
দেড় দশকের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের পর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিএনপি জোট সরকার গঠনের চার মাসের মধ্যেই একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। চীনা একটি প্রবাদ হচ্ছে, ‘বিশাল একটি বাঁধ ধসিয়ে দিতে একটি ইঁদুরের সুরঙ্গই যথেষ্ট’। শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের অযাচিত মন্তব্য, হঠকারী সিদ্ধান্ত দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে নাখোশ ও বিক্ষুব্ধ করেছে।
লাগাতার বৃষ্টিতে সারাদেশে পথ-ঘাট তলিয়ে যাওয়ার বাস্তবতাকে সর্বতোভাবেই একটি দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এহেন বাস্তবতায় এইচএসসি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা স্থগিত না করে তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত ছিল অবিবেচক ও বালখিল্যতাপূর্ণ। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন তার এই সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করেছে, তখন তিনি নিজের ভুল স্বীকার না করে শিক্ষার্থীদের ‘ব্রয়লার মুরগি’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন। এখন এ কথা ব্যাপকভাবে উঠে আসছে যে, এসব ‘ফার্মের মুরগি’দের আন্দোলনেই শেখ হাসিনার পতন ও পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
অতএব, তাদের আন্দোলনেই এহসানুল হক মিলনরা এমপি ও মন্ত্রী হতে পেরেছেন। বিশেষত দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের ভুল সিদ্ধান্তের পেছনে শিক্ষামন্ত্রী ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে না পারার ব্যর্থতার দায়ভার তাঁকে নিতেই হবে। সেই সাথে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল এবং অসামঞ্জস্যতার বিষয়টিও এখন বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো ভারি হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী নিজের ভুল স্বীকার করে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিলেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তার পদত্যাগের দাবি থেকে সরে আসেনি। গতকালও ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি, শাহবাগ, শিক্ষাভবন ও সংসদ ভবন এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সমাবেশ করেছে।
মাত্র চারমাস বয়েসি সরকারের জন্য এ পরিস্থিতি বিব্রতকর। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিলম্ব করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়া মন্ত্রী পরিষদের কোনো সদস্য সরকারের জন্য অপরিহার্য নয়। সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের মনে রাখতে হবে, বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের কারণে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটেনি। বৈষম্য বিরোধী, প্রতিবাদী দলনিরপেক্ষ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অগ্নিতে শেখ হাসিনার ‘রাজাকার’ শব্দটি ঘৃত সঞ্চার হিসেবে দেখা দিয়েছিল। এরপর শিক্ষার্থীরা স্লোগান তুলেছিল, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’। ভারতের আদালতে একটি মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি একশ্রেণীর যুব-তরুণদের ‘ককরোচের’ সাথে তুলনা করার পর হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমে এসে নিজেদের ককরোচ জনতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতিবাদী রাজনৈতিক কর্মকা- শুরু করেছে। তারা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছে। ইন্টারনেট-তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগের বহুবিধ মাধ্যমের এই যুগে নব্বই দশকের চিন্তাধারা অচল। শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতা ও চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে, তিনি একটি জাতীয় দুর্যোগপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তে অনড় থেকে নিজের জনবিচ্ছিন্নতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছেন। তার এই নির্বুদ্ধিতার কারণে তারেক রহমানের সরকারকে এখন এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সুযোগে পতিত আওয়ামী লীগের দোসররা পানি ঘোলা করতে মরিয়া হয়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। তাদের ফাঁদে পা দেয়া যাবে না, পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগেই শিক্ষামন্ত্রীকে অপসারণ মন্ত্রী পরিষদের অন্য সদস্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ ও দৃষ্টান্ত হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রীসহ যেসব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা ইতিমধ্যেই নিজেদের বিতর্কিত কর্মকা-ের মাধ্যমে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করেছেন; তাদের মতো হঠকারী, বালখিল্য ও অনাস্থাপূর্ণ ইমেজ নিয়ে মন্ত্রী হিসেবে সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
দেড় দশকের দুর্নীতি, অর্থনৈতিক লুটপাট দেশের ব্যাংকিং সেক্টরসহ অর্থনীতিকে দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এই নাজুক পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় পরিস্থিতি আরো সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে যে প্রত্যাশা জেগে উঠেছিল, ইরান যুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং দেশে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ গার্মেন্ট রফতানি খাত এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বড় ধরনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশের শত শত গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকা- ও শ্রমবাজারও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। খুব দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রভাব পড়বে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় পক্ষ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করতে পারে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কোথাও কোথাও তেমন প্রবণতা দেখা গেছে। মন্ত্রী-এমপিদের কেউ কেউ ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। তাদের বল্গাহীন আচরণ ও কথাবার্তা সরকারের ইমেজের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে তার ঘোষিত অবস্থানে অনড় থেকে তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে। বিতর্কিত ভূমিকা ও দায়িত্বহীন আচরণের জন্য দু’চারজন মন্ত্রীকে বাদ দিলে সরকারের কোনো ক্ষতি হবে না। শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সাথে অখ্যাত দুই নারী সাংবাদিকের বিশেষ সম্পর্কের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে এবং শ্রেণীকক্ষে ফিরিয়ে নিতে হলে শিক্ষামন্ত্রীকে দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হবে।










































