
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার যে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি কেন ঘটেছে সে রহস্য এখনও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে স্থানীয় লোকজন এবং ওই ভবনের ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পূর্বের একটি ঘটনা নিয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে অভিযুক্ত যুবক। এ অবস্থায় এক মাস পার হলেও ঘটনার রহস্য এখনও উদঘাটন হয়নি।
পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার এক মাস পার হলেও হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ কিংবা রহস্য পুরোপুরি উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এর প্রধান কারণ সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদার গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। আবার তার ব্যবহার করা পরিচয়পত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় তদন্তে সময় লাগে। অন্তর মজুমদার আগে ওই ভবনের আশপাশে ভাড়া থাকতেন এবং তার একটি ভুয়া পরিচয়পত্রের তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। কেন পরিচয় লুকিয়ে ছিলেন, তারও তদন্ত চলছে। অন্তর একা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন নাকি তার পেছনে অন্য কেউ আছে, তা এক মাস তদন্ত করেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত ২৫ জুন সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড (দেনায়েতপুর) এলাকার একটি ভাড়া বাসায় হত্যাকাণ্ড ঘটে। হামলার পর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে প্রধান অভিযুক্ত যুবকও নিহত হয়েছেন। মা ও মেয়েদের কুপিয়ে হত্যার পর গণপিটুনির শিকার হন অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদার (৩০)। তিনি ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা। আহত অবস্থায় তাকে ওই দিন ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান।
অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার ছারামন উল্লাহ ইউনিয়নের চরফজলুল করিম গ্রামের সুজিৎ মজুমদারের ছেলে। অন্তর তার এলাকায় কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে খারাপ আচরণের কারণে গ্রাম ও পরিবার থেকে বিতাড়িত। তবে তিনি বিবাহিত ছিলেন বলে চাচাতো ভাই টিটু মজুমদার মোবাইলে জানিয়েছেন।
নিহতরা হলেন মা শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০), মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা বেশ কয়েক বছর ধরে রায়পুরের ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন। তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস অ্যাকাডেমি থেকে এসএসসির ফলপ্রত্যাশী ছিল। একই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল ছোট মেয়ে শিফা আক্তার। আর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি একটি দোকানে কাজ করছেন। গত ২৬ জুন মা ও তিন মেয়ের লাশ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে দাফন করা হয়েছে।
শাহিনুরের স্বামী মো. কামাল হোসেন ২০১৯ সালে উপজেলার মোল্লারহাট এলাকায় রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন শাহিনুর। অভিযুক্ত ওই যুবক নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও রায়পুরে ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। এক বছর আগে শাহিনুরের ওই ভবনের একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। সেখান থেকে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়।
নিহতদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পিটুনিতে নিহত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার। তিনি নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কার্তিক মজুমদারের ছেলে এবং পেশায় একজন ফল বিক্রেতা। আগে একই ভবনের পাঁচতলার একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন এবং ওই পরিবারটির পূর্ব পরিচিত ছিল।
ঘটনার দিন মারা যাওয়ার আগে অন্তর স্থানীয় জনতার কাছে বলেছিলেন, ‘আমি বাসায় ঢুকে দেখি তাদের রক্তাক্ত লাশ মাটিতে পড়ে আছে। তখন পালাতে গিয়ে লোকজনের কাছে ধরা পড়ে যাই।’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কয়েকদিন আগে শাহিনুর বেগম তার বাবা, ভাই ও শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়কে বলেছিলেন, ‘আমি রায়পুরে থাকতে পারবো না। আমার পেছনে লোক লেগে গেছে। বাড়িওয়ালার ছেলে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মো. মাহি হোসেন আমার বড় মেয়ের দিকে নজর দিয়েছে। তাকে বিরক্ত করছে। তার সঙ্গে আমার ঝামেলা হয়েছে। এটি বাড়িওয়ালা জানতে পেরে তার ছেলেকে বকঝকা করেছেন। কিন্তু সেই ঝামেলা এখনও মেটেনি।’
মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় অন্তর মজুমদার ছাড়াও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে জুনায়েদ হোসেন বলেন, ‘আমি কারণ জানি না। পুলিশও কিছু এখনও জানায়নি। এমনকি বাড়িওয়ালার ছেলের সঙ্গে ঝামেলার বিষয়েও আমাকে কিছু জানানো হয়নি।’
শাহিনুর বেগমের সঙ্গে কী নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল জানতে চাইলে বাড়িওয়ালা স্কুলশিক্ষক আমির হোসেন বলেন, ‘আমি তো ঝামেলার বিষয়ে কিছুই জানি না। আমার ছেলে ঢাকার উত্তরা থেকে লেখাপড়া করছে। মাঝেমধ্যে বাসায় আসে। শাহিনুর বেগমের মেয়ের সঙ্গে কোনও ঝামেলার কথা আমি কখনও শুনি নাই।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রায়পুরের ওই ভবনের দুজন ভাড়াটিয়া নারী জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে স্কুলশিক্ষক আমির হোসেনের ভবনের পাঁচতলায় ভাড়া থাকতেন অন্তর মজুমদার। পাশাপাশি ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। নিচতলায় তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন শাহিনুর বেগম। সেই সূত্রে শাহিনুর বেগমের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর মাঝে মধ্যে উত্ত্যক্ত করতেন। আজেবাজে কথা বলতেন। অন্তরের স্বভাব ভালো ছিল না। নেশা করতেন। কয়েক মাস আগে শাহিনুরকে আজেবাজে কথা বললে তা নিয়ে দুজনের বাগবিতণ্ডা হয়। তখন শাহিনুরের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন অন্তর। আশপাশের লোকজনও তখন জড়ো হন। একপর্যায়ে বাড়ির মালিক আমির হোসেনকে জানালে অন্তরকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন বাড়িওয়ালা। কিন্তু চলে গেলেও ভেতরে ভেতরে যে ক্ষোভ জমিয়ে রেখেছেন তা কারও জানা ছিল না। ওই ঘটনায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।
মা ও তিন মেয়েকে হত্যা, অভিযুক্ত সেই ছেলেটির বিষয়ে যা জানা গেলোমা ও তিন মেয়েকে হত্যা, অভিযুক্ত সেই ছেলেটির বিষয়ে যা জানা গেলো
আরেক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, ওই দিন সকাল ৯টার দিকে শাহিনুরের বাসায় আসেন অন্তর। তখন তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে শাহিনুর ও তাদের মেয়েদের কুপিয়ে জখম করেন। এ সময় শাহিনুর চিৎকার দিলে অন্তর পালানোর চেষ্টা করেন। তখন স্থানীয়রা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেন। এতে মৃত্যু হয়। ঘটনার পর উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের ছয় সদস্য আহত হন।
তদন্তে কী পেলো পুলিশ
পুলিশের ভাষ্য, তদন্তে এখনও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হত্যার সময় বাসার ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির লক্ষ্য একজন ছিলেন নাকি পুরো পরিবার, হত্যার আগে কোনও কিছু ঘটেছে কিনা, পূর্বপরিচয় থাকা সত্ত্বেও কেন এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
এর মধ্যে এক মাসের বেশি সময় পার হলেও হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। অভিযুক্ত হত্যাকারীর মাদকাসক্তি, তার সঙ্গে নিহতদের পূর্বপরিচয়, স্বর্ণালঙ্কার লুট, অর্থ লেনদেন ও পূর্ববিরোধ—এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এগুলোই সামনে এসেছে পুলিশ। ফলে এ নিয়ে চলছে নানা সমালোচনা।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে পুলিশ।
ঘটনার দিন ছয় পুলিশ সদস্য আহত ও অন্তর নিহতের ঘটনায় এসআই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে আরেকটি মামলা করেন। দুটি মামলার তদন্ত করছেন রায়পুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আবদুল মান্নান। সোমবার আবদুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন তদন্ত শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি চার্জশিট তৈরি করা হচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।’ তদন্তে কী পেলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তা চার্জশিটে উল্লেখ করা হবে। তখন জানতে পারবেন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা এবং অভিযুক্তকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছিল। দুটি ঘটনারই তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে। মামলা দুটির চার্জশিট তৈরি হচ্ছে। এ ঘটনায় নিহত অন্তরের সঙ্গে বাড়িওয়ালার ছেলে কিংবা অন্য কোনও ব্যক্তি জড়িত আছে কিনা, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আমরা চার্জশিট তৈরি করছি। পাশাপাশি এখনও ঘটনার তদন্ত করছি। এরপর আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।’
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন













































