প্রচ্ছদ জাতীয় অনিয়ম-দুর্নীতির ‘হেডমাস্টার’ এজাজ

অনিয়ম-দুর্নীতির ‘হেডমাস্টার’ এজাজ

কখনো নিজের বিয়ে, কখনো ঈদুল আজহা বা মায়ের চিকিৎসা আবার কখনোবা নিজের চিকিৎসার নামে দফায় দফায় মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে (বর্তমানে প্রশাসকের ঐচ্ছিক তহবিল) নিয়েছেন আর্থিক সাহায্য। যার পরিমাণ ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা। শুরুতে নামের সঙ্গে পদবি উল্লেখ করে টাকা নিলেও শেষদিকে তাকে ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা নিতে গোপন করতে হয়েছে চাকরির তথ্য। সোহেল রানার এই অর্থপ্রাপ্তির পেছনের কারিগর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।

শুধু সোহেল রানাই নন, একইভাবে করপোরেশনের আরো বহু কর্মীকে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে ইচ্ছামতো অর্থ বরাদ্দ দেন এজাজ।
নামে-বেনামে এ খাতের অর্থ বরাদ্দ দিয়ে এজাজ হাতের মুঠোয় রেখেছিলেন ডিএনসিসির ওইসব কর্মীকে। নিজস্ব বলয় তৈরি করতে এজাজ করপোরেশনে বসিয়েছিলেন নিজের লোক। নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে সহায়তাকারী এসব ব্যক্তিই মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ বিভিন্ন সময়ে পেতেন উপহার হিসেবে।

আগামীর সময়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসক হিসেবে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ এজাজ। এক বছরেরও কম সময়ের মাথায় পরের বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি উত্তর সিটির প্রশাসক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে। গুঞ্জন আছে, তার এই দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের। এজাজের দায়িত্ব গ্রহণের সময় মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিলে অর্থ ছিল ৮ কোটি ৪৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।

তিনি প্রশাসকের চেয়ারে বসার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ৮ মাসে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অর্থ খরচ হয়েছিল ৫৫ লাখ ৩৩ হাজার। কিন্তু এজাজ দায়িত্ব নেওয়ার পর বাকি সাড়ে ৩ মাসে ওই তহবিল থেকে আগের চেয়ে খরচ করা হয়েছে অস্বাভাবিক বড় অঙ্কের টাকা। যার পরিমাণ ২ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএনসিসির নগরপিতার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনজন। এর মধ্যে জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত ছিলেন যথাক্রমে মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং প্রশাসক মাহমুদুল হাসান। তাদের দুজনের সময় সাড়ে ৮ মাসে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে গড়ে মাসিক খরচ হয়েছে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

অন্যদিকে প্রশাসক এজাজের সময় মাসিক খরচ হয়েছে ৬০ লাখ ৪০ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ আগের চেয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০ গুণ বেশি টাকা খরচ করেছেন এজাজ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ৮ মাস ১২ দিন। এ সময়ে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে ৭ কোটি ২২ লাখ টাকা খরচ করেছেন এজাজ, যা বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএনসিসির ৭১ চালককে ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ দিয়েছেন এজাজ। এর মধ্যে প্রশাসকের দপ্তরের গাড়িচালক মো. আবদুল হালিমকে মেয়ের চিকিৎসা বাবদ দিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা। ২১ চালককে দিয়েছেন ২০ হাজার টাকা করে। ৩০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন বাকি ৪৯ জনকে। মেয়রের দপ্তরের ৩২ জনকে ২৫ হাজার করে, বিভিন্ন বিভাগের ৮৪ কর্মচারীকে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দিয়েছেন ঐচ্ছিক তহবিল থেকে। যদিও তারা সবাই ডিএনসিসি থেকে নিয়মিত পান বেতন-বোনাস। বাদ যাননি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মচারীরাও। ঈদ সালামির নামে ঐচ্ছিক তহবিল ফাঁকা করেছেন মোহাম্মদ এজাজ।

এজাজের স্বাক্ষর করা ৬ মার্চ, ২০২৫ তারিখের একটি নথিতে দেখা গেল, আব্দুস সামাদ নামে একজনকে ক্যানসারের চিকিৎসার নামে ঐচ্ছিক তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকা। সামাদের পক্ষে ওই টাকা নিয়েছেন বলে উল্লেখ করা আছে ‘ছেলে’। ছেলের নাম-পরিচয় কিছুরই উল্লেখ নেই নথিতে। পরে আবারও সেই আব্দুস সামাদের নামে কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য অর্থ সহায়তা নেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা। এবার লেখা হয়— মো. আব্দুস সামাদ, পক্ষে ‘মামা’। এ ছাড়া জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী উল্লেখ করে মো. রিফাত হাওলাদার নামে এক ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা। যেখানে দেওয়া দুটি মোবাইল ফোন নম্বরের একটি পাওয়া গেছে বন্ধ। অন্যটি ১২ সংখ্যার ভুল ডিজিট দেওয়া। এখানেও টাকা তোলা হয়েছে বেনামে।

নিউ মুসলিম ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা খান মোহাম্মদ আবুবকর সিদ্দিককে এজাজ দিয়েছেন ১ লাখ টাকা। জুলাইয়ে মৃত্যুজনিত কারণে মৌলভিরটেকের আব্দুস সাত্তারকে বরাদ্দ দিয়েছেন ৫০ হাজার। এ-সংক্রান্ত নথিতে দেওয়া ফোন নম্বরটিতে কল করে পাওয়া গেল না কাউকে। একইভাবে বেনামে বহুজনকে অর্থ দিয়েছেন এজাজ। অথচ মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে আপৎকালীন— অর্থাৎ বিপদের সময় অর্থ ব্যয়ের কথা। অথচ প্রশাসকের পদে টিকে থাকতে নামে-বেনামে বিভিন্নজনকে দেওয়া হয়েছে এই তহবিলের অর্থ। নিয়ম হলো— মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে কাউকে সাহায্য দেওয়া হলে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য নথিভুক্তের। সেই নিয়মকে যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন এজাজ।

শুধু ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থই নয়ছয় নয়, বনানী কাঁচাবাজারের পাশে অবৈধভাবে ৩৩টি দোকান বরাদ্দ দিয়েছিলেন এজাজ। প্রতি দোকান থেকে নিয়েছেন ৫ থেকে ৭ লাখ করে টাকা। এমন অভিযোগ করেছেন খোদ ওই দোকান মালিকরাই। যদিও এজাজের ভাষ্য, এসব দোকান থেকে ভাড়ার টাকা নিয়েছে সিটি করপোরেশন, দোকান বরাদ্দ আগেই দেওয়া ছিল। তবে এসব দোকানের বরাদ্দ এজাজের আগে মেয়র আতিকুল ইসলামের সময়ই বাতিল করে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আগের দুই মাসে ৪৭টি টেন্ডার দিয়েছেন এজাজ। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব টেন্ডার দেন তিনি।

তড়িঘড়ি এসব টেন্ডার দেওয়ার সপক্ষে গাইলেন সাফাই। মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘উন্নয়নের জন্য টেন্ডার দিয়েছি। এর আগে এক বছরেও তো আমি শত শত টেন্ডার দিয়েছি।’

ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব নেওয়ার পর সব খাত মিলিয়ে করপোরেশনের তহবিলে মাত্র ২৫ কোটি টাকা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। যদিও দায়িত্ব ছাড়ার আগে ডিএনসিসির তহবিলে ১২০০ কোটি টাকা রেখে এসেছেন বলে দাবি এজাজের।

ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা ইচ্ছামতো খরচ প্রসঙ্গে এজাজ বলেন, ‘অডিট ছাড়া কোনো টাকা খরচের সুযোগ নেই। আবেদনের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে টাকা দেওয়া হয়েছে।’ নাগরিক সেবার জন্য বরাদ্দের টাকা বাছবিচারহীনভাবে খরচ, তড়িঘড়ি শত শত দরপত্র আহ্বান বা দোকান বরাদ্দে অনিয়মের মতো আরো বহু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ান ডিএনসিসির সাবেক প্রশাসক এজাজ। যদিও তিনি এ পদে থাকতে পেরেছেন এক বছরেরও কম সময়। এমন প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ এজাজকে এখন অনেকেই বলছেন, ‘নগরখেকো নগরপিতা’। ডিএনসিসিতে কীভাবে হলো এজাজের উত্থান?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এজাজ ছিলেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসে অন্তর্বর্তী সরকার। আর সেই সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ছত্রছায়ায় প্রসারিত হয় এজাজের বলয়। তারই পছন্দে এজাজকে বসানো হয় ডিএনসিসির প্রশাসক পদে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এজাজের বিরুদ্ধে উঠতে শুরু করে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ। বিশেষ করে, মিরপুর-গাবতলী গবাদি পশুর হাটের ইজারায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া ই-রিকশা প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার, ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান বরাদ্দ দিয়ে অর্থ লেনদেন, খিলগাঁওয়ের তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিংয়ের জায়গায় নিয়মবহির্ভূতভাবে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এমন প্রেক্ষাপটে গত বছরের ২৭ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এজাজের বিষয়ে শুরু করে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি এজাজের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। এর সপ্তাহখানেক পর ৯ ফেব্রুয়ারি উত্তর সিটির প্রশাসক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে।

নাগরিকের সেবার জন্য বরাদ্দের টাকা নগরপিতার হাত দিয়ে এভাবে তছরুপের বিষয়টি নিয়ে কথা হয় নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খানের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘পদে থাকা অবস্থায় মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এটা বিরল। ফলে নিশ্চয়ই ওনার সঙ্গে দুর্নীতির কোনো যোগ আছে— এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

ঐচ্ছিক তহবিলের অর্থ ইচ্ছামতো খরচের বিষয়ে এই নগর-পরিকল্পনাবিদ বলছিলেন, ‘কখনোই এ তহবিলের পুরো অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা না। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে তিনি এই অর্থ দুস্থ মানুষকে দিয়েছেন। তাহলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য, বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি রাখতে হবে। সেটি যদি না করা হয়, তাহলে তো এখানে দুর্নীতির একটা গন্ধ থেকেই যায়।’

আদিল মোহাম্মদ খান মনে করেন, মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শেষ করা উচিত দ্রুতই। যাতে তদন্তকাজকে কেউ প্রভাবিত করতে না পারে। একই সঙ্গে দুদকের এই তদন্ত যেন নির্মোহভাবে এগোয়, তা নিশ্চিতেরও তাগিদ এই নগর-পরিকল্পনাবিদের।