
রাজধানীর মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবির আন্দোলনকে পুঁজি করে সহিংসতা, নাশকতার চেষ্টা এবং পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠনের ২৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর-১০, ১১ ও আশপাশের এলাকা থেকে সরাসরি নাশকতার পরিকল্পনা ও সংঘর্ষের সময় ১১ জনকে আটক করেছে ডিবি মিরপুর বিভাগ। আর সহিংসতা চালিয়ে মিছিল বের করার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বাকি ১৭ জনকে আটক করেছে ডিএমপির মিরপুর বিভাগ।
ডিবির হাতে গ্রেপ্তাররা হলো—মিরপুরের রূপনগর আওয়ামী লীগের সদস্য ও লোক সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করা মো. কামাল গাজী, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার মো. ওলিউল্লাহ অনিক, মুন্সীগঞ্জের আলিফ হোসেন ইমন, গাইবান্ধার আরিফ আকন্দ, কক্সবাজারের ঈদগা থানার জায়েদ করিম রিয়াজ ও মোয়াজ্জেম শাহরিয়া (নিয়াজ)। সাভারের আশুলিয়ার জুবায়েদ ইসলাম জিসান, পঞ্চগড়ের মো. নাহিদ হাসান, মাদারীপুরের মো. মাহিম মোল্লা, মিরপুর কাজীপাড়ার আরিফ। গ্রেপ্তাররা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠেনর সক্রিয় নেতাকর্মী বলে দাবি পুলিশের। তারা মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নিয়ে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগে ইন্ধন দিচ্ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রোববার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান এবং ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) আবু নাসের রিকাবদার।
ডিবির উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, আটকদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। গ্রেপ্তার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তারা মাঠ পর্যায়ে আন্দোলনে উপস্থিত থেকে এসব গ্রুপে ছবি ও ভিডিও পাঠাচ্ছিল। তাদের কাছ থেকে আর্থিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঢাকার পল্লবী ও রূপনগর (ঢাকা-১৬ আসন) এলাকার পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা ও রূপনগর এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী শুভ নাশকতার মূল ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে কাজ করছেন। তারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দলীয় কর্মীদের সংগঠিত করে মিরপুরে এনেছেন।
রোববারের এই সহিংসতায় প্রায় শতাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে উপস্থিত ছিলেন। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মিরপুর থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ১৭ জনের মধ্যে রাকিব ও আরিফ নামের দুজনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা মিরপুর ১১ নম্বরে মেট্রোরেল স্টেশনের পাশে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত। তাদের মোবাইল ফোনে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ছবি, ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। বাকিদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আন্দোলন ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ছাত্রলীগ নেতার পোস্ট সামনে এসেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিবুল ইসলাম রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আন্দোলন সংক্রান্ত একাধিক ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, আওয়ামী লীগ কারও ওপর ভর করে নয়, জনগণের শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় আসার কর্মসূচি দেবে। এর আগে তিনি শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা বেতনের আন্দোলনের নানা ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেন, যা নাশকতায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
পুলিশের অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: রোববার বেলা ১১টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বরে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে থাকা পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও টিয়ার গ্যাসের শেল-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মেট্রোরেলের পল্লবী, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশনে ট্রেন চলাচল সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়।
দুপুরে সংঘর্ষ শেষে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে সাংবাদিকদের ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এরপরও তারা সড়ক ছাড়ছিলেন না। পুলিশের কাছে মনে হয়েছে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়ে সড়ক পরিষ্কার করা হয়েছে। জনভোগান্তি কমাতে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো লাঠিচার্জ করা হয়নি। সাধারণ কাউকে আটকও করা হয়নি। পুলিশের কোনো সদস্য আহত হননি।








































