
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্ব অর্থনীতির উদীয়মান শক্তিগুলোর এই মহা-জোটে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত সরকার। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহেই দিল্লি যেতে পারেন তারেক রহমান। শেখ হাসিনা ইস্যু, ৫ আগস্টের বিতর্কিত বক্তব্য এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক চাপের মাঝেও– কেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই ভারত সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ? আজ আমরা ব্যাখ্যা করব এই সফরের পেছনের আসল কূটনৈতিক সমীকরণ।
বাংলাদেশকে কেন ব্রিকসে আমন্ত্রণ
বাংলাদেশ তো ব্রিকসের স্থায়ী সদস্য নয়, তাহলে এই আমন্ত্রণ কেন? নিয়ম অনুযায়ী, ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজক দেশ বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের প্রধানদের আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ জানায়। ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে ভারত। আর অন্যদিকে, ২০২৫ সাল থেকে প্পপ]০ক অর্থনৈতিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ, বিমসটেক জোটের চেয়ারম্যান হিসেবেই বিমসটেক প্রধান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই আমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
গত জুলাইয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হলেও, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কিন্তু নিশ্চিত করেনি যে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাবেন কি–যাবেন না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে– বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে শুক্রবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের দ্বিতীয়ার্ধে দুই দিনের সফরে দিল্লি যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে সফরের তারিখ ও সময়সূচিসহ বিভিন্ন বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এমনকি দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও কিছু জানানো হয়নি।
সফরটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সফরটি কেন বাংলাদেশ ও ভারত– দুই দেশের জন্যই গেমচেঞ্জার হতে পারে? প্রথমত: সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একটি অদৃশ্য বরফ জমেছিল। তৈরি হয়েছিল সম্পর্কের মারাত্মক টানাপোড়েন। একটি নির্বাচিত সরকার আসার পর সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা শুরু হলেও নানা ইস্যুতে তা আটকে যাচ্ছে। সাবেক অভিজ্ঞ কূটনীতিকেরা মনে করছেন, তারেক রহমান যদি এই সম্মেলনে যান এবং নরেন্দ্র মোদির সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন–তবে দুই দেশের জমে থাকা বরফ গলতে বাধ্য।
দ্বিতীয়ত: ব্রিকসে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ বহু দিন ধরেই ব্রিকস জোটের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। উদীয়মান অর্থনীতির এই প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতারা যখন মুখোমুখি বসেন, তখন অনেক জটিল সমস্যার সমাধান সহজেই হয়ে যায়। আর ভারতেরও উচিত এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা।
প্রধান বাধা তবে কী?
তাহলে ঢাকা কেন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছে? কেন এত অস্বস্তি? এর পেছনে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ। প্রথমত: শেখ হাসিনা ইস্যু। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে বসে ক্ষমতাচ্যুত ও সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। ঢাকা আগে থেকেই এ বিষয়ে উদ্বেগ জানালেও ভারত তা আটকায়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন– জুলাইয়ের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। ভারতের মাটিতে বসে একজন আসামির এমন বক্তব্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সরকার একদমই ভালোভাবে নেয়নি।
দ্বিতীয়ত: দেশের ভেতরের রাজনৈতিক সমীকরণ। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বেশ জোরালো। সংসদে থাকা বিরোধী দলগুলোও ভারত প্রশ্নে বেশ কট্টর অবস্থান নিয়ে আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক চাপের কারণে বিএনপি সরকার অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ ফেলছে, যাতে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত বলে মনে না হয়।
সাবেক কূটনীতিকদের পরামর্শ
তবে সাবেক অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা বলছেন অন্য কথা। দিল্লিতে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস মনে করেন, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে তারেক রহমানের এই সফরে যাওয়া উচিত। কূটনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মতে, শুধু সম্মেলনে গিয়ে অংশ নেওয়ার চেয়ে, যদি নরেন্দ্র মোদির সাথে একটি সফল দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নিশ্চিত করা যায়, তবেই এই সফরটি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে।
কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই সফর গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন, জ্বালানি-সংক্রান্ত চুক্তি এবং ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহারেরও পথ তৈরি করবে।
আসছে সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি যাবেন না– সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ। শেখ হাসিনা ইস্যু এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক সেন্টিমেন্ট সামলে তারেক রহমান কি কূটনৈতিক জট ছাড়াতে দিল্লি যাবেন? খুব শিগগিরই হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।












































