প্রচ্ছদ জাতীয় হাদি হ’ত্যার তিন আসামিকে ফেরানো নিয়ে ফের তোড়জোড়

হাদি হ’ত্যার তিন আসামিকে ফেরানো নিয়ে ফের তোড়জোড়

‘বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন, সবটাই জানি’— ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন বিস্ফোরক ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।

শুরু থেকেই ইনকিলাব মঞ্চ দাবি করে আসছে দেশীয় চক্রের সহযোগিতায় ভারতীয় আধিপত্যবাদ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করেছে। সেই দাবি এখন আবার ডালপালা মেলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

ইনকিলাব মঞ্চ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য এটিই ইঙ্গিত করে যে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে, যার পরিচয় প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

সংগঠনটি বলছে, ওসমান হাদিকে কেবল আওয়ামী লীগ-বিরোধী অবস্থানের কারণে হত্যা করা হয়েছে বলে ধরে নিলে ভুল হবে। এই হত্যাকাণ্ডে ভারতের কোনো ভূমিকা ছিল কি না তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তারা বলছে, হত্যাকাণ্ডের পরপর সীমান্ত সিল করার কথা থাকলেও তা করতে রহস্যজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে তখনকার সরকার।

ওসমান হাদি হত্যা মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করে। বর্তমানে এটি অধিকতর তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এই বক্তব্য তদন্তের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ, তা খতিয়ে দেখবে সিআইডি। এ বিষয়ে সিআইডি জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান এবং নতুন যেকোনো তথ্য সামনে এলে তা আমলে নিয়ে আরও গভীরভাবে তদন্ত চালানো হবে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, হাদি হত্যাকাণ্ডের পর মূল অভিযুক্তরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেঘালয় হয়ে কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) কর্তৃক গ্রেপ্তার হয় তারা। এই তিন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনেক অজানা তথ্য ও রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে। তাদের ফিরিয়ে আনতে পুলিশের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আবারও চিঠি পাঠানো হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি। এজন্য প্রায় এক বছর আগে থেকে শুরু করেছিলেন অভিনব প্রচারণা। এর মধ্যেই গত বছরের ১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদিকে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে গুলি করে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ১২০(বি)/৩২৬/৩০৭/১০৯/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

এ বছরের ৬ জানুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ থেকে হাদিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

ডিবির দেওয়া চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭) ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন (২৬), তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী (৪৩), ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১), জেসমিন আক্তার (৪২), হুমায়ুন কবির (৭০), হাসি বেগম (৬০), সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), মারিয়া আক্তার লিমা (২১), কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও ফয়সাল (২৫)।

চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে ১৫ জানুয়ারি আদালতে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন।

ডিবির দাখিল করা চার্জশিটভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে ১১ জন বর্তমানে কারাগারে আছেন। বাকি ৬ জন পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন, প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ, তার সহযোগী আলমগীর হোসেন, রাজধানীর মিরপুরের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফিলিপ স্নাল, মুক্তি আক্তার এবং ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তার।

শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার মোটিভ তুলে ধরে সেই সময়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, ফয়সাল নিজেও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং ভুক্তভোগীর পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের পরিকল্পনায় ন্যাক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ড হয়।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৭ আসামির কার কী ভূমিকা ছিল সে সম্পর্কে তৎকালীন তদন্তকারী সংস্থা ডিবি জানিয়েছিল, শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর। ঘটনার দিন দুজন হাদিকে অনুসরণ করছিলেন। মোটরসাইকেলে করে পেছন থেকে এসে রিকশায় বসা হাদিকে গুলি করা হয়। চালকের আসনে ছিলেন আলমগীর হোসেন আর পেছনে বসে থাকা ‘শ্যুটার’ ফয়সাল গুলি করেন।

তদন্ত অনুযায়ী, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল শ্যুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনের পলায়নে ‘সার্বিক সহায়তাকারী’ হিসেবে ভূমিকা রাখেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর ও পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী।

এছাড়া মূল আসামিদের পালাতে ও সীমান্ত পার করে দিতে ফয়সালের পরিবারের সদস্যসহ আরও ১২ জন বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন বলে পুলিশের অভিযোগে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ফয়সালের দুলাভাই মুক্তি মাহমুদ, বোন জেসমিন, বাবা হুমায়ুন, মা হাসি, স্ত্রী সাহেদা, শ্যালক ওয়াহিদ, বান্ধবী মারিয়া এবং ঘনিষ্ঠজন কবির তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সাহায্য করেন।
অন্যদিকে, আসামিদের পালিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে ভাড়ায় চালিত গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন নুরুজ্জামান। পরবর্তীতে ফিলিপ, সিবিয়ন, সঞ্জয় ও আমিনুল নামে চার ব্যক্তি ফয়সালকে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে সরাসরি সহায়তা করেন। অভিযোগপত্রভুক্ত সবশেষ অর্থাৎ ১৭ নম্বর আসামি ফয়সালকে গ্রেপ্তারের পর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে এ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন তথ্য পাওয়া গেলে বা অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে সম্পূরক অভিযোগ দাখিল করা হবে।

১৪ বার পিছিয়েছে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ

ওসমান হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১৪ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ছিল ১৭ মে। সেদিনও সিআইডি প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় আদালত তারিখ পিছিয়ে নতুন তারিখ ধার্য করেন। আগামী ৭ জুন আবার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ নির্ধারিত আছে।

অধিকতর তদন্ত সম্পর্কে যা বলছে সিআইডি

হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, চার্জশিটের বাইরে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মো. রুবেল ও মাজেদুল নামে আরও দুজনকে সিআইডি গ্রেপ্তার করেছে। তারা ইতোমধ্যে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এর বাইরে মইনুদ্দিন শুভ নামে মোটরসাইকেল সরবরাহকারী মালিককে আমরা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। তাকে গ্রেপ্তারে আমাদের টিম কাজ করছে।

তিনি বলেন, এই মামলার তদন্তে আমরা খুবই সিরিয়াস। আমাদের দিক থেকে তদন্ত কাজ প্রায় শেষের দিকে। এখন এটার আরও অগ্রগতি হতে পারে যদি মামলার মূল আসামি ফয়সাল ও আলমগীরকে দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়। তাদের নিয়ে আসতে পারলে খুব দ্রুতই আমাদের তদন্ত শেষ করতে পারব।

ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ওই দুই আসামিকে ফিরিয়ে আনতে যা যা করা দরকার সব ধরনের যোগাযোগ ইতোমধ্যে সিআইডির পক্ষ থেকে করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটা নিয়ে কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট সব ডিপার্টমেন্ট কাজ করছে। আশা করি আমরা খুব কুইকলি (দ্রুত) আনতে সক্ষম হবো এবং মামলায় যদি অন্য কোনো রহস্য থাকে সেটা উন্মোচন করতে সক্ষম হবো।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি একটি আনুষ্ঠানিক বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে বন্দি ও পলাতক আসামিদের বিনিময় আরও সহজ করতে ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য নিজ নিজ দেশের কাছে হস্তান্তর করা। চুক্তি অনুযায়ী সাধারণত রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের প্রত্যর্পণ করা হয় না। তবে গুরুতর অপরাধ যেমন, হত্যা, খুন, বা বিমান ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলোকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না এবং তাদের প্রত্যর্পণ বাধ্যতামূলক। নিজ দেশের নাগরিক হলেও প্রত্যর্পণে কোনো বাধা নেই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য আমলযোগ্য কি না দেখবে সিআইডি

কলকাতার ধর্মতলায় গত মঙ্গলবার এক জনসভায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, বাংলাদেশের একটি হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘দেশের স্বার্থে’ এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে মুখ খুলতে নিষেধ করেন।

মমতা বলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? সবটাই জানি।’

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতা অমিত শাহ। মমতা তার বক্তব্যে ‘হোম মিনিস্টার’ (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) শব্দটি বললেও অমিত শাহর নাম উল্লেখ করেননি।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এনআইএর (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি) ভয় দেখাচ্ছেন, ইডির (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) ভয় দেখাচ্ছেন, সিবিআইয়ের (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) ভয় দেখাচ্ছেন! এই সিআইডি (ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট, যা রাজ্য সরকারের অধীন) আমার আমলেও ছিল। এই সিআইডি তো তখন এইভাবে ইফেক্টিভলি (সক্রিয়ভাবে) অন্যায় কাজ করত না, এসটিএফও (স্পেশাল টাস্কফোর্স, রাজ্য সরকারের অধীন) করত না।

‘বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল, জেনে রাখুন, যা নিয়ে বাংলাদেশে রেভোল্যুশন হয়েছিল…। মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে, আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। তারপর হোম মিনিস্টার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) নিজে আমাকে ফোন করে বলেন…। এত দিন তো কই আমি বলিনি, মুখ খুলিনি…। আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে, আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে, আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি…’, বলেন মমতা।

মমতার এমন বিস্ফোরক ও ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য আমলে নিয়ে সিআইডি তদন্ত করবে কি না? জানতে চাইলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের মূল কাজ এখন কলকাতায় গ্রেপ্তার থাকা তিন আসামিকে ফিরিয়ে আনা। তাদের ফিরিয়ে আনা গেলে তদন্ত সহজ হবে। মমতা যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সত্যতা কতটুকু নাকি রাজনৈতিক, তা আমলে নিয়ে তদন্ত করা হবে। সেজন্যও ওই দুই আসামিকে সিআইডির কব্জায় দরকার। প্রয়োজনে আবারও চিঠি পাঠানো হবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় যোগাযোগ করা হবে। মমতার বক্তব্য আমাদের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই দেখেছে। তারাও নিশ্চয়ই বিষয়টি গভীরভাবে নজরে রেখেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এখানে তদন্তকারী সংস্থা হলো সিআইডি। মমতার বক্তব্য আমলে নেওয়ার প্রয়োজন হতে সেটা তারা (সিআইডি) দেখবে। এটা দেখার ব্যাপার যে, মমতার বক্তব্য হাদি হত্যায় কতটা সংশ্লিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডি’র ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডিআইজি আলি আকবর খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। যদি কিছু পাওয়া যায় তাহলে তো ইনশাআল্লাহ আপনাদের আপডেট জানাব। প্রত্যেক বক্তব্য, যে যেটাই বলুক আমরা দেখব সেটি আমাদের তদন্তের সঙ্গে কতটুকু প্রাসঙ্গিক এবং এখানে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না।

কলকাতায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের দিক থেকে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। এখন আমাদের কাউন্টার পার্ট থেকে কতটুকু কো-অপারেশন পাওয়া যায়, কীভাবে রিঅ্যাক্ট করেন সেটার উপর নির্ভর করছে। আশা করছি তারা আমাদের হেল্প করবেন।

মমতার বক্তব্যে নিয়ে যা বলছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের মন্তব্য করা উচিত নয় বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বুধবার (৩ জুন) মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটা নির্বাচন হয়েছে পাশের দেশের একটি রাজ্যে। যিনি হেরে গেছেন তিনি নানা কথা বলছেন ওনাদের সরকারকে উদ্দেশ্য করে। সেটা নিয়ে এখানে বাংলাদেশের মন্তব্য করা উচিত হবে বলে আমি মনে করি না। এটা আমাদের আলোচনা করার মতো বিষয় নয়।

তিনি বলেন, অলরেডি এটা নিয়ে কাজ চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুব সিরিয়াসলি কাজ করছে। হাদি হত্যার বিচার আমরা চাই এবং যারা ধরা পড়েছে ভারতে, তাদের ফেরত এনে বিচার বাস্তবায়ন করতে হবে এবং দ্রুত করতে হবে। সে বিষয়ে আমরা সচেষ্ট আছি।

শমা ওবায়েদ বলেন, হাদির হত্যাকারীদের ফেরত আনতে হলে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে এগোতে হবে। সে ব্যাপারে আমরা সিরিয়াসলি কাজ করছি। এটা ভালোই এগিয়েছে। আমরা ওইদিকেই আগাতে চাই। এটা নিয়ে তারা (ভারত সরকার) বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে কী কথা বলে, সেটা আমরা দেখব। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ইন্ডিয়া চাইলে কাল পরশুর মধ্যে বন্দি বিনিময় সম্ভব। সেটা হলে এ মাসেই আমাদের তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

বিচার দাবিতে আবার মাঠে নামছে ইনকিলাব মঞ্চ

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার, খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত উদঘাটনের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। তারা মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে।

বুধবার (৩ জুন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনের সামনে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, ওসমান হাদি হত্যার বিচার বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের ট্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভেতরে যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের আড়াল করার বা নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তারাও এই হত্যার সঙ্গে জড়িত।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে আমাদের ধারণা হয়েছে যে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে বাংলাদেশের এমন কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে, যার পরিচয় প্রকাশ হলে দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।

সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আবদুল্লাহ আল জাবের। তিনি বলেন, একটি বেসরকারি অনুসন্ধানী সংস্থা হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্ভাব্য খুনিদের পরিচয় প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো খুনিরা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর বিষয়টি সামনে এনেছে।