
ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মিকে খালাস দেওয়ার রায়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তামিমার সাবেক স্বামী ও মামলার বাদী রাকিব হাসান। আদালতের রায় ঘোষণার পর তিনি দাবি করেছেন, মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণ ও সাক্ষ্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি এবং তিনি এ রায়ে সন্তুষ্ট নন।
বুধবার (১০ জুন) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা তাম্মির বিরুদ্ধে আনা ব্যভিচার, প্রতারণা, অবৈধ বিয়ে ও পরকীয়াসংক্রান্ত অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে তাদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।
রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় রাকিব হাসান কালবেলাকে বলেন, আদালত মাত্র কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রায় দিয়েছেন। অথচ মামলায় আরও একাধিক সাক্ষী এবং বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ ছিল, যেগুলোর অনেকগুলোই আদালতে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন বা আলোচনা করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আদালত দুই-তিনটি কথা শুনেই রায় দিয়ে দিয়েছে। এখানে আরও ৮-১০টি সাক্ষী ও বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ ছিল অনেকগুলোই পরিপূর্ণভাবে পড়ে শোনায়নি। আমি এ রায়ে সন্তুষ্ট নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে প্রমাণ ও পিবিআই প্রতিবেদন এমনকি সব সাক্ষী দ্বারা প্রমাণ করেছি তারা অপরাধ করেছে। শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম ন্যায়বিচার পাব। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই এসেছিলাম।’
রাকিবের মতে, ‘তারা অত্যন্ত ক্ষমতাধর। তাদের বন্ধু বিসিবির প্রধান। তাদের অনেক বড় বড় জায়গায় লিংক আছে। জাতীয় দলের প্লেয়ার ছিল। তাদের একটা ফোনকলে অনেক কিছু হবে, যেটা আমাদের হাজার বার দৌড়ালেও হবে না। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি হতাশ ছিলাম।’
‘কিন্তু আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই আমি আদালতে এসেছিলাম ন্যায়বিচার পাব এই আশা নিয়ে। কিন্তু সেটা হলো না,’ যোগ করেন তিনি।
কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া থাকলেও তালাক কার্যকরের একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। তামিমার সাবেক স্বামীর দাবি, সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
এ বিষয়ে রাকিব হাসান কালবেলাকে বলেন, ‘যা হলো তাতে দেখা গেল—সে এখানে এমন একটা কথা বলল। কাবিননামাতে দেওয়া আছে আমি আমার বউকে পারমিশন দিয়েছি তালাক দেওয়ার। সবারই পারমিশন দেওয়া থাকে, লেখায়ই থাকে। পারমিশন দেওয়া থাকলে তো তালাক দিবেই কিন্তু একটা নিয়ম তো আছে। সেই নিয়মটা পরিপূর্ণভাবে ফলো করেনি।’
উল্লেখ্য, দীর্ঘ পাঁচ বছর তিন মাসের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দেওয়া এ রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় দায়ের করা মামলায় নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা তাম্মিকে খালাস দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার পর নাসির-তামিমার আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, আদালতের সিদ্ধান্তের ফলে এখন আর তাদের বিয়েকে অবৈধ বলার সুযোগ নেই। তিনি জানান, আদালত উচ্চ আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ের আলোকে তালাকের বিষয়টি পর্যালোচনা করেছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তালাকনামার নোটিশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে না পৌঁছালেও তা তালাককে অকার্যকর করে না। বরং তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর আচরণ, বসবাসের অবস্থা ও পারস্পরিক সম্পর্কই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত দেখতে পান, ২০১৬ সালে তামিমা সুলতানা তার আগের স্বামী রাকিবকে তালাক দিয়ে সৌদি আরব চলে যান এবং পরে ২০২১ সালে নাসির হোসেনকে বিয়ে করেন। এ সময়ের মধ্যে তার অবস্থান, যোগাযোগ ও পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া মামলায় তালাকনামাকে জাল দাবি করা হলেও সে অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। তালাকনামার মূল কপি, ডাকযোগে পাঠানো নোটিশ এবং সংশ্লিষ্ট পোস্টাল রসিদ আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব নথির সত্যতা নিয়ে বাদীপক্ষও কার্যকরভাবে প্রশ্ন তুলতে পারেনি বলে আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন।
সবশেষে আদালত সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তামিমা সুলতানা তার আগের স্বামীকে যথাযথভাবে তালাক দিয়েই নাসির হোসেনের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছেন। ফলে অবৈধ বিয়ে, ব্যভিচার কিংবা প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তামিমার সাবেক স্বামী রাকিব হাসান মামলাটি দায়ের করেন। তার অভিযোগ ছিল, বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় তামিমা নাসির হোসেনকে বিয়ে করেছেন এবং এ ঘটনায় তিনি ও তার কন্যা মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তবে আদালতের সর্বশেষ রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ মামলার প্রথম ধাপের আইনি লড়াইয়ের ইতি ঘটল। যদিও রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে রাকিব হাসান ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি তিনি বিবেচনা করবেন।












































