প্রচ্ছদ জাতীয় টাকা নিয়া’ আসলে আসেন না আসলে নিয়া গেলাম

টাকা নিয়া’ আসলে আসেন না আসলে নিয়া গেলাম

ঢাকার সাভারের কমলাপুর খ্রিষ্টানপাড়ায় গত শনিবার সন্ধ্যায় এক বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি। অভিযানে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব ‘সাধু আন্তনীর পর্ব’র জন্য বাড়িতে রাখা ১ লিটার ‘বাংলা মদ’ উদ্ধার করা হয়। এরপর সেই মদ দেখিয়ে পুরো বাড়ি তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিতে আর কিছু না পেয়ে বাসায় থাকা টাকা-পয়সা নিয়ে যায় ডিবি ওই ব্যক্তিরা। এরপর আটক করা হয় বাড়ির এক পুরুষ সদস্যকে। পরে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে রাতেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনার বেশ কয়েকটি অডিও এসেছে কালবেলার হাতে।

একটি অডিওতে ডিবি সদস্য পরিচয়ধারী এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘হ্যালো, আপা—আমরা কি অফিসে চলে যাব?’ আটককৃত ওই ব্যক্তির স্ত্রী বলেন, ‘না না আপনে বলছি না একটু এদিকে আসার চেষ্টা করেন, আমি তো লোক পাইতাছি না। আর বলছি, একটু কমাই টমাই ব্যবস্থা করেন, তাইলে তো আমি যাইতাম—তারপরও একজন নিয়ে।’

এরপর ডিবি পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আসার দরকার নাই, আমরা গেলাম। আপনার বাসায় মদ পাওয়া গেছে। মামলা হবে।’ তখন ওই নারী বলেন, ‘না না হ্যালো; বলছি না আপনারা যা চাইছেন, আমি তো ওটা ব্যবস্থা করতে পারতেছি না, এহন আপনি একটু কমাই টমাই করেন আমি তো বলছি আপনারে।’ ওই ব্যক্তি আবার বলেন, ‘আমরা অফিসে চইলা যাইতাছি; মামলা হবে তাইলে।’ উত্তরে ওই নারী বলেন, ‘না না এই কথা কইলে কেমনে হইব, কন?’

তাদের আরও কিছু কথোপকথন নিচে তুলে ধরা হলো—

ডিবি পরিচয়ে ব্যক্তি: আপনি আসতে পারবেন কত দূর, ইয়া কোন জায়গা পর্যন্ত? কোথায় আসতে পারবেন বলেন…!

নারী: আপনি একটু আগাই আহেন কোনোদিকে, ওই ইয়া পাকিজার সাইটে; তাইলে তো আমি আসতে পারি।

ডিবি পরিচয়ে ব্যক্তি: আপনি কোথায়? কোন পর্যন্ত আসতে পারবেন—বলেন?

নারী: কমলাপুর আসতে পারবেন; কমলাপুর।

ডিবি পরিচয়ে ব্যক্তি: কমলাপুর তো আপনার বাড়ির কাছে।

নারী: বাড়ির ভেতরে না ঢোকেন। সাইটে আসতাম।

ডিবি পরিচয়ে ব্যক্তি: না না ওখানে যাইতে পারব না। আপনি আগাই আসতে পারবেন? তাইলে আমরা দাঁড়াব, আর যদি না পারেন তাহলে আমরা অফিসে চলে যাব।

নারী: তাহলে ধরেন্ডা আসেন, ধরেন্ডা।

ডিবি পরিচয়ে ব্যক্তি: আপনি হাই পয়েন্টে আসেন।

নারী: ধরেন্ডার মোড়তুড়ি আহেন, ধরেন্ডা আর হাইপয়েন্ট তো কাছাকাছিই।

ডিবি পরিচয়ে ব্যক্তি: আচ্ছা আসেন। দ্রুত আসেন।

এ ছাড়া আরও একটি অডিও তো তাদের মধ্যে একই ধরনের কথাবার্তা শোনা যায়।

ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যায় কয়েকজন ব্যক্তি এসে নিজেদের ডিবির সদস্য পরিচয় দিয়ে সরাসরি ঘরে প্রবেশ করে। পুরা ঘর সার্চ করছে। কয় আর কোথায় জিনিস আছে বাইর করে দিতে বলে। তারা জানান, আর কোন জিনিস নাই।’

ভুক্তভোগী পরিবারের এক নারী সদস্যর দাবি, অভিযানের সময় ঘরের বিভিন্ন পার্স (ব্যাগ) ও টাকা তল্লাশি করা হয়। এক পর্যায়ে প্রায় ৭ হাজার টাকা থাকা একটি পার্স সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন টাকাটি আর নেই।

ওই নারীর দাবি, তার ১৩ বছর বয়সী ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখানো হয় এবং মারধরের চেষ্টাও করা হয়। পরে ছেলেকে দিয়ে তার বাবাকে ডেকে আনা হয়। তিনি বলেন, ‘ওর বাবারে দোকান থেকে ডাইকা আনাইছে। বলছে ডাইকা আনো, নয়তো তোমারে মারব।’

পরিবারটির দাবি, পরে তার স্বামীকে হাতকড়া পরানো হয়। এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। ওই নারী বলেন, ‘আমি কই এত টাকা কোত থেকে দিব? পরে ২০ হাজার টাকা দেই তো ছাইড়া দিয়া যান কইলাম। কিন্তু তারা রাজি হয় নাই।’ তার অভিযোগ, অভিযানে আসা ব্যক্তিরা তাদের কাছ থেকে মোট ৯ হাজার ১০০ টাকা নিয়ে যায়। পরে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ধার করে প্রায় ৪১ হাজার টাকা জোগাড় করা হয়। সেই টাকা নিয়ে কমলাপুর ও পাকিজা এলাকায় যোগাযোগের পর ধরেন্ডা এলাকায় টাকা নিয়ে তার স্বামীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ‘অভিযানে আসা ব্যক্তিরা তার স্বামীর মোবাইল নিয়ে যায় এবং তার স্বামীর ফোন নম্বর দিয়েই যোগাযোগ করা হয়। তারা নিজেদের নম্বর দিতে রাজি হয়নি।’

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তাদের বাসা থেকে দেড় লিটারের মতো মদ জব্দ করা হলেও সেটি বিক্রির জন্য নয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রাখা হয়েছিল জানিয়ে ওই নারী বলেন, ‘সামনে আমাদের সাধু আন্তনীর পর্ব আছে। ওই উপলক্ষে রাখা ছিল। আমরা খ্রিষ্টান মানুষ, অনুষ্ঠান হলে একটু খাই।’

বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিতে গেলে প্রথমে বিপত্তি বাধে নামে নামে। অভিযানে অংশ নেওয়া অফিসার নিজের নাম এসআই আরিফ বলে ভুক্তভোগী পরিবারকে জানান। তারা একটি নোয়া গাড়ি নিয়ে ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন।

কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা যায়—সাভার এলাকায় দায়িত্ব পালন করে ঢাকা দক্ষিণ ডিবি। কিন্তু সাভারের আরিফ নামে দুজন এসআই ও একজন এএসআই আছেন। তাদের তিনজনের সঙ্গেই কথা বললে তারা প্রত্যেকেই বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং কোন ব্যক্তি তাদের নাম করে এই কাজ করেছেন—সেটা বের করার জন্য প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন। অভিযানে বেশ কয়েকজন সদস্য থাকলেও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় একজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় কালবেলা। পরে ভুক্তভোগী পরিবারকে ওই কর্মকর্তার ছবি দেখালে তারাও নিশ্চিত করেন। যিনি শনিবার রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রথমে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘আমার গত রাতে (শনিবার) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিউটি ছিল। গেটের ডিউটি, অনেক কড়া ডিউটি। সেখান থেকে নড়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। ওই ধর্ষণ চেষ্টার আসামিকে ধরা নিয়ে তোড়জোড় চলতেছে। আমি ধরেন্ডায় যাইনি।’ এরকিছুক্ষণ পরে তিনি এই প্রতিবেদককে আবার ফোন দিয়ে অনুরোধ করেন—‘ভাই এই কাজটা কে করছে দয়া করে বাইর করবেন। কোনোভাবেই এড়িয়ে যাবেন না, প্লিজ। আমার নাম করে কাজটা কে করল জানা দরকার।’

কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দেখা যায় শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ৫৩ মিনিট থেকে রাত ৮টা ৪২ মিনিট পর্যন্ত ওই কর্মকর্তা ধরেন্ডা এলাকায় ছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা অস্বীকার করে বলেন, ‘ওই ভুক্তভোগী পরিবারকে আমার সামনাসামনি করেন।’ ভুক্তভোগী পরিবারকে সামনাসামনি করা আমার কাজ না, আমার কাছে প্রমাণ আছে; আপনি ওখানে কেন গেছিলেন—এমন প্রশ্নে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘তাহলে আমার আর কিছু বলার নাই।’ পরে ভুক্তভোগী পরিবারকে ওই কর্মকর্তার ছবি দেখালে তারাও নিশ্চিত করেন।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হয় ঢাকা জেলা উত্তর ডিবির ওসি মো. সাইদুল ইসলামের সঙ্গে। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘আমি তা জানি না। আমার থানায় দুজন এসআই। একজন ঢাকায় গেছিল, আর একজন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিউটিতে ছিল। আমি তো জানি না।’ অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। আমার নলেজে নেই। আমার জানামতে কোনো অভিযান হয়নি।’

এদিকে গতকাল রোববার রাত পৌনে ১০টার দিকে ওসি মো. সাইদুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে ফোন করে জানান, তারা সিডিআর পেয়েছেন, আইডেন্টিফাই করেছেন। ওটা এসআই আরিফ নয়, এএসআই আরিফ। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তখন এই প্রতিবেদক ওসিকে বলেন, ‘একজন এএসআই তো অভিযান পরিচালনা করতে পারে না। সেখানে এসআই কে ছিল? তখন ওসি বলেন, ‘এসআই আব্দুল হাই সঙ্গে ছিল।’ একই সময়ে, একই স্থানে এসআই আরিফ কী করছিল—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘রাউন্ড ডিউটি ছিল। হয়তো আমিনবাজার গেছে।’ সেখানে এসআই আরিফ তো এক ঘণ্টার মতো ছিল—এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, ‘সেটা তো আমি বলতে পারব না। তবে আমাদের তদন্তে এএসআই আরিফের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে।’