প্রচ্ছদ জাতীয় সংসদে ‘ডিম থেরাপি’ দেওয়ার কথা বললেন রেহানা আক্তার রানু

সংসদে ‘ডিম থেরাপি’ দেওয়ার কথা বললেন রেহানা আক্তার রানু

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু ব্যাংক ‘লুটেরা এবং ব্যাংক-খেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে তাদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা গ্রাহকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার’ দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “বক্তব্য পরিষ্কার, যারা গ্রাহকের টাকা লুট করেছে, ওই সমস্ত ব্যাংক ডাকাত-ব্যাংক লুটেরাদের কোনও ক্ষমা নেই। কোনও ক্ষমা হতে পারে না। তারা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক ফিরিয়ে এনে তাদের ‘ডিম থেরাপি’ দিয়ে এই টাকা আদায় করতে হবে।”

বুধবার (৮ জুলাই) বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২১তম দিনে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় সম্পর্কে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশে তিনি অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

নোটিশে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, “দেশের কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম দুর্নীতি এবং মালিকপক্ষের অর্থপাচারের কারণে আজ লক্ষ লক্ষ আমানতকারী তাদের টাকা তুলতে পারছে না, এই টাকা বিলাসিতার জন্য নয়। এটা একজন বাবার মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন, একজন মায়ের চিকিৎসার শেষ ভরসা, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের টিউশন ফি, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবন বাঁচানোর মূলধন, কষ্টে অর্জিত টাকা কারও পেনশনের সঞ্চয় কারও সারা জীবনের কষ্টার্জিত আয় বিশ্বাস করে ব্যাংকে রেখেছিল, ব্যাংক মানুষের আস্থার জায়গা, ব্যাংক থেকে টাকা লুট হলে মানুষ কোথায় যাবে। মানুষ যদি ব্যাংকে টাকা না রাখে বিনিয়োগ কমে যাবে, অর্থের প্রবাহ থেমে যাবে, দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বে।”

নোটিশে তিনি আরও বলেন, “একজন মানুষের টাকা ব্যাংকে আছে টাকা তুলতে পারছে না বলে সে চিকিৎসা করতে পারছে না। টাকার অভাবে সময়মতো চিকিৎসা না করাতে পেরে অনেকে মৃত্যুবরণ করছেন। লুটেরা মালিকপক্ষ বিদেশে পালিয়ে আরামে জীবনযাপন করছে। এই মানুষগুলো বর্তমান সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের কান্না, তাদের আর্তনাদ এই রাষ্ট্রের কাছে তারা ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে। এ সমস্ত লুটেরা এবং ব্যাংক-খেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে তাদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা গ্রাহকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”

নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে, একটি নির্বাচিত সরকার এই ব্যাপারে নীরব থাকতে পারে না। সরকার দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড আর্থিক খাত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে একটি সুসংগঠিত বহুমাত্রিক রেজুলেশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কাঠামোর আইনি ভিত্তি হিসেবে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬’ বর্ণিত হয়েছে। এর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক তথা এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ-পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক-পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক-পিএলসি, সোশাল ইসলামী ব্যাংক-পিএলসি ও ইউনিয়ন ব্যাংক কেন্দ্র একীভূত করে সম্মিলিত ‘ইসলামী ব্যাংক-পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। এটা রেজুলেশন কৌশলের অধীনে গৃহীত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই একীভূতকরণের ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নতুন ব্যাংকে সংরক্ষিত হয়েছে। এর পাশাপাশি আমানত সুরক্ষা তহবিলের বিধানের আওতায় নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত আমানতকারীর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬’-এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা হতে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। রেজুলেশনের আওতায় ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজুলেশন স্কিম মোতাবেক আমানতের অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত পাচ্ছে।”

অর্থমন্ত্রী বলেন, “ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর আমানতকারীরা ইতোপূর্বে আমানত সুরক্ষা আইনের আওতাভুক্ত ছিল না। বর্তমানে সরকার তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই সকল পদক্ষেপের মাধ্যমে গ্রাহকদের আমানত প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এই পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগ অনিয়মসমূহে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেন্সিক অডিট চলমান রয়েছে। যার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা হবে। উল্লেখ্য, ব্যাংক রেজলুশন আইন ২০২৬-এর ৫৭ ধারায় রেজুলেশনের আওতাধীন ব্যাংক পাওনা আদায়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়ী ব্যক্তি কর্তৃক ব্যাংকের সম্পদ অথবা তহবিল হতে অর্জিত সকল আয় সম্পত্তি অধিকার এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতো বিক্রয় নিলামের মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করি। এছাড়া ফৌজদারি ক্রিমিনাল মামলার পাশাপাশি দেওয়ানি সিভিল পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেক্টরে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে খেলাপি ঋণের টাকা অবৈধভাবে বিদেশ পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের ঋণের অর্থ উদ্ধারের জন্য নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরপূর্ব নয়টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ১১টি কেসের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ছয়টি কেস সাইফুজ্জামান চৌধুরী আলম বেক্সিমকো, শিকদার, নাসা ও অরিয়ন গ্রুপ নিয়ে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃক অর্থ উদ্ধারের এই কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে বিপুল অংকের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। এই অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এটা সংক্ষেপ নিচে দেওয়া আছে। এটা দীর্ঘ। আমি যেহেতু এই এই বিষয়গুলো আমি সংসদে বিগত দিনে বেশ কয়েকবার উত্থাপন করেছি বিধায় পঠিত বলে গণ্য করার জন্য অনুরোধ করছি।”

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর রেহানা আক্তার রানু বলেন, “মন্ত্রীর চট্টগ্রামের বাসার সামনে গ্রাহকরা মানববন্ধন করেছে এবং মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাদের আকুতি জানিয়েছে। আমি খুশি হয়েছি, কারণ গ্রাহকরা জায়গা মতোই পৌঁছেছে এবং জায়গা মতোই গেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জনগণের প্রধানমন্ত্রী—মাঝে মাঝে বিরোধী দলের মুডে চলে যান। আমিও এই মুহূর্তে বিরোধী দলের দ্বিতীয় সারিতে বসা কয়েকজন সংসদ সদস্যের মুডে যেতে চাই। ৭৫ লাখ গ্রাহকের প্রাণের দাবির সঙ্গে সহমত প্রকাশ করছি, সেটি হচ্ছে—একদিকে মানুষ টাকা তোলার চিন্তায় আছে, আরেকদিকে এখানে যোগ হয়েছে ‘হেয়ার কাট’ নামক এক ‘মরণকাট’ সমস্যা। মড়ার ওপর খাড়ার কামান, আমি মন্ত্রীকে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করতে চাই, আমি জানতে চাই যে ব্যাংক ডাকাতদের ডাকাতির দায়ভার কেন আমানতকারীদের নিতে হবে? আমানতকারীদের কী অপরাধ? আমানতকারীদের অপরাধ হচ্ছে যে তারা বিশ্বাস করে ব্যাংকে টাকা রেখেছিল। ৭৫ লাখ লাখ গ্রাহকের দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করে আমারও দাবি ‘হেয়ার কাট’ নামক এই ‘মরণ কাটটি’ প্রত্যাহার করতে হবে। প্রত্যাহার করতে হবে। প্রত্যাহার করতে হবে।”

ডিম থেরাপি দিয়ে টাকা আদায় করতে হবে

রানু আরও বলেন, “বক্তব্য পরিষ্কার, যারা গ্রাহকের টাকা লুট করেছে, ওই সমস্ত ব্যাংক ডাকাত ব্যাংক লুটেরাদের কোনও ক্ষমা নেই। কোনও ক্ষমা হতে পারে না। তারা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক ফিরিয়ে এনে তাদের ‘ডিম থেরাপি’ দিয়ে এই টাকা আদায় করতে হবে। মন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন ‘হেয়ার কাট’ নামক ‘মরণ কাট’ প্রত্যাহার করে ৭৫ লাখ গ্রাহককে স্বস্তি দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা আপনার মন্ত্রণালয় আছে কিনা?”

আমানত সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে, হেয়ার কাট থাকবে না

রানুর বক্তব্যের পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমি ভীতসন্ত্রস্ত বোধ করছি। অলমোস্ট ওয়ার্নিংয়ের মতো বক্তব্য এসেছে। আমি আগেই বলেছি এটা একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব এটার সঠিক সমাধান দেওয়া। ইতোমধ্যে আমি আগেও বলেছি সংসদে, যারা আমানতকারী তাদের আমানত সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ এই ব্যাংকগুলো সবগুলোই লোকসানের মধ্যে আছে। লোকসান কিন্তু প্রতিদিন বাড়ছে। লোকসানি একটা ব্যাংক যেখানে তার আমানত ফিরিয়ে দিতে পারছে না এবং তাকে সুদ দেওয়া যে কত কঠিন সেটা আপনাদের বুঝতে হবে। তারপরও একটা নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে আমরা নিশ্চিতভাবে তাদের আমানত এবং সুদ ফেরত দেবো। কিন্তু এটার জন্য একটা সময়ের প্রয়োজন। এই ব্যাংকগুলো ‘হেয়ার কাট’ থাকবে না’ ‘হেয়ার কাট’ থাকলে ‘হেয়ার কাট’ ‘হেয়ার কাট’ হবে না’ ‘হেয়ার কাট’ তো বাদ যাবে। আমি যখন বলছি শুনছেন। সুতরাং ‘হেয়ার কাটের’ তো আর প্রশ্ন আসছে না এখানে। তবে আমি আবারও অনুরোধ করবো, আমি জানি তাদের অপেক্ষা করার সময় নাই। মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে। মানুষ তার মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না। মানুষ প্রতিনিয়ত এই সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এটার সমাধান একটু মধ্যমেয়াদি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে—তবে নিশ্চিতভাবে এটা বলতে পারি। আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পাবে, সুদসহ ফেরত পাবে। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। তবে এটার জন্য একটু ধৈর্য ধারণ করতে হবে।”