
নবম পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার শিগগির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেতন স্কেলের জন্য গঠিত সচিব কমিটি সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে, এরই মধ্যে সব সদস্য স্বাক্ষরও করেছেন।
নতুন বেতন কাঠামোয় ১ম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন দ্বিগুণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকে নবম পে-স্কেলের এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
ই-বুকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম বছরে বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর করা হবে। পরের বছরে নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে নতুন বেতন কাঠামোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের বিশেষ উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সব সদস্য চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন বলে ই-বুকে জানানো হয়েছে।
কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক।
জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি চাপে থাকায় তাদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সুপারিশ অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে মূল বেতন সর্বোচ্চ দ্বিগুণ হতে পারে। অন্যদিকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশের চেয়ে কিছুটা কম রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:৯ থেকে কমিয়ে ১:৮ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের বড় ধরনের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। নবম পে কমিশনের পুরো সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে একবারে পুরো কাঠামো বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও নিয়মিত ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ সংশ্লিষ্ট খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে শুধু বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর করা হলে চলতি অর্থবছরের বাজেট থেকে এর প্রাথমিক ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। পরবর্তী বছরে নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করা হবে।
এদিকে চলতি বছরের মধ্যেই নবম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, পে-স্কেল নিয়ে সরকারের আলোচনা শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং সব দিক বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিচারকদের পে-স্কেল পর্যালোচনা সংক্রান্ত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এ বছরের মধ্যে হবে, সবই হবে। কিন্তু এখানে তো অনেকগুলো আলোচনার বিষয় আছে। আজকে আমরা একটি দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। সব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত হলে সেটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব।’
এর আগে রোববার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবও জানান, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে এবং এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, খুব দ্রুতই সরকার এ বিষয়ে ঘোষণা দেবে এবং চলতি অর্থবছরের মধ্যেই এটি বাস্তবায়নের আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও বিচার বিভাগের বেতনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে পে-স্কেল বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে বলে সরকার জানিয়েছে। এ জটিলতা নিরসনে সাত সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর ২০২৫ সালে নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। গত ২১ জানুয়ারি কমিশন তাদের প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে বলে তখন জানানো হয়েছিল।
সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ায় এখন সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।












































