প্রচ্ছদ জাতীয় এক-এগারোর মূল ষড়যন্ত্রকারী মইন, মতি, মাহফুজ

এক-এগারোর মূল ষড়যন্ত্রকারী মইন, মতি, মাহফুজ

সরকার ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অপরাধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ মামলার বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

ঈদের পর ট্রাইব্যুনালে এসংক্রান্ত অভিযোগ দাখিল করা হবে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘এক-এগারো সরকারের সময় যেসব অমানবিক ও মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটেছে, এগুলোর নেপথ্যে মূল মহানায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।’

এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের অন্যতম কুশীলব কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রিমান্ডে এনে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও রিমান্ডে তাঁদের এক-এগারোর ষড়যন্ত্র সম্পর্কেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা মুখ খুলেছেন। তাঁদের কাছ থেকে এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের প্রধান তিন ষড়যন্ত্রকারীর নামের আদ্যাক্ষর ‘ম’।

এঁদের একজন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ। বাকি দুজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি—দুই সম্পাদক মতিউর রহমান এবং মাহফুজ আনাম। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এই দুই ষড়যন্ত্রকারী মূলত এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের মূল পরিকল্পনাকারী। এক-এগারোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরা সবাই রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এই দুজনের নাম বলেছেন। মূলত সুশীল সমাজের সঙ্গে সেনাবাহিনীর যোগসূত্রে ছিলেন এই দুই সম্পাদক।
এঁদের পরামর্শেই ফখরুদ্দীনের উপদেষ্টামণ্ডলী গঠিত হয়েছিল। এঁরাই ছিলেন এক-এগারোর সময় মূল পরামর্শদাতা।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, রিমান্ডে সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের মূল হোতাদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। রিমান্ডে তাঁর কাছে মূলত জানতে চাওয়া হয়—কেন, কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এক-এগারো সংঘটিত করেন। কেন প্রশ্নে তাঁরা জানিয়েছেন, সুশীল সমাজের একটি অংশের ষড়যন্ত্রের ফসল ছিল এক-এগারো। এই সুশীল সমাজ বাংলাদেশে একটি অনির্বাচিত সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ধরনা দেয়। তাঁদের একাংশের তৎপরতায় বাংলাদেশে সৃষ্টি করা হয় ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা। একই সঙ্গে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি বিতর্কিত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়। জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সেনাবাহিনী যুক্ত হয়েছে শেষ পর্যায়ে। তাঁর মতে, শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যাবে, এই বার্তা পাওয়ার পরই সশস্ত্র বাহিনী এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের অংশ হয়। গ্রেপ্তার সেনা কর্মকর্তারা দাবি করেন, সশস্ত্র বাহিনী এক-এগারোর পরিকল্পনার অংশ ছিল না। বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিল।

তদন্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, এক-এগারোর মূল পরিকল্পনাকারী ছিল সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দুটি সংবাদপত্র—প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। এই দুই পত্রিকা অনির্বাচিত সরকারকে কিভাবে ক্ষমতায় আনা যায়, কিভাবে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে বিতর্কিত এবং নিষ্ক্রিয় করা যায়, সর্বোপরি কিভাবে বিদেশি সহায়তায় একটি শক্তিশালী সুশীল সরকারকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখা যায় তার নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা দাবি করেন, এক-এগারোর আগে এবং এক-এগারোর সময়ে সংবাদপত্র দুটির সংবাদ, সম্পাদকীয় এবং মন্তব্য প্রতিবেদন পড়লেই এ ষড়যন্ত্রের আদ্যোপান্ত জানা যাবে।

সবচেয়ে বেশি সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে। তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একটি বিশেষ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০৬ সালের শুরু থেকে দেশের প্রভাবশালী একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক সুপরিকল্পিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার চালাতে থাকে। তথাকথিত ‘যোগ্য প্রার্থী’ বাছাইয়ের নামে এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দেশব্যাপী সেমিনার এবং গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি করা। গ্রেপ্তার আরেক সেনা কর্মকর্তা, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ দাবি করেন, ওই সময় কিছু প্রভাবশালী মহল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্দিষ্ট দিকে নিতে কাজ করেছিল। তাঁর ভাষ্যমতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সমালোচনার আড়ালে এমন একটি জনমত তৈরি করেছিল, যেখানে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তিনি অভিযোগ করেন, এ প্রক্রিয়ায় ‘বিরাজনৈতিকীকরণ’ ধারণাটি সামনে আনা হয় এবং সেটি জনপ্রিয় করতে সংবাদ পরিবেশন ও বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘ওয়ার অ্যাগেইনস্ট টেরর’ সুযোগকে কাজে লাগিয়েছিল এই দুষ্টচক্র।

এক-এগারো-পরবর্তী দুই বছর দেশের ওই প্রভাবশালী দুটি পত্রিকা শুধু সংবাদমাধ্যম হিসেবেই কাজ করেনি, বরং তারা ছিল ডিজিএফআইয়ের অঘোষিত মুখপত্র। গোয়েন্দা সেলে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা বানোয়াট ও কল্পিত তথ্যগুলো কোনোপ্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘বিশেষ প্রতিবেদন’ হিসেবে ছেপে দেওয়া হতো। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এটিএন নিউজের একটি টক শোয় স্বীকার করেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্য তিনি যাচাই না করেই তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ করেন। তা ছাড়া প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান শতরূপা বড়ুয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক-এগারোর আর কোনো বিকল্প ছিল না বলে মন্তব্য করেন। এসব তথ্য এখন গোয়েন্দাদের হাতে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এক-এগারোর সরকার আসার পর আগের ধারাবাহিকতায় পত্রিকা দুটি এমন পরিবেশ তৈরি করেছিল, যাতে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন করা সহজ হয়। পরিকল্পনাকে জনসমর্থনযোগ্য করে তুলতে বিভিন্ন প্রতিবেদন, কলাম ও টক শোয় ধারাবাহিকভাবে একটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রচার করা হয়েছিল।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, মিডিয়ায় কী যাবে না যাবে তা ঠিক করে দিতেন এই পত্রিকা দুটির সম্পাদকরা। সূত্র বলছেন, পত্রিকা দুটি শুধু নেতিবাচক খবরই ছাপত না, বরং তারা রাজনৈতিক দলের ভেতর বিভেদ তৈরির কারিগর হিসেবেও কাজ করেছিল। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও তথাকথিত ‘সংস্কারপন্থী’ নেতাদের ব্যাপকভাবে প্রমোট করা হতো ওই দুই পত্রিকায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাকে যখন রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছিল, তখন এ পত্রিকাগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বিরাজনৈতিকীকরণের নীলনকশা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল। ‘তারেক রহমানের বিচার হতেই হবে’ শিরোনামে একজন সম্পাদক প্রথম পৃষ্ঠায় কলাম লেখেন।

গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক ডিজিএফআইপ্রধান জেনারেল মামুন খালেদ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, এ তথ্যগুলো তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ জানিয়েছেন, ক্ষমতা দখলের তিন দিন আগে ৮ জানুয়ারি দুই সম্পাদক সেনা সদরে সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা সেখানে দুই ঘণ্টার বেশি অবস্থান করেন বলে জানান মামুন খালেদ। তিনি দাবি করেন, এ বৈঠকেই ক্ষমতা দখলের খুঁটিনাটি বিষয় চূড়ান্ত হয়।

তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে তিনি জানিয়েছেন, মইন এবং তাঁর সঙ্গীরা যখন বঙ্গভবনে যান তখন তাঁদের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতির জন্য একটি লিখিত ভাষণ ছিল। এ ভাষণেই ইয়াজউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। জানা গেছে, এ ভাষণটি লিখে দিয়েছিলেন সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত প্রথম আলোর সম্পাদক। জেনারেল মামুন খালেদ জানান, তৎকালীন সেনাপ্রধান নিজেই তাঁকে এ তথ্য দিয়েছিলেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং জেনারেল মামুন খালেদ দুজনই তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, এক-এগারোর সব কিছু জানেন দুই সম্পাদক-মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এক-এগারোর রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব। এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, আগামী মাসের শুরুতেই এক-এগারোর সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু হবে।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন