প্রচ্ছদ জাতীয় যে পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতিই হয়ে ওঠেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

যে পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতিই হয়ে ওঠেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

কাগজে-কলমে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের আলংকারিক প্রধান। সংবিধান অনুযায়ী দেশের নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী। তাহলে রাষ্ট্রপতির আসনে কে বসবেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর এত আগ্রহ কেন?
প্রশ্নটা আরও গুরুত্বপূর্ণ—সংবিধান যেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত করে দিয়েছে, সেখানে বিশেষ পরিস্থিতিতে কীভাবে এই পদটিই হয়ে উঠতে পারে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক কেন্দ্র?

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা আসলে কতটুকু?
১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়।

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থাৎ জরুরি অবস্থা জারি, সংসদ ভেঙে দেওয়া, ক্ষমা প্রদর্শন কিংবা বিভিন্ন সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত—এসব ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা সীমিত।

বাংলাভিশনের গুগল নিউজ ফলো করতে ক্লিক করুন
স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাই রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। কিন্তু সংকট শুরু হলেই হিসাবটা বদলে যেতে পারে।

সংকটে কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রপতি?
রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ক্ষমতার শূন্যতা কিংবা সাংবিধানিক সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কারণ সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা দিয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সরকারি কাজের জন্য আদালতে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায় না। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা যায় না।

ফলে রাষ্ট্রীয় সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির পদটি শুধু আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে থাকে না; বরং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

ইতিহাসে এর নজির আছে
১৯৯৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের মধ্যে সংঘাতের ঘটনায় দেশে বড় ধরনের সাংবিধানিক ও সামরিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেনাপ্রধানকে অব্যাহতি দেন।

আবার ২০০৬ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। এতে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়েও রাষ্ট্রপতির ভূমিকার গুরুত্ব সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংসদ বিলুপ্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ, যখন নিয়মিত রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে কিংবা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় রাষ্ট্রপতির পদটি সামনে চলে আসে।

একসময় রাষ্ট্রপতির হাতেই ছিল মূল ক্ষমতা

তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি সবসময় এতটা ক্ষমতাহীন ছিলেন না।

১৯৭১ সালের মুজিবনগর সরকারের কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা ছিল। পরে ১৯৭২ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় দেশের নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল।

শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে রাষ্ট্রপতির পদই ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা ফিরে আসে। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কমে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। তবে ক্ষমতা কমলেও রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি।

রাষ্ট্রপতি কতটা নিরপেক্ষ?
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ অনেকটাই নির্ভর করে পদে থাকা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।

১৯৯৬ সালে সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রস্তাবিত জননিরাপত্তা আইনে সম্মতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও তাঁর অবস্থান রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

অন্যদিকে ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেন।

এই ঘটনাগুলো দেখায়—রাষ্ট্রপতি পদটি শুধু সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নও।

কেন রাজনৈতিক দলগুলোর এত আগ্রহ?
এখানেই মূল হিসাব। স্বাভাবিক সময়ে রাষ্ট্রপতির হাতে সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা কম। কিন্তু রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে রাষ্ট্রপতিই হয়ে উঠতে পারেন সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

তাই ক্ষমতাসীন দল চায় এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যার সঙ্গে সরকারের সমন্বয় থাকবে। অন্যদিকে বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ চান এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি সংকটের মুহূর্তে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবেন।

ফলে রাষ্ট্রপতি পদটি একদিকে সীমিত ক্ষমতার, অন্যদিকে সংকটকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতিকে হয়তো আলংকারিক পদ মনে হতে পারে। কিন্তু যখন সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়ে, সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন ওঠে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয় কিংবা রাষ্ট্রে ক্ষমতার শূন্যতা দেখা দেয়—তখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা হঠাৎ করেই অনেক বড় হয়ে ওঠে। আর এ কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতি পদ কখনোই শুধুই একটি অলংকারিক পদ নয়।

ক্ষমতার কেন্দ্রে তিনি হয়তো প্রতিদিন থাকেন না—কিন্তু বড় সংকটের মুহূর্তে সেই কেন্দ্রবিন্দুতে তিনিই চলে আসতে পারেন।

সূত্র : বাংলা ভিশন