শব্দের অর্থ হলো যারা নৃত্য-গীত এবং বিভিন্ন ছলাকলায় পারদর্শী। আবার পতিতা শব্দ দ্বারা সাধারণত পদচ্যুত বা অশুচি বোঝায়। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা বারবনিতা, গণিকা ও পতিতার শব্দগত ব্যুৎপত্তির ঝামেলা এড়ানোর জন্য যৌনকর্মী বা sex Worker শব্দ ব্যবহার করার পক্ষপাতী। তাঁরা দুনিয়াজুড়ে এই কর্মকে একটি প্রেম বা পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
আলোচনার এই পর্যায়ে রাজনীতিতে বান্দরনাচের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করব। আপনারা সবাই উমাইয়া শাসক কুখ্যাত ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার নাম জানেন। উমাইয়া রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক ইয়াজিদ ৬৮০ সালের এপ্রিল মাসে সিংহাসনে বসেন এবং তিন বছর শাসন শেষে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর স্বল্পকালীন শাসনকালে রাজনীতিতে যে বদনজির স্থাপিত হয়েছে তা অন্যকোনো রাজা-বাদশাহ বা সম্রাটের জামানায় ঘটেনি।
তিনি একটি বানর পুষতেন। তাঁর বানরটির জন্য রাজদরবারে তিনি একটি সিংহাসন স্থাপন করেছিলেন। তিনি যেভাবে রাজকীয় পোশাক পরিধান করে এবং হীরা-মণি-মুক্তাখচিত রাজমুকুট মাথায় দিয়ে রাজদরবারে আসতেন, তেমনি তাঁর বানরটিকেও অনুরূপভাবে সজ্জিত করা হতো। রাজদরবারের আমির-ওমরাহ ও অভ্যাগত অতিথিদের জন্য নিয়ম ছিল তাঁরা প্রথমে ইয়াজিদকে কুর্নিশ করবেন, তারপর তাঁর পাশের সিংহাসনে বসা বানরটিকে কুর্নিশ করবেন। যাঁদের অনুমতি ছিল খলিফার হস্ত চুম্বনের, তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে বানরের হাতও চুম্বন করতে হতো।
ইয়াজিদের রাজ্যে তাঁর পোষা বানরটি ছিল রাষ্ট্রের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাকে নিয়ে গান-কবিতা, ছবি অঙ্কন প্রতিযোগিতার মহড়া চলত। ইয়াজিদকে খুশি করার জন্য রাজ্যময় বানর তোষণ, বানর পালন হয়ে উঠল আভিজাত্যের প্রতীক। আমির-ওমরাহ, সেনাপতি-কোতোয়াল এবং প্রাদেশিক গভর্নররা বানর পুষতেন। তাঁদের মধ্যে ইরাকের গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের বানরটি ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনিও ইয়াজিদের অনুকরণে তাঁর সিংহাসনের পাশে তাঁর পোষা বানরের জন্য একটি সিংহাসন নির্মাণ করেছিলেন এবং ইয়াজিদের দরবারের অনুকরণে তাঁর দরবারেও বান্দর তোষণ ছিল বাধ্যতামূলক।
ইয়াজিদের দরবারে বান্দরের রাজত্বের পাশাপাশি জনৈকা বারবনিতার দাপট ছিল সীমাহীন। ইয়াজিদ প্রকাশ্য দরবারে বারবনিতার সঙ্গে ঢলাঢলি করতেন এবং সব রাজকীয় সিদ্ধান্তে বারবনিতার অনুমোদন নিতেন। দরবারের আমির-ওমরাহ, আলেম-উলামা ও অভিজাতবর্গ আড়ালে-আবডালে কানাঘুষা শুরু করলেন এবং সেই খবর ইয়াজিদের কানে এলে তিনি যে কাণ্ড করলেন তা ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেছেন বটে; কিন্তু ২০২৬ সালের বাংলাদেশে সেই কাহিনী লিখতে আমি সাহস পাচ্ছি না। কারণ আমাদের দেশে ইয়াজিদ সমর্থকদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, যারা মনে করেন ইয়াজিদ হলো আলা হজরত এবং অতি উত্তম শাসক।
ইয়াজিদ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে এবার চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে নিয়ে আলোচনা শুরু করি। তিনি ভারতবর্ষ শাসন করেন ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ২৫ বছর। আজকের ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপালসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাঁর গৌরবময় শাসন মানবজাতির ইতিহাসের এক কিংবদন্তির অধ্যায়। তাঁর সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল প্রায় ৫০ লাখ বর্গমাইল, যা বর্তমান ভারতের আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ। তিনি ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী চাণক্য ওরফে বিষ্ণু গুপ্তর সম্মিলিত চেষ্টায় সুশাসন—ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের যে মাইলফলক স্থাপিত হয়েছিল তা ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্য কোনো শাসকের জামানায় ঘটেনি।
চাণক্যের বিশ্ববিখ্যাত অর্থশাস্ত্রে বর্ণিত আছে যে রাষ্ট্র পতিতাবৃত্তিকে একটি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এই পেশাকে কেন্দ্র করে নাচ, গান, নাটক, হাটবাজার ইত্যাদির পরিধি এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে সরকার সেখানে কর বসিয়ে রাষ্ট্রের আয়-রোজগার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তৈরি করা হয় গণিকা মন্ত্রণালয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর উপাধি হয় গণিকামন্ত্রী। এই মন্ত্রণালয়ের আয়-রোজগার হু হু করে বাড়তে থাকে। ফলে রাজদরবারে গণিকামন্ত্রীর প্রভাব স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র অথবা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।
সমাজের সর্বত্র গণিকারা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং সমাজে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল। তৎকালীন জামানায় গণিকা বলতে শুধু দেহ ব্যবসায়ী বোঝাত না, গণিকা হতে হলে নৃত্যকলা, সংগীত, শিল্পকলাসহ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হতো। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া ও গ্রিসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যৌনবৃত্তিকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। একে বলা হতো Sacred prostitution বা পবিত্র গণিকাবৃত্তি। মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতায় দেবী ইন্নানার মন্দিরে এমন প্রথা চালু ছিল। ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে দেবদাসী প্রথা চালু ছিল, যেখানে নারীদের মন্দিরের সেবায় উৎসর্গ করা হতো।
ভারতে মোগল যুগেও উল্লিখিত ধারা বিবর্তিত রূপে চালু ছিল। এই সময়ে তওয়ায়েফ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। তাঁরা ছিলেন ধ্রুপদী নাচ, গান ও শিষ্টাচারের কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন অভিজাত পরিবারের সন্তানরা তাঁদের কাছে আদব-কায়দা শিখতে যেত।
আমরা আজকের আলোচনার একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এবার উপসংহারের পালা। রাজা যখন চরিত্রহীন, কাণ্ডজ্ঞানহীন এবং উন্মাদে পরিণত হন, তখন রাজনীতি-রাজসিংহাসন-রাজদরবারে বান্দরনাচের মতো অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে। মানবপ্রেমের চেয়ে পশুপ্রেম এবং মানবতার চেয়ে পশুত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় তলোয়ার যখন মানুষের গর্দানের ওপর ঝুলতে থাকে, তখন ভুক্তভোগীরা বান্দরনাচের রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
অন্য দিকে রাষ্ট্র যখন অর্থ উপার্জনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং রাজারা প্রচণ্ড অর্থলোভী হয়ে পড়েন, তখন রাজদরবারে বারবনিতার গুরুত্ব হু হু করে বাড়তে থাকে।
লেখক: রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক।












































