প্রচ্ছদ জাতীয় সুদীপ-মিমোর সর্ম্পকের চ্যাট-ছবি প্রকাশ্যে

সুদীপ-মিমোর সর্ম্পকের চ্যাট-ছবি প্রকাশ্যে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ছাত্রী মুনিরা মাহজাবীন মিমোর আত্মহত্যার ঘটনায় একই বিভাগের শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর শাস্তির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে ঘটনার পর তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের বিভিন্ন ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু চ্যাটের স্ক্রিনশট ও ছবি সামনে এসেছে। এসব স্ক্রিনশটে দেখা যায়, আত্মহত্যার আগে মিমো এক পরিচিত ব্যক্তিকে নিজের এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। আত্মহত্যার পূর্বে তিনি ছয়টি ঘুমের ওষুধ সেবন করেছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীসহ আরেক সহপাঠীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে কিছু তথ্য-প্রমাণ রেখে যাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন ওইসব চ্যাটে।

মিমোর সঙ্গে শিক্ষক সুদীপের একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তবে শেষদিকে আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়সহ নানা কারণে মিমো ক্ষুব্ধ ছিলেন। এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি শিক্ষক ও ওই শিক্ষার্থীকে দায়ী করে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

একটি হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার চ্যাটের স্ক্রিনশটে তাদের মধ্যে ‘সম্পর্ক’ সংক্রান্ত কথোপকথনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সেখানে মিমো অভিযোগ করেন, এমন সম্পর্কের বিনিময়ে ওই শিক্ষক তাকে কাজের সুযোগ করে দিতেন। তবে এ বিষয়ে শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর কোনো প্রতিক্রিয়া স্ক্রিনশটে স্পষ্ট নয়।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে ঘোরাঘুরির সময় তোলা তাদের কিছু ছবিও সামনে এসেছে। অন্তত দুটি অনুষ্ঠানে তাদের একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। একটি স্ক্রিনশটে তাদের ভিডিও কলে ‘ফ্লাইং কিস’ বিনিময়ের দৃশ্যও দেখা যায়।

মিমোর সহপাঠী ও বিভাগের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা জানান, তার সঙ্গে শিক্ষক সুদীপের একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তবে শেষদিকে আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়সহ নানা কারণে মিমো ক্ষুব্ধ ছিলেন। এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি শিক্ষক ও ওই শিক্ষার্থীকে দায়ী করে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

এদিকে মিমোর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন সহপাঠী ও বিভাগের শিক্ষার্থীরা। আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরা সংহতি জানান। এতে অংশ নেন ডাকসু নেতারাও।

মিমোর সুইসাইড নোটে লেখা ছিল— ‘সুদীপ স্যারকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। … (সহপাঠী) আর সুদীপ স্যার ভালো থাকো, স্যারের দেওয়া গিফটগুলো ফেরত দেয়া…।’

মানববন্ধনে বিভাগের শিক্ষার্থী আনিয়া আক্তার বলেন, বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও মানসিকভাবে নিপীড়ন করার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, মিমোর অকাল মৃত্যু তারই এক মর্মান্তিক পরিণতি। এ সময় তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার এবং ক্যাম্পাসে নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি জোর আহ্বান জানান।

এর আগে অভিযুক্ত সহযোগী অধ্যাপক ড. সুদীপ চক্রবর্তীকে বিভাগের সকল প্রকার অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিভাগীয় শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিনের মৃত্যু এবং এর প্রেক্ষিতে ড. সুদীপের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিভাগটির চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ২০২৪ সালের এমএ ২য় সেমিস্টারের মেধাবী শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে বিভাগীয় পরিবার শোকাহত। ওই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট মামলায় বিভাগের শিক্ষক ড. সুদীপ চক্রবর্তী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হন। মামলা রুজু হওয়ার কারণে বর্তমানে তিনি জেলহাজতে রয়েছেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য গত ২৬ এপ্রিল বিশেষ একাডেমিক কমিটির সভা আহবান করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, ড. সুদীপ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে চলমান আইন প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিভাগের কোনো প্রকার একাডেমিক কার্যক্রম, ক্লাস এবং পরীক্ষা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবেন না। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে।

গত রবিবার (২৬ এপ্রিল) ভোরে উত্তর বাড্ডার একটি বাসা থেকে ঢাবি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার পর ওই দিনই বিকেলে রাজধানীর উদয় ম্যানসন এলাকা থেকে শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মিমোর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মিমো সচরাচর দরজা খোলা রেখে ঘুমাতেন। তবে ঘটনার দিন ফজরের আজানের পর দরজা বন্ধ দেখে পরিবারের সদস্যরা ধাক্কাধাক্কি করেন। তবে কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান। তার সহপাঠীরা জানিয়েছেন, রবিবার সকাল ৯টার দিকে তারা খবর পেয়ে বাড্ডা এলাকায় তার বাসভবনে আসেন।

এ সময় ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সুইসাইড নোটে সুদীপ চক্রবর্তী ও আরেক ছাত্রীর নাম থাকায় তাদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। সুইসাইড নোটে লেখা ছিল— ‘সুদীপ স্যারকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। … (সহপাঠী) আর সুদীপ স্যার ভালো থাকো, স্যারের দেওয়া গিফটগুলো ফেরত দেয়া…।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা, বিভাগটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, মিমোর মৃত্যুর আগে গত বৃহস্পতিবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে ঢাবির কলাভবনের ৬০১ নম্বর কক্ষে শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী ও আরেক ছাত্রীকে ‘অন্তরঙ্গ’ মূহুর্তে দেখেন মিমো। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ হয় বলে জানা গেছে।

যদিও বিষয়টি নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঘটনার দিন দুপুর ১টার পর আমি অফিসে ছিলাম না। তাই পরবর্তীতে কী ঘটেছে সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।’