
কখনো কখনো আপনার সবচেয়ে বড় সুবিধাই সবচেয়ে বড় অসুবিধায় পরিণত হতে পারে। ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকারের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটছে। এ সরকারের এক যুগ ক্ষমতায় টিকে থাকার মূল শক্তি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একের পর এক জনমত জরিপ থেকে জানা গেছে, তিনি তার নেতৃত্বাধীন সরকারের চেয়েও নিজে বেশি জনপ্রিয়। তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমার কারণেই বিজেপি টানা তিনটি নির্বাচনে জয়ী হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তা বা বাগাড়ম্বরেও তার নেতৃত্বের এই দিকটি ফুটে ওঠে। অনেক শক্তিশালী নেতার মতোই তিনি প্রায়ই নিজের সম্পর্কে কথা বলার সময় ‘আমি’র বদলে নিজের নাম বা ‘তিনি’ (থার্ড পারসন) হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ব্যবহৃত শব্দচয়নও ‘সর্বোচ্চ নেতা’ হিসেবে তার অবস্থানকেই তুলে ধরে। পুরো সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতির বদলে সেখানে সবসময়ই থাকে ‘মোদি কি গ্যারান্টি’র (মোদির গ্যারান্টি) কথা।
মোদির সহকর্মীদের কথাবার্তাও একই সুরেই বাঁধা। তাকে যথাযথ সম্মান বা আনুগত্য প্রদর্শন ছাড়া কোনো ভাষণ বা ঘোষণা যেন পূর্ণতা পায় না। সবকিছুই সবসময় ঘটে ‘আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে’। এমনকি খুব কম ক্ষেত্রেই যখন কোনো মন্ত্রী কৃতিত্ব বা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য হন, তখন তা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার ওপরই আরোপ করেন।
মোদির সমালোচকরা এই অতি-স্তুতি ও ভক্তি-শ্রদ্ধাকে নিয়ে উপহাস করেন ঠিকই, কিন্তু তারা যে বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেন না, তা হলো, তার জনপ্রিয়তা ভোট টানতে সক্ষম। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি যেসব সাধারণ নির্বাচনে লড়েছে, সেগুলোতে দলের প্রাপ্ত ভোটের হার (মোটামুটিভাবে) ৩১ থেকে ৩৬ শতাংশের মধ্যে ছিল।
‘দ্য ইকোনমিস্ট’র জরিপ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে নানা সমস্যা সত্ত্বেও দেশটির ৩৬ শতাংশ ভোটার ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। মোদির মতোই ট্রাম্পেরও একনিষ্ঠ সমর্থকগোষ্ঠী আছে যারা, সব পরিস্থিতিতেই তার পাশে অটল থাকে। বিজেপির ৩৬ শতাংশের যে মূল ভোটব্যাংক তা দলটিকে মোদির দেওয়া উপহার। তাকে ছাড়া বিজেপি যে কখনোই এই অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না মোদি, তা ভালোভাবেই জানেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভারতেরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মোদির বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা যায়। অথচ বিষয়টি নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না।
জনপ্রিয়তা ও প্রতিবাদের সমান্তরাল চিত্র
তবে এ কথা সত্য যে, মোদির বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তিনি এ ক্ষেত্রে কখনোই ইন্দিরা গান্ধীর সম-উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি। ১৯৭১ সালে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এবং কোনো সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়াই ইন্দিরার নবগঠিত কংগ্রেস ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। ১৯৮০ সালে যখন তাকে রাজনৈতিকভাবে শেষ বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি ফিরে এসে আবার ৪৩ শতাংশ ভোট পান। আর ১৯৮৪ সালে তার হত্যাকাণ্ডের পরের নির্বাচনেই কংগ্রেস ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কংগ্রেসের এ ধরনের জনপ্রিয়তার নিরিখেই বর্তমান বিজেপির ৩৬ শতাংশ ভোটের বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন।
তবে, এত সব সাফল্যের মধ্যেও একটা সময় এসেছিল যখন ইন্দিরা গান্ধী এতটাই অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিলেন, তিনি তার হাতে গড়া কংগ্রেসের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন । ১৯৭৪ সালে তার সরকারের দুর্নীতি ও বিতর্কিত শাসনপদ্ধতির বিরুদ্ধে গণআন্দোলন এমন তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ১৯৭৫ সালের মধ্যে তিনি এতটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েন, তার ক্ষমতায় টিকে থাকা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। তিনি যদি জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং ১৯৭৬ সালের নির্ধারিত নির্বাচন স্থগিত না করতেন, তবে সম্ভবত তিনি পরাজিত হতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, নির্বাচন স্থগিত করেও তার কোনো লাভ হয়নি। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস শুধু পরাজিতই হয়নি, নিজের আসনটিও হারিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।
বর্তমান পরিস্থিতিও অনেকটা সে রকমই, যা মোদির বিবেচনায় রাখা উচিত। অনেকেই যন্তর মন্তরের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সঙ্গে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ঘটনাপ্রবাহের তুলনা করেছেন। কিন্তু এই তুলনাগুলো আসলে যথার্থ নয়। যন্তর মন্তরের বিক্ষোভকারীরা ছিলেন অহিংস এবং তারা পুরো শাসনব্যবস্থা বদলে ফেলতে চাননি। বরং ভারতে ১৯৭৪-৭৫ সালের ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে তেলাপোকাদের আন্দোলনের তুলনাই বেশি প্রাসঙ্গিক।
সত্তরের দশকে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভের কারণগুলোর সবই যে ইন্দিরা গান্ধীর দোষ ছিল, তা কিন্তু নয়। ১৯৭৩ সালে তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধিতে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং নজিরবিহীন মুদ্রাস্ফীতি বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী দেশটাকে এমনভাবে চালাচ্ছিলেন, যেন তিনিই ‘সর্বোচ্চ নেত্রী’। তাই বিক্ষোভকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন তিনিই। বিক্ষোভের মূল সুরটা ছিল এ রকম, যা কিছু ভালো হয়েছে তার কৃতিত্ব তো আপনিই নিতে চেয়েছেন, এখন যা কিছু খারাপ হচ্ছে, তার দায়ভারও আপনাকেই নিতে হবে। মোদির ক্ষেত্রেও সে রকমই ঘটতে পারে।
একবার যখন কেউ ‘সর্বোচ্চ নেতা’ বা নেত্রী হয়ে ওঠেন, তখন ‘সর্বোচ্চ লক্ষ্যবস্তু’ও হয়ে পড়েন তিনিই। তবে, মোদি এখন পর্যন্ত সে ধরনের অজনপ্রিয়তার মুখোমুখি হননি, যা সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইন্দিরা গান্ধীকে হতে হয়েছিল। তবে পরিস্থিতির মধ্যে বেশ কিছু মিল আছে। মোদি গত এক যুগে নিজের যে অপরাজেয় ইমেজ গড়ে তুলেছিলেন, তা বিক্ষোভকারীদের নির্ভীকতা এবং তাকে নিয়ে উপহাস করার কারণে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুটি উপনির্বাচনে বিজেপির সাম্প্রতিক পরাজয়কে হয়তো খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়, তবে অন্তত বিহারের ক্ষেত্রে সেই পরাজয় ছিল যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনই নজিরবিহীন। হিন্দি বলয়ে বিজেপিকে সর্বশক্তিমান বলে মনে করা হয়। অথচ বিহারে তাদের অন্যতম নিরাপদ আসনটি তারা এমন এক ব্যক্তির কাছে হারিয়েছে, যিনি বলেছিলেন যে, তার উদ্দেশ্য হলো বিজেপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া।
ছাত্র বিক্ষোভের এক সপ্তাহে মোদিকে অস্বস্তিতে থাকতে দেখা গেছে। বিক্ষোভের জেরে শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে হয়েছে তাকে। আর নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর জন্য তার প্রচেষ্টাগুলো ছিল অস্বাভাবিক রকমের অস্বস্তিকর। তার ‘সেলফি ভিডিও’টি যেমন ভালো সাড়া ফেলেনি, তেমনই তাকে অপমান করার জন্য ছাত্রদের তার ক্ষমা করে দেওয়ার সেই আড়ম্বরপূর্ণ ঘোষণাও তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। আর ‘মহান নেতা’কে অপমান করার দায়ে তরুণ ও শিশুদের দিয়ে ভিডিওর মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়ানোর জন্য বিজেপি যে কৌশল নিয়েছে, তা সেই ‘সম্রাট’-এর ইমেজকে আরো জোরালো করেছে, যিনি ছাত্রদের ক্ষোভ-অভিযোগের চেয়ে নিজের অহংবোধে আঘাত লাগাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে বিজেপি কিছুটা দুর্বল অবস্থানে থাকলেও পূর্ণাঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তারা ভালো ফল করে। সমালোচকরা হয়তো বলবেন, এর কারণ সরকারের ‘পোষা’ নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এটাও হতে পারে যে, বড় আকারের নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন সব ইস্যু বা বিষয়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তেলাপোকাদের এক সপ্তাহের বিক্ষোভের ঘটনাপ্রবাহ হয়তো আগামী দিনগুলোতে বিজেপি ও মোদির জন্য কঠিন পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি নিশ্চয়ই বোঝেন যে, বিক্ষোভকারীরা আগামীতে হয়তো তাকেও ছাড় দেবে না।
পরিস্থিতি সামলাতে তাকে হয়তো মন্ত্রিসভা ঢেলে সাজাতে হবে, যা দলের ভেতরে অসন্তোষও সৃষ্টি করবে, যেমনটা সাধারণত রদবদলের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। যারা বাদ পড়েন তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন এবং যারা প্রত্যাশা অনুযায়ী পদ পান না, তাদের মধ্যেও ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।
আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রী আগামী বছর উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছেন, যেখানে বিজেপি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। সেই জয় সমালোচকদের মুখ বন্ধ করবে বলে আশা করছে দলটি। এই কৌশল কাজে আসতেও পারে। তবে মোদিকে ভারতের ক্ষুব্ধ তরুণদেরও সন্তুষ্ট করতে হবে, যারা চাকরি পাচ্ছে না। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি দূরের কথা, এই সরকার অর্থনীতি সামলানোর কৌশল জানে এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।
সবকিছু মিলিয়েই হয়তো বিজেপি ও মোদির ভালো সময়টা ফুরিয়ে আসছে। তবে মোদিকে খাটো করে দেখাটা সবসময়ই ভুল। তিনি হয়তো নিজের শক্তির জায়গাগুলোকে আবার কাজে লাগাবেন এবং ‘ইন্দিরা গান্ধী সিনড্রোম’-এর (ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা ও এর ফলে পতন) ফাঁদে পা দেওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন।













































