
দুঃসময় ক্রমেই যেন গ্রাস করছে পুরো পৃথিবীকে। এই মুহূর্তে বলতে গেলে সারা বিশ্বেই হয় যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধাবস্থা চলছে। এসব দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ সরাসরি জড়িত না হলেও মানবজাতির অংশ হিসেবে আমাদের একেবারে নির্লিপ্ত থাকারও সুযোগ নেই। যেমন ধরুন, ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর বর্বর ইসরাইলিদের গণহত্যায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও একজন মানুষ, বিশেষ করে মুসলমান হওয়ার ফলে প্রতিদিন এসব খবর পড়ে ভয়ানক বিষণ্ণতায় ভুগতে থাকি। ওদিকে ইয়েমেন, সৌদি আরব, লিবিয়া, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে মুসলমানের সঙ্গে মুসলমানের যুদ্ধ চলছে।
বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা না হয় অধিকাংশ অর্থ না বুঝেই কোরআন পড়ে। আরবদের ব্যাপারে আমরা কী বলব? মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা আল-ইমরান (৩:১০৩), আল-মাইদা (৫:২), আল-আম্বিয়া (২১:৯২) এবং আল-হুজুরাত (৪৯:১০)-এর একাধিক আয়াতে উম্মাহর ঐক্যের ওপর এত যে জোর দিয়েছেন, তার মর্মার্থ আমরা ভাষার দুর্বলতায় না বুঝলেও আরবরা তো নিশ্চয়ই বোঝে। সে ক্ষেত্রে কোরআনের নির্দেশ অমান্য করে তারা কেমন করে এমন ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে লিপ্ত থাকতে পারে? এ তো রীতিমতো আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা!
ইরানের ওপর নৃশংস ও অন্যায় হামলার জন্য আমরা যতই জায়নিস্ট ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করি না কেন, ইসলামবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সমগ্র পৃথিবীর শান্তি এবং অর্থনীতি বিনষ্টকারী এই যুদ্ধে উসকানি দেওয়ার পেছনে তথাকথিত দুই ইসলামিক দেশ আরব আমিরাত এবং সৌদি শাসকদের ভূমিকা এড়িয়ে যাব কী করে? তদুপরি আমাদের বিপদ তো কেবল দূরের নয়, কাছেরও আছে।
জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদীদের প্রধান ক্রীড়নক শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে উৎখাত হলেও দিল্লি আমাদের পুনরায় পদানত করার চেষ্টায় কখনো বিরাম দেয়নি। তাদের প্রধান ক্রোধ সব জুলাইযোদ্ধা এবং প্রফেসর ইউনূসের ওপর হলেও বিএনপির নেতারা যদি এই ভ্রান্তিতে থাকেন যে, ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগের জায়গায় তারা দিল্লির প্রিয়পাত্র হয়ে যাবেন, তাহলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন। ভারতের শাসক শ্রেণি যে সব সময় তাদের অতিশয় বিশ্বস্ত ভৃত্য শেখ হাসিনা অথবা তার বংশধরদেরই ক্ষমতায় ফেরানোর সুযোগের অপেক্ষা করবে, এই সত্য ভুলে গেলে অতীতের মতো বিএনপিকেই মাশুল দিতে হবে। অথচ দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়ে আওয়ামী ‘সফট পাওয়ার’ ময়দান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ভয় হচ্ছে, মুসলমান ‘গুপ্ত’ তাড়াতে গিয়ে এভাবে হিন্দুত্ববাদী ‘গুপ্ত’ ডেকে আনা একসময় খাল কেটে কুমির আনার মতো হয়ে যেতে পারে।
গত বুধবারের কলামে আমি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রতি শাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছিলাম। আজ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের চেষ্টা করব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিয়ে শুরু করা যাক। পাঠক যখন আমার লেখা পড়ছেন, তখনো আমরা দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল জানতে পারিনি। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সেখানকার ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হয়েছে। তবে নির্বাচন-পূর্ব সব জরিপে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দল ধারাবাহিকভাবে বেশ পিছিয়ে ছিল। মার্কিন মিডিয়ার সেই সব জরিপ ও সংবাদ বিশ্লেষণ থেকে আমার ধারণা হয়েছে দলটি কংগ্রেসে নিশ্চিতভাবেই হারতে চলেছে। অবশ্য সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার সম্ভাবনা বেশি বলে আমি মনে করছি। এবার ওই কক্ষের যে এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়েছে, তার অধিকাংশ কট্টর রিপাবলিকান সমর্থক রাজ্যগুলোতে পড়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান অজনপ্রিয়তার ফলে তার দলের সিনেটে হয়তো বর্তমানের তিন আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমে গিয়ে একটি মাত্র আসনে দাঁড়াতে পারে। রিপাবলিকানদের আরো একটি সুবিধা আছে। সেটা হলো, ১০০ আসনের কক্ষে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের ৫০-৫০ সমতা হলেও ভাইস প্রেসিডেন্টের নির্ণায়ক ভোটের জোরে রিপাবলিকানরাই ওই কক্ষে এগিয়ে থাকবে। আর শেষ পর্যন্ত সিনেটেও আশ্চর্যজনকভাবে ক্ষমতাসীন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে বাকি দুই বছরের মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক ‘খোঁড়া হাঁস’ প্রেসিডেন্টে (Lame Duck President) পরিণত হবেন। গত কয়েক দিন সর্বত্র আলোচিত ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সম্ভাব্য ‘ব্লু ওয়েভে’ যদি মার্কিন ভোটাররা বিপুল সংখ্যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দিক থেকে সত্যিই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি গত দুই বছর যেভাবে সারা পৃথিবীকে ব্যক্তিগত জমিদারির মতো নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন, তার অবসান ঘটবে। নির্বাচন পূর্ববর্তী সর্বশেষ জরিপে সেই ‘ব্লু ওয়েভ’ ঘটার সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য হুমকি দিয়েছেন যে, নির্বাচনের এমন ফলাফল হলে তিনি ‘মিস্টার ভেটো’তে পরিণত হবেন। অর্থাৎ কংগ্রেস এবং সিনেটের সব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। এমন অচলাবস্থায় বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি প্রকৃতপক্ষে অকার্যকর হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে বিশ্বের যেসব শাসক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত এবং ওয়াশিংটনের কট্টর জায়নিস্ট ‘এস্টাবলিশমেন্টের’ সন্তুষ্টির বিনিময়ে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, তাদেরকেও বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। ইসরাইলে যেমন যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহু বিপদে পড়ে যাবেন, তেমনি যথাক্রমে জায়নিস্টদের প্রকাশ্য এবং গোপন সমর্থক আরব আমিরাত ও সৌদি শাসকদের দিকেও এগিয়ে আসা বিপদ দেখতে পাচ্ছি।
এই উপমহাদেশেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রিয় ফিল্ড মার্শাল, পাকিস্তানের প্রবল ক্ষমতাধর সেনাপ্রধানও হয়তো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আগের মতো অতটা প্রভাবশালী থাকবেন না। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খানিকটা বিভ্রান্তিকর। একসময়ের কথিত ঘনিষ্ঠ বন্ধু নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বর্তমানে খানিকটা দূরত্ব সৃষ্টি হলেও কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সমআদর্শের ইসলামবিদ্বেষী ট্রাম্পকেই সমর্থন করার কথা। কাজেই মোদি এবং তার দলও নিশ্চয়ই গভীর উদ্বেগের সঙ্গে নির্বাচনের ফলের দিকে তাকিয়ে আছে। মোটকথা, ওয়াশিংটনে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সারা দুনিয়ার রাজনীতিকেই বিপুলভাবে প্রভাবিত করবে। আজকের লেখার এ পর্যন্ত পড়ে পাঠক নিশ্চয়ই বাংলাদেশে কী ঘটবে, সে বিষয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। এবার সেই আলোচনা।
বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশ নিঃসন্দেহে ভারত এবং পাকিস্তান। মার্কিন সেনাবাহিনী কাবুল থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকে সার্কের বাকি দেশগুলো নিয়ে মার্কিন প্রশাসন তেমন একটা মাথা ঘামায় না। তাই দেশটির নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশের ওপর সরাসরি কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। তবে, অতীতে বাংলাদেশের বিষয়ে ওয়াশিংটনের দিল্লি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার বহু নজির রয়েছে। রিপাবলিকান বুশ এবং ডেমোক্র্যাট ওবামা, উভয়ই দিল্লিকে অসন্তুষ্ট করে দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। বাইডেন প্রশাসনের মাঝামাঝি থেকে ওয়াশিংটনে দিল্লির সেই একচেটিয়া প্রভাব কমতে শুরু করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসনও এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় যথেষ্ট ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করে চলেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গত বছর ভারত অযৌক্তিকভাবে যুদ্ধ শুরু করলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বেশ বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন।
তার হুমকিতে চার দিনের মধ্যে নরেন্দ্র মোদি যুদ্ধবিরতি মেনে নিতেও বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলাদেশে মহান জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনে ভারত ভয়ানক অসন্তুষ্ট হলেও মার্কিন প্রশাসন এক অর্থে সেই পরিবর্তনকে স্বাগতই জানিয়েছিল। দলমত নির্বিশেষে পশ্চিমাদের প্রিয় প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়াটা ওয়াশিংটন-ঢাকা সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক হয়েছিল। সেই ইতিবাচক সম্পর্কের রেশ ধরেই ড. ইউনূসের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পেরেছেন। রাজনীতিতে ‘আজব শয্যাসঙ্গী’ এক অতি পুরোনো প্রবাদ। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস এবং সিনেটে নাটকীয় পালাবদল ঘটলেও এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের ভারসাম্যমূলক নীতির তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটবে বলে আমি মনে করছি না। শুধু একটি বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকার জন্য পরামর্শ দিতে পারি।
পূর্বঅভিজ্ঞতা অনুসারে ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত রিপাবলিকানদের তুলনায় বিভিন্ন দেশে সুশাসন, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার নিয়ে বেশি মাত্রায় সোচ্চার থাকেন। অতএব, বাংলাদেশ সম্পর্কিত মার্কিন নীতির তেমন কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন না ঘটলেও গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে সরকারের অধিকতর জবাবদিহিতার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নিশ্চয়ই এসব বিষয়ে আমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন। আশা করি, তিনি মানবাধিকার এবং মিডিয়ার স্বাধীনতা রক্ষা ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে সরকারপ্রধানকে যথাযথ পরামর্শ দেবেন। অর্বাচীন ও নব্যদের হঠকারিতা সরকারকে বিপদে ফেলে দিতে পারে।
অপর যে গুরুত্বপূর্ণ কারণে মার্কিন নির্বাচনে আমাদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত হতে পারে, সেটা হলো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। কংগ্রেস এবং সিনেট, উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাট দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ইসরাইলের উসকানিতে ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে অন্যায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত হওয়ার আশা আছে। সেই প্রেক্ষাপটে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হলে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধেরও অবসানের সম্ভাবনা রয়েছে। এই দুই যুদ্ধ থেমে গিয়ে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেকটাই হ্রাস পাবে। সারা বিশ্ব ওদিকেই চেয়ে আছে।
সেই মার্চ থেকে যুদ্ধের ধাক্কায় অনেক বেশি দামে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল এবং গ্যাস কিনতে গিয়ে আমাদের অর্থনীতি ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি স্বল্পোন্নত দেশের পক্ষে এই বোঝা বেশিদিন আর টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হ্রাস এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য আমাদের জাতীয় আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি সাধারণ জনগণকে ক্রমেই সরকারের প্রতি বিরক্ত করে তুলছে। ঋণ করে স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে আমরা ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কেবল বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশই নয়, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী ইউরোপীয় দেশগুলোও কাহিল অবস্থায় পড়েছে।
অতএব, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর চরম হঠকারিতার বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের এখন সোচ্চার হওয়া উচিত। ব্রাজিল এবং সার্বিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনে ট্রাম্প সমর্থক প্রার্থীদের পরাজয় বিশ্ব জনমতের বিলম্বে হলেও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে রিপাবলিকানরা নির্বাচনে হেরে গেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চরিত্র অনুযায়ী তার দিক থেকে যেকোনো অবিশ্বাস্য রকমের হঠকারী পদক্ষেপ গ্রহণের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি আরেক উন্মাদ এবং সম্প্রতি নির্বাচনে পরাজিত যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহুকে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হামলা শুরু করে পুরো পৃথিবীকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তেও নিয়ে যেতে পারেন। আল্লাহ না করুন, সেরকম পরিস্থিতি হলে শুধু বাংলাদেশ নয়Ñসারা বিশ্ব ধ্বংসের মুখোমুখি হবে।
সব মিলিয়ে বর্তমানে আমরা যে এক অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করছি, সেটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই বলেই আমার ধারণা। আগেই বলেছি, এক শক্তিশালী বৈরী প্রতিবেশী চারদিক বেষ্টন করে থাকায় আমাদের বিপদের মাত্রাটা অন্য যেকোনো দেশের চাইতে বেশি। পতিত ফ্যাসিবাদের জননী সেই বৈরী দেশে অবস্থান করে রাষ্ট্রের শান্তি বিনষ্ট করার যাবতীয় অপপ্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। দিল্লির অন্যান্য এজেন্টরাও বাংলাদেশের ভেতর থেকে তাদের বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এই চতুর্মুখী বিপদ মোকাবিলা করার জন্য জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
জনগণ আশা করেছিল, প্রায় দুই দশক পরে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যারা সরকার গঠন করবেন, তারা সর্বপ্রথম আগ্রাসনবিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করবেন। আশা ছিল, নির্বাচনকালীন সব রাজনৈতিক তর্কে লাগাম টেনে ফ্যাসিবাদের ভিকটিম, সব রাজনৈতিক দল দেশ পুনর্গঠনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারি এবং বিরোধী দল থাকাটাই সমীচীন ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু, তাদের মধ্যে অহেতুক তিক্ততা প্রত্যাশিত নয়। ভুলে গেলে চলবে না যে, সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল সবাই মহান জুলাই বিপ্লবের অংশীদার।
বিপ্লব না হলে তারা কেউ আজ ‘লুই কানের’ ওই ইমারতে ঢুকতে পারতেন না। ধূসর রাজকীয় ইমারতের পরিবর্তে তারা রাষ্ট্রেরই অন্য প্রকার কোনো এক লাল ইমারতে থাকতেন। পতাকা ওড়ানো গাড়ির বদলে প্রিজন ভ্যানে চলাচল করতে হতো। তিক্ত সত্য কোনো ক্ষমতাবানেরই ভালো লাগে না। আমার এসব লেখালেখিতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের মতো এরাও ক্রুদ্ধ হচ্ছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নির্বাচন-পরবর্তী প্রায় নয় মাসে আমাদের অনেকটাই আশাভঙ্গ হয়েছে। এ অবস্থার জন্য কোন দল বেশি দায়ী, সে তর্কে না গিয়ে আমি শুধু এটুকু বলব যে, জাতীয় ঐক্য সৃষ্টিতে সব সময় সরকারের দায়িত্ব বেশি থাকে। সরকারের অভ্যন্তরের কিছু ব্যক্তি সরকার এবং বিরোধী দলের দূরত্ব বৃদ্ধিতে অতি মাত্রায় উৎসাহী বলে মনে হচ্ছে। এরা মূলত দলে অনুপ্রবেশকারী। শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে সরকারপ্রধানকেই এদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকারি এবং বিরোধী দল একদিকে একে অপরের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদকে লালন করার অভিযোগ আনছে, আবার অন্যদিকে ফ্যাসিবাদ ফিরে এলে কার বিপদ বেশি হবে সেটা নিয়ে পরস্পরকে ভয় দেখাচ্ছে। এই সস্তা রাজনৈতিক বক্তব্য উভয় পক্ষের পরিহার করা উচিত। ‘গুপ্ত’ এবং ‘চাঁদাবাজ’ বয়ান বাদ দিয়ে রাজনীতিতে শালীনতা আনয়ন করলে রাজনীতিবিদরা জনগণ দ্বারা প্রশংসিত হবেন বলেই আমি মনে করি।
ক্ষমতায় গেলে সমালোচনা মেনে নেওয়ার মনোভাব তৈরি করারও আহ্বান জানাই। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ সরকারের সমালোচনা করলে তাকে জেলে ভরে দেওয়ার যে রীতি চালু হয়েছে, তার দ্রুত অবসান হওয়া জরুরি। ভুলে গেলে চলবে না যে, অতি উৎসাহী আদালত হাসিনার ফ্যাসিবাদ নির্মাণ সহজ করে দিয়েছিল। প্রতীয়মান হচ্ছে, ফ্যাসিবাদের সেই ভূত এখনো নিম্ন আদালতের কাঁধে সওয়ার হয়ে আছে। এ কারণেই বিচার বিভাগের প্রয়োজনীয় সংস্কার অত্যাবশ্যক ছিল। প্রধান বিচারপতি হয়তো এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারেন। এটা শুভলক্ষণ যে, ওবায়দুল হাসান গংয়ের বিদায়ের পর উচ্চ আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে।
ডিসেম্বরে ফ্যাসিবাদের জননী ফিরবেনÑএ জাতীয় গালগল্পকে আমলে না নিলেও, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি সংক্রান্ত আগুয়ান বিপদের ব্যাপারে আবারও সংশ্লিষ্ট সব মহলকে সতর্ক করছি। পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতা এবং রাজধানীতে শ্রমিক আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির পেছনে ফ্যাসিবাদী এবং আগ্রাসনবাদীদের সংযোগ বুঝতে ব্যর্থ হলে তার দায় ক্ষমতাসীনদেরই বহন করতে হবে। ‘গুপ্ত’ খোঁজার সময় পালিয়ে যাচ্ছে না। আপাতত ওটা বাদ দিয়ে বাহ্যিক হুমকি এবং প্রকাশ্য শত্রুর অপতৎপরতার দিকে মনোনিবেশ করাই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারকে পুনরায় জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করার জন্য সব পক্ষকে আহ্বান জানানোর অনুরোধ রেখে আজকের পর্ব শেষ করছি।










































