
হেফাজতের উদ্যোগে কওমি ধারার ৭ ইসলামি দল নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ঐক্যের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাতে সাত দলই তাদের প্রস্তাবনা ও রূপরেখা জমা দিয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ধারার সাত ইসলামি দলকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ঐক্যের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাতে সাত দলই তাদের প্রস্তাবনা ও রূপরেখা জমা দিয়েছে। তবে এসব প্রস্তাবনা বা রূপরেখায় কী কী বিষয় রয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি হেফাজত বা সংশ্লিষ্ট কোনো দল। এরই মধ্যে সাত দলের মহাসচিব ও দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঐক্যের আদর্শিক ভিত্তি, অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক, নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মকৌশল, নেতৃত্ব কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নতুন দলকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রস্তাব দিয়েছে দলগুলো।
গত ১৬ জুলাই হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সাত ইসলামি দলকে নিয়ে ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু হয়। মূলত সাধারণ জোটের বাইরে ইসলামপন্থিদের স্বতন্ত্র একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই ছিল এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এর অংশ হিসেবে দলগুলোকে হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর কাছে ৩ আগস্টের মধ্যে জোট গঠনের রূপরেখা জমা দিতে বলা হয়। প্রায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাত দলই তাদের প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে।
সাত দলের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মোটামুটি অভিন্ন অবস্থান থাকলেও এর কাঠামো ও রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে দলগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কেউ অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন প্ল্যাটফর্মে থাকার পক্ষে, কেউ আবার অন্য জোটে থেকেও নতুন ঐক্যের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রাখতে চায়। একইভাবে কেউ জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, আবার কেউ নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তকে নিজ নিজ দলের এখতিয়ারে রাখার কথা বলেছে।
আদর্শিক ভিত্তি হবে কী?
সাত দলের প্রস্তাবনায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে আদর্শিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী ঐক্যজোটের বক্তব্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও আদর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি এসেছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের রূপরেখার ভাষ্য হলো, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে কাছাকাছি দৃষ্টিভঙ্গি লালন, হাক্কানি উলামায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা পোষণ করার কারণে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধিত ৭টি ইসলামি রাজনৈতিক দল এই ঐক্যে শামিল থাকবে। এই ঐক্য একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে অভিহিত হবে।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক শীর্ষনেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালবেলাকে বলেন, ‘হেফাজতের কাছে দেওয়া ঐক্যের রূপরেখায় জমিয়তের পক্ষ থেকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি ও আদর্শের ওপর অবিচল থাকাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেখানে আদর্শিক কোনো আপত্তি বা মতপার্থক্য রয়েছে, সেখানে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না থাকার বিষয়ে জমিয়ত তাদের অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেছে ।’
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন কালবেলাকে বলেন, ‘জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে অবশ্যই ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর আকিদা ও আদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করতে হবে। এ ছাড়া কোনো দলের নীতি, আদর্শ বা কর্মকাণ্ড যদি আকিদা লঙ্ঘন করে কিংবা দ্বীনের স্বার্থপরিপন্থী হয়, তবে উপদেষ্টা পরিষদ তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ এখতিয়ার রাখবে।’
ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, ‘আমরা চাই, যেহেতু এটা ইসলামি দলগুলোর ঐক্য, তাই এখানে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআমার আকিদা প্রাধান্য পাবে। এটা কেউ লঙ্ঘন করলে তারা ওই ঐক্যে থাকতে পারবে না। এটা আমাদের চাওয়া।’
তবে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস এবং নেজামে ইসলাম পার্টি এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব এখনো প্রকাশ্যে আনেনি।
অন্য জোটে থাকা যাবে কি না?
নতুন ঐক্যের সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক জোটের সম্পর্ক থাকবে কি না, এ প্রশ্নেই সাত দলের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় অন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা বা ঐক্য বজায় না রাখার কথা বলা হয়েছে। শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘এই সমঝোতায় যুক্ত দলগুলো স্ব স্ব জায়গা থেকে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। তবে অন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে কোনো রকম সমঝোতা বা ঐক্য বজায় রাখতে ও গড়ে তুলতে পারবে না।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনে করছে, সাত দলের ঐক্য হলেও তাদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানে এর প্রভাব পড়বে না। দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিক এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা দলের ভিন্ন এখতিয়ার থাকা উচিত। আমি মনে করি সাত দল ঐক্যবদ্ধ হলে আমরা (বিকেএম) যে ১১ দলের সঙ্গে আছি, এটার কোনো প্রভাব পড়বে না।’
দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা বলছি যে, বিগত দিনেও তো ইসলামি দলগুলো একসাথে কাজ করেছে। বর্তমানেও আমরা ঐক্যের পক্ষে। তবে রাজনৈতিক জোটে যে কোনো দল যেকোনো দলের সাথে এলায়েন্সে থাকতে পারে। আর ধর্মীয় বিষয় এবং সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা আলাদাভাবে সমমনারা একসাথে হতে পারি। এটা হলো আমাদের মৌলিক প্রস্তাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো জোটে থাকা অবস্থায়ও ইসলামি দলগুলো একসাথে কাজ করতে পারে, যেটা নজির অতীতে ছিল। হেফাজতের পক্ষ থেকে আমাদেরকে ১১ দল ছাড়ার জন্য কেউ চাপ দেয়নি।’
এর বিপরীত অবস্থান রয়েছে খেলাফত মজলিসের। দলটির নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি কালবেলাকে বলেন, ‘হেফজাতের আহ্বানে গঠিত জোটের কোনো দল অন্য কোনো জোটের জোটবদ্ধ থাকবে—এমনটা হলে নতুন করে একত্রিত হওয়ার কোনো অর্থ থাকে না। দলগুলোকে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অবস্থানেই থাকতে হবে, একই সাথে দুই জায়গায় থাকা সম্ভব নয়। আমাদের প্রস্তাবনায়, আমাদের চাওয়ায় এই কথাটি আছে।’
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনেরও অন্য বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে নতুন জোটে শরিক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার স্বার্থে সমমনা দলগুলো বর্তমানের অন্য কোনো বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের সংস্রব ত্যাগ করে এই নতুন জোটে শরিক হতে হবে।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতা বলেন, অতীতের বাস্তব অভিজ্ঞতায় যেসব বিষয় প্রতিবন্ধকতা বা জটিলতা তৈরি করেছিল, সেগুলো এড়িয়ে চলার প্রস্তাব করেছে দলটি। তবে অন্য জোটে থাকা না থাকার বিষয়ে জমিয়তের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য তিনি দেননি।
এছাড়া বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং ইসলামী ঐক্যজোটও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেনি। ফলে দল দুটির প্রস্তাবনায় অন্য জোটের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে কী অবস্থান রাখা হয়েছে, তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সাত দল কীভাবে অংশ নেবে, সেটিও প্রস্তাবনাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার প্রস্তাব দিয়েছে। শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘এই সমঝোতার আলোকে ঐক্যবদ্ধ দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করবে।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিক এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা দলের ভিন্ন এখতিয়ার থাকা উচিত।’
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রস্তাবনায়ও নতুন জোটকে দেশের রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার উপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার স্বার্থে সমমনা দলগুলো বর্তমানের অন্য কোনো বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের সংস্রব ত্যাগ করে এই নতুন জোটে শরিক হতে হবে।’
অর্থাৎ ইসলামী আন্দোলন এবং খেলাফত আন্দোলন যেখানে সমঝোতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বলছে, সেখানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তকে নিজ নিজ দলের এখতিয়ারে রাখার পক্ষে।
দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিনের বক্তব্যেও অন্য জোটে থাকার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রাখার বিষয়টি এসেছে। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ আমরা শুধু ধর্মীয় না, সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়েও অন্য কোনো জোটে থাকা অবস্থায়ও ইসলামি দলগুলো একসাথে কাজ করতে পারে, যেটা নজির অতীতে ছিল।’
কিছুটা একইরকম মত খেলাফত মজলিসেরও। দলটির নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি বলেন, ‘আমরা মনে করি, দলগুলো পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের চলার পথ ও কৌশল নিজেরাই নির্ধারণ করবে। কেউ যদি কোনো পথ বাতলে দেয়, সেটার ওপর তো সব দলের সমঝোতা নাও হতে পারে।’
তবে, এ বিষয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট এবং নেজামে ইসলাম পার্টির প্রস্তাব এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।
নেতৃত্ব কীভাবে হবে?
নতুন জোটের নেতৃত্ব কাঠামো নিয়েও একাধিক দলের প্রস্তাবনায় নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ স্থায়ী একক নেতৃত্বের বদলে সাত দলের শীর্ষ নেতাদের সম্মানজনক অবস্থান এবং লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে কর্মসূচি ও নীতি নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘৭ দলের প্রধান ৭ শীর্ষ নেতা সম্মান পাবেন। কর্মসূচি ও পলিসি নির্ধারণের জন্য প্রত্যেক দল থেকে ২ জন করে একটি লিয়াজোঁ কমিটি থাকবে।’
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও স্থায়ী বা নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল না রাখার প্রস্তাব করেছে। দলটির নেতারা বলছেন, ‘এই জোটে স্থায়ী বা নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্বশীল থাকবেন না। জোটের বিভিন্ন কর্মসূচি বা মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর আমিরগণ পর্যায়ক্রমে একেকবার করে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবেন।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি বিশেষ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতা। তিনি বলেন, ‘ঐক্যের বেলায় সুনির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি বিশেষ ফোরাম গঠন এবং সেই ফোরামের কার্যপদ্ধতির জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা বা রূপরেখা পেশ করা হয়েছে।’
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, ‘জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি শরিক দল থেকে ২ বা ৩ জন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘সমন্বয় কমিটি’ বা ‘মজলিসে শূরা’ গঠন করা হবে।’
তবে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী ঐক্যজোটের দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়নি।
নতুন দল যুক্ত করার ক্ষেত্রে কী হবে
নতুন কোনো দল বা সংগঠনকে এই ঐক্যে যুক্ত করার বিষয়েও কয়েকটি দলের প্রস্তাবনায় নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় সাত দলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘অন্য কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংগঠনকে এই ঐক্যে শামিল করতে চাইলে ৭ দলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।’
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনও এককভাবে নতুন কোনো দলকে যুক্ত করার বিপক্ষে। সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, ‘কোনো নতুন রাজনৈতিক দল বা জোটকে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। শূরার সদস্য ও উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ আলোচনার মাধ্যমেই কেবল তা সম্পন্ন হবে।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে বিশেষ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও নতুন দল অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং ইসলামী ঐক্যজোটের দায়িত্বশীলরাও এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
হেফাজতের ভূমিকা কতটা থাকবে
হেফাজত এই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কতটা ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়েও দলগুলোর প্রস্তাবনায় ভিন্নতা রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় হেফাজতের মধ্যস্থতায় ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘শুধু যারা এই সমঝোতার শর্ত মেনে একসঙ্গে পথ চলতে সম্মত হবে, তাদের নিয়েই হেফাজতে ইসলামের মধ্যস্থতায় এই ঐক্য হতে পারে।’
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন হেফাজতের তত্ত্বাবধান বা নিগরানিতে ঐক্যের পক্ষে। সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, ‘সমমনা ইসলামি দলগুলো হেফাজতে ইসলামের তত্ত্বাবধান বা নিগরানিতে ঐক্যবদ্ধ হতে আমরা সম্পূর্ণ একমত।’
খেলাফত মজলিসের মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি বলেন, ‘হেফাজতের পক্ষ থেকে যে মতামত বা ঐক্য রূপরেখা চাওয়া হয়েছিল, খেলাফত মজলিস তার জবাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা দিয়েছে।’ তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের চলার পথ ও কৌশল নিজেরাই নির্ধারণ করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।
তবে, এ বিষয়ে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী ঐক্যজোটের দৃষ্টিভঙ্গি কী—তা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।
শর্ত ভাঙলে কী হবে
ঐক্যের শর্ত ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট দলের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সে বিষয়েও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রস্তাবনায় স্পষ্ট কাঠামোর কথা বলা হয়েছে।
সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, ‘জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে অবশ্যই ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর আকিদা ও আদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করতে হবে। এ ছাড়া কোনো দলের নীতি, আদর্শ বা কর্মকাণ্ড যদি আকিদা লঙ্ঘন করে কিংবা দ্বীনের স্বার্থ পরিপন্থী হয়, তবে উপদেষ্টা পরিষদ তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ এখতিয়ার রাখবে।’
ইসলামী ঐক্যজোটও আকিদা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে। মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, ‘এটা কেউ লঙ্ঘন করলে তারা ওই ঐক্যে থাকতে পারবে না। এটা আমাদের চাওয়া।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃত্বশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও শর্ত রাখা হয়েছে। শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃত্বশীল কোনো ব্যক্তি এই ঐক্যের বাইরে কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে সমর্থন দিতে পারবেন না।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকেও আদর্শিক আপত্তি বা মতপার্থক্য থাকলে সম্পৃক্ত না থাকার বিষয়ে অনড় অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। তবে, এ বিষয়ে অন্য দলগুলোর প্রস্তাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি এখনো জানা যায়নি।
সাত দলের প্রস্তাব, মূল পার্থক্য কোথায়?
সাত দলের বক্তব্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে বড় ধরনের বিরোধ নেই। তবে ঐক্যটি কী ধরনের হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চাইছে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সাত দলের ঐক্য, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়া এবং অন্য রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে আলাদা সমঝোতা না করা।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ জোর দিচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি ও আদর্শের ওপর অবিচল থাকা, আদর্শিক মতপার্থক্য এড়িয়ে চলা এবং একটি বিশেষ ফোরামের মাধ্যমে ঐক্যের কার্যক্রম পরিচালনার ওপর।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চাইছে সমমনা কওমিপন্থি দলগুলোর ঐক্য বজায় থাকুক, তবে রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তে প্রতিটি দলের নিজস্ব এখতিয়ার থাকুক। দলটি বর্তমান ১১ দলীয় জোটে থাকার বিষয়টিকেও এই ঐক্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করছে না।
মাওলানা আতাউল্লাহ আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সমমনা ইসলামি দলগুলো অন্য জোটে থেকেও একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
খেলাফত মজলিস চাইছে নতুন ঐক্যে যুক্ত দলগুলো অন্য কোনো জোটে একসঙ্গে না থাকুক। একই সঙ্গে দলগুলোর নিজেদের রাজনৈতিক কৌশল নিজেরাই নির্ধারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দলটি।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি সমমনা দলগুলোর আদলে ঐক্যের কথা বলেছে এবং ঐক্যবদ্ধদের জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে মাঠে সক্রিয় থাকার বিষয়টি প্রস্তাব করেছে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন চায় হেফাজতের তত্ত্বাবধানে কওমি স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে নতুন ঐক্য গড়ে উঠুক। একই সঙ্গে অন্য বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের সংস্রব ত্যাগ করে নতুন জোটে যুক্ত হওয়া, পর্যায়ক্রমে নেতৃত্ব দেওয়া এবং সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
ইসলামী ঐক্যজোট চায় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা প্রাধান্য পাক এবং কেউ তা লঙ্ঘন করলে ঐক্যে রাখা যাবে না।
শনিবারের বৈঠকের দিকে নজর
সাত দলের প্রস্তাবনার এসব বিষয় নিয়ে এখনো হেফাজতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেই পরবর্তী কাঠামো নির্ধারণের কথা রয়েছে।
হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী কালবেলাকে বলেন, সাত দলের ঐক্য ও তাদের প্রস্তাবিত রূপরেখার বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। এ বিষয়ে হেফাজত মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানসহ দায়িত্বশীল মুরুব্বিরা আছেন। তারা আগামীকাল শনিবার (১৫ আগস্ট) ঢাকায় বৈঠক করবেন। সেখান থেকে বিস্তারিত জানানো হতে পারে।
ফলে শনিবারের বৈঠকেই স্পষ্ট হতে পারে, সাত দলের প্রস্তাবনার কোন কোন বিষয় হেফাজত গ্রহণ করছে এবং শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগটি আদর্শিক সমঝোতা, নাকি একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
সূত্র : কালবেলা













































