প্রচ্ছদ জাতীয় বাংলাদেশ আর নতজানু রাষ্ট্র হবে না

বাংলাদেশ আর নতজানু রাষ্ট্র হবে না

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক শেখ হাসিনার দিল্লিতে বসে অপতৎপরতা চালানোর বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক সাংবাদিকদের তথাকথিত সংগঠন ‘ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’র নামে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন ও মতবিনিময় সভায় ভার্চুয়ালি শেখ হাসিনাকে যুক্ত করে বক্তব্য দেওয়ানো হয়। সভাটিতে হাসিনাপুত্র জয়কেও যুক্ত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তৎপরতার প্রতিবাদ জানিয়ে তাদের বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশের আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন পলাতক আসামিকে ভারতের মাটিতে বসে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিষোদগার করার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি চরম অবমাননা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দ্বিতীয়বার্ষিকীর দিনটিতে শেখ হাসিনাকে দিয়ে এই বক্তব্য দেওয়ানোর জন্য বেছে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার এই তৎপরতাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান হিসেবে দেখছে। ঢাকা মনে করে, এই ঘটনার ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি নতুন ও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা চলছিল, তা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাধাপ্রাপ্ত হবে। অনুষ্ঠানটির আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে সতর্ক করে এটা বন্ধের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে সেই অনুরোধ রক্ষা না হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার গভীর হতাশা প্রকাশ করছে। পাশাপাশি ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী একাধিকবার শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়া সত্ত্বেও ভারতের কোনো সাড়া না পাওয়ায় পুরো বিষয়টিকে দুঃখজনক মনে করে ঢাকা।

সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার ভার্চুয়ালি বক্তব্য প্রদান নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে একটি ‘বেসরকারি মিডিয়া সংস্থা’র উদ্যোগ বলে অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাস্তবতার নিরিখে ভারত এর দায় এড়াতে পারে না। কারণ শেখ হাসিনা সাধারণ কোনো পর্যটক নন, তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় হেফাজতে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দিল্লিতে বসবাস করছেন। ভারত সরকারের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা নজরদারি এড়িয়ে তার পক্ষে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে এভাবে যুক্ত হওয়া প্রশাসনিক অনুমতি বা ভারত সরকারের পরোক্ষ সবুজসংকেত ছাড়া অসম্ভব। আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী, কোনো দেশ যখন অন্য দেশের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আশ্রয় দেয়, তখন শর্ত থাকে যে, তিনি সেই দেশের মাটি ব্যবহার করে কোনো বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তৎপরতা বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না, যা শেখ হাসিনা করেছেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের একজন দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী। বন্ধুপ্রতিম দেশের অনুরোধ সত্ত্বেও তাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত না রেখে তাকে এ কাজে একের পর এক সুযোগ করে দেওয়া দুদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আইনি চুক্তির প্রতি উদাসীনতা। এর আগে বাংলাদেশে যারা ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন, তারাও শেখ হাসিনার পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছেন। বীণা সিক্রি এবং রিভা গাঙ্গুলীর বক্তব্যই এর প্রমাণ।

এ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভারত একাধারে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবে—এ দুই অবস্থান সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং পরস্পরবিরোধী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ স্পর্শকাতর বিষয়টি অনুধাবন করবে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করার মতো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করবে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতি ঢাকায় মারা গেছে এবং দিল্লিতে দাফন হয়েছে। জনগণ খুব সচেতন। তারা তাদের ‘চেতনার ব্যবসা’ দিয়ে জনগণকে আর বিভ্রান্ত করতে পারবে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনার নির্দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে। তখন ১৪০০-এর বেশি মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ শতাংশই ছিল শিশু। এই হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশের মানুষের কাছে শেখ হাসিনা ক্ষমা চাননি এবং এতটুকু অনুশোচনাও প্রকাশ করেননি। উল্টো তিনি উসকানি দিয়ে চলেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পাশাপাশি জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ দলটির বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে এবং খুব দ্রুতই শেখ হাসিনাসহ তার সহযোগীদের বিচার সম্পন্ন করা হবে।

ভারতের এই দ্বিচারি ভূমিকা এর আগে আমরা দেখেছি। ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কারলাইলকে ২০১৮ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল। তাকে শেখ হাসিনা সরকার ভিসা দেয়নি। লর্ড কারলাইল দিল্লিতে ওই ফরেন করেসপডেন্টস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের অনুরোধে ভারত সরকার সেদিন লর্ড কারলাইলের সংবাদ সম্মেলন বন্ধ করে দিয়েছিল।
কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক স্পষ্ট অবস্থান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জোরালো বক্তব্য অভিনন্দিত হয়েছে। দেশের বেশির ভাগ মানুষ সরকারের এ সিদ্ধান্তে খুশি। দেশে এতদিন যে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ছিল, এর থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা সবার আগে বাংলাদেশ। এ নীতির পরিপ্রেক্ষিতেই এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ আর নতজানু রাষ্ট্র হবে না।

বাংলাদেশকে নতজানু রাষ্ট্র করেছিল আওয়ামী লীগ

শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-২০২৪ শাসনামলে বাংলাদেশ একটি নতজানু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তৎকালীন বিতর্কিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে মোমেন বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে আমি ভারতকে অনুরোধ করেছি।’ তার আরেকটি মন্তব্য ছিল ‘ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মতো।’

শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতকে রেল, সড়ক এবং নৌপথে ট্রানজিট ও করিডোর সুবিধা দিয়েছিল। এর বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য ভারতের ভেতর দিয়ে নেপাল বা ভুটানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়নি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের প্রধান দুটি সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয় হাসিনা সরকার, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার দিক থেকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সেই আমলে তিস্তা চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। যার ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানির সংকটসহ ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সীমান্তে বাংলাদেশিদের পাখির মতো গুলি করে মারলেও এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করেনি আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনা তখন নিজেই বলেছেন, ‘ভারতকে যা দিয়েছি, তা তারা আজীবন মনে রাখবে।’ আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুযোগ করে দিয়ে শেখ হাসিনা ভারতের স্বার্থকেই রক্ষা করে গেছেন। ভারতে পালিয়ে গিয়ে এখন তিনি বাংলাদেশে অরাজকতা চালাতে নানা কর্মকাণ্ড করছেন ভারতের সহযোগিতা নিয়ে। তাকে না থামিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও সে দেশের সাবেক কূটনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা শেখ হাসিনা কার্ড খেলে চলেছেন, যা দেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে।

জাতিসংঘে কূটনৈতিক সাফল্য

আগামী ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (৮১তম অধিবেশন) সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। এ অধিবেশনের বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব নির্বাচন করা, যা হবে বাংলাদেশের সভাপতিত্বে। বর্তমানে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ শেষ হচ্ছে। এ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন। অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা উদীয়মান প্রযুক্তির শাসন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের মতো বড় বৈশ্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ এজেন্ডা নির্ধারণ এবং মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে।

সরকার গঠনের প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের বড় কূটনৈতিক সাফল্য। অর্থাৎ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের জয়লাভ এবং গুরুত্বপূর্ণ এই অধিবেশনে আগামী এক বছরের জন্য সভাপতির দায়িত্ব পালন করা ও বৈশ্বিক কার্যক্রমে অবদান রাখা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় অর্জন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (৮১তম অধিবেশন) সভাপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ২ জুন ২০২৬। ওই নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে হারিয়ে বিজয়ী হন। জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্রের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে এই ভোট হয়। বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। সাইপ্রাসের প্রার্থী পান ৯১ ভোট। এর আগে ১৯৮৬ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৪০ বছর পর বাংলাদেশ আবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই কূটনৈতিক সাফল্য যেন তার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে একই সূত্রে গাথা। আজ থেকে ৪৮ বছর আগে ১৯৭৮ সালের ১০ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাসনামলে এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি জাপানকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তখন একে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য করা হয়। ওই নির্বাচনের তৃতীয় রাউন্ডে বাংলাদেশ ১২৫টি রেকর্ড ভোট পেয়ে অভাবনীয় বিজয় অর্জন করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনীতির মূলভিত্তি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ৬ মাসের (১৮০ দিন) বৈদেশিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো—‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ তথা দেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখা। এ সময় সরকার মূলত অর্থনৈতিক কূটনীতি, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীনে। এ সফরকে অন্যতম কূটনৈতিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন সফরে সে দেশের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একান্ত বৈঠক ছিল বড় অর্জন। এ বৈঠকে বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার চীন অর্থনৈতিক করিডোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। এছাড়া চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গেও বৈঠক হয়। উচ্চপর্যায়ের এসব বৈঠকে বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, কারিগরি শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক এবং চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দুদেশের যৌথ অংশীদারত্ব জোরদার করা হয়েছে।

মালয়েশিয়া সফরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বন্ধ থাকা বা স্থবির হওয়া শ্রমবাজার আবার গতিশীল করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। সফরটি কতটা সফল হয়েছে, তার প্রমাণ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, একটি বাংলাদেশি গান—‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’ আবহ সংগীত দিয়ে। রিলটি কোটি কোটি মানুষ উপভোগ করেছেন। সম্প্রতি গ্যাসসংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে টেলিফোন করে যে সহযোগিতা চান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তারেক রহমান সরকারের আরো বড় দৃশ্যমান কূটনৈতিক সাফল্য হচ্ছে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা। সরকারের ১০০ দিনের মধ্যেই অর্থ পাচারের ১০টি দেশের মধ্যে তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

সরকার বড় কোনো পরাশক্তির দিকে এককভাবে ঝুঁকে না পড়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সফল বৈঠকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী সরকারের আমলের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবার ‘এক্সেপ্ট ইসরাইল’ শব্দগুলো ফিরিয়ে আনা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় অত্যাধুনিক ‘গ্রাউন্ড মাস্টার ৪০০’ রাডার স্থাপন করা হয়েছে, যা বঙ্গোপসাগরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশসীমা নজরদারিতে কূটনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ব্রিকস জোটে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ সফল। চীন-রাশিয়ার পর ভারতও বাংলাদেশকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। অবশ্য ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার খুব দ্রুতই বাংলাদেশ এই জোটের আনুষ্ঠানিক অংশীদার হতে যাচ্ছে। আসিয়ানের সদস্য হওয়া আপাতত না হলেও বাংলাদেশ আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার জন্য লবিং জোরদার করেছে। সৌদি আরবের সঙ্গেও বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলছে। তথ্যপ্রযুক্তি, এআই, সৌরশক্তি ও আবাসন খাতে সৌদি আরব বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছে।

চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো ভূরাজনৈতিক পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে থেকে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে সমানভাবে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে। বিমসটেক সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ভারতের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়টিকেও বাংলাদেশ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

আগেই উল্লেখ করেছি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের কূটনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা সবার আগে বাংলাদেশ নীতি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান স্পষ্টভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশ আর কখনো কোনো বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল বা নতজানু রাষ্ট্র (ক্লায়েন্ট স্টেট) হবে না।

লেখক : সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব