
কর্মসংস্থান ও শিক্ষা ইস্যুতে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবার তরুণ ভোটারদের মন জিততে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামকে নতুন রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় ৪০ কোটি সম্ভাব্য জেন-জি ভোটারের কাছে পৌঁছাতেই বিজেপির এই নতুন কৌশল।
সম্প্রতি মোদি তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একের পর এক ছোট ভিডিও প্রকাশ করছেন। এসব ভিডিওতে তাকে কখনো বাইকার জ্যাকেট ও সানগ্লাস পরে র্যাপ সংগীতের তালে দেখা গেছে, আবার কখনো জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘ফ্রেন্ডস’-এর থিম সং ব্যবহার করে নিজেকে সহজ-সরল ও নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে দেখা যায়। ৩১ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন, “হাই, ফ্রেন্ডস।” এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে তরুণদের সঙ্গে সংযোগ তৈরির জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ও অনানুষ্ঠানিক কনটেন্ট তৈরির দিকে ঝুঁকছে বিজেপি।
দিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা খুব দ্রুত লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে তিনি মনে করেন, ইনস্টাগ্রামে সফল হতে হলে শুধু পরিকল্পিত প্রচারণা নয়, বাস্তবধর্মী ও স্বাভাবিক উপস্থাপনাও জরুরি।
গত মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। আন্দোলনের মুখে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন। ভারতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকে সরকারি চাকরি ও আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণরা ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ছোট ভিডিও ব্যবহার করে নিজেদের বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। এর ফলে মোদির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং সরকারের জনমত নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
এই পরিস্থিতির পর শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, গত কয়েক দিনে ভারতের বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি সংস্থাও ছোট ভিডিও প্রকাশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তারা এখন স্ন্যাপচ্যাটেও উপস্থিতি বাড়াবে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নরেন্দ্র মোদি ডিজিটাল প্রচারণাকে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেন। টেলিভিশন, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স (সাবেক টুইটার)সহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিজেপি শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রজন্ম অতিরিক্ত সম্পাদিত ও সাজানো কনটেন্টের চেয়ে স্বাভাবিক, কম সম্পাদিত এবং বাস্তবধর্মী ভিডিও বেশি পছন্দ করে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন স্কুলের অধ্যাপক জয়োজিৎ পাল বলেন, অতিরিক্ত পরিকল্পিত ও কৃত্রিমভাবে উপস্থাপিত ভিডিও তরুণদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায় না। বরং তারা এমন কনটেন্টে বেশি আকৃষ্ট হয়, যেখানে স্বাভাবিকতা ও বাস্তবতার ছাপ থাকে।
ভারতের ১৪০ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ৩৫ বছরের নিচে। ফলে ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে জেন-জি ভোটাররা অন্যতম বড় ভোটব্যাংকে পরিণত হবে। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বিজেপি এখন তরুণদের ভাষায়, তরুণদের প্ল্যাটফর্মে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত হতে নারাজ বিশ্লেষকরা। লেখক ও পডকাস্টার অনুরাগ মাইনাস ভার্মা বলেন, ইন্টারনেটের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। রাজনৈতিক বার্তাকে রিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করলেও তা সহজেই ট্রলের শিকার হতে পারে। তাই ইনস্টাগ্রামে উপস্থিতি বাড়ালেই জেন-জি ভোটারদের আস্থা অর্জন করা যাবে—এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
সূত্র: রয়টার্স











































