প্রচ্ছদ জাতীয় এবার কালবেলাকে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানালেন সেই লিটুর স্ত্রী

এবার কালবেলাকে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানালেন সেই লিটুর স্ত্রী

অগ্রণী হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজকে ঘিরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই ঘটনাটিকে চাঁদাবাজি বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তবে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু কী পরিস্থিতিতে এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন, সে বিষয়ে কেউ খোঁজ নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন বাকলা ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড ও অগ্রণী হাউজিং কোম্পানির পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান লিটুর স্ত্রী মৌসুমি আক্তার লুবনা।

তিনি দাবি করেন, ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনার আড়ালে বহু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা চলছে।

সোমবার (৬ জুলাই) রাতে নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক সংলগ্ন নিজ বাসভবনে দৈনিক কালবেলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন লুবনা।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে আব্দুল আজিজের কথিত প্রতারণার লাগাম আগেই টেনে ধরা হলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সৃষ্টি হতো না। এতে অনেক পরিবার দেনার বোঝা থেকে রক্ষা পেত। ঘটনার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আজ যা ঘটেছে, তার জন্য আব্দুল আজিজ নিজেই দায়ী।

লুবনা বলেন, আমার স্বামী দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর প্রবাসে ছিলেন। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকে কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের অর্থ বাকলা ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও অগ্রণী হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আজিজের হাতে তুলে দেন।

তার দাবি, মোস্তাফিজুর রহমান লিটু কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি ২০১৫ সাল থেকে অগ্রণী হাউজিং ও বাকলা ডেভেলপারসের পরিচালক হিসেবে ব্যবসা করে আসছেন। ওই সময় তিনি হাউজিং ব্যবসায় ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন, যার দালিলিক প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই বিনিয়োগ থেকে কোনো লভ্যাংশ পাননি। এ সময় প্রমাণ হিসেবে বেশ কিছু কাগজাদি প্রতিবেদকের সামনে প্রদর্শন করেন লিটুর স্ত্রী মৌসুমি আক্তার লুবনা।

তার অভিযোগ, ব্যবসার শুরু থেকেই আব্দুল আজিজ মূলধন ও লভ্যাংশের সঠিক হিসাব দেননি। এমনকি তিনি নিজের দুই ভাইকেও একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছেন। এ ঘটনায় তারা ২০১৬ সালে আদালতে মামলা করেন, যা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পেতে লিটু বহুবার আব্দুল আজিজের কাছে গেছেন। তিনিও ব্যক্তিগতভাবে কয়েকবার গিয়ে ব্যবসার হিসাব ও টাকা ফেরতের অনুরোধ করেছেন। লভ্যাংশ না দিয়ে মূলধনের মধ্যে মাত্র ১২ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা ও লাভের হিসাব বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এতে তাদের পরিবার দেনার বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে।

লুবনার অভিযোগ, পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে অতীতেও লিটুকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পাওনা টাকা ও ব্যবসার হিসাব চাইতে গেলে তাকে জামায়াতের কর্মী বলে অভিযোগ তুলে পুলিশ ডাকা হয়। পরে কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।

তিনি দাবি করেন, শুধু মোস্তাফিজুর রহমান লিটুই নন, অগ্রণী হাউজিংয়ের আরও অনেক বিনিয়োগকারী ও অংশীদার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেকে জীবনের সঞ্চয় বিনিয়োগ করেও অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। বরং যেখানে যেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেখানে আব্দুল আজিজ নিজের নামে একাধিক ফ্ল্যাট বা প্লট নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

লুবনা বলেন, গত ২৭ জুন পাওনা টাকা ও ব্যবসার লাভের হিসাব চাইতেই লিটু এবং প্রতিষ্ঠানের আরেক পরিচালক আবুল কালাম আজাদ সদর রোডে অবস্থিত অগ্রণী হাউজিংয়ের কার্যালয়ে যান। সেখানে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা চাঁদাবাজির ঘটনা ছিল না। পাওনা অর্থ না পেয়ে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সৃষ্টি হয়। এখন সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য ব্যবসায়িক অংশীদার ও পাওনাদারদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি এ ঘটনাকে রাজনৈতিক বা চাঁদাবাজির দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বাকলা ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড ও অগ্রণী হাউজিংয়ের আর্থিক লেনদেন, বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রমের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা অর্থ উদ্ধার এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এদিকে অগ্রণী হাউজিংয়ের একজন শেয়ারহোল্ডার মাহাবুব হোসেনও একই ধরনের অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, আমি পরিবার নিয়ে প্রবাসে থাকি। ২০১২ সালে মোস্তাফিজুর রহমান লিটুর মাধ্যমে অগ্রণী হাউজিংয়ে ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করি। পরে জানতে পারি, হিসাব-নিকাশের জেরে আব্দুল আজিজের দুই ভাই আব্দুল হাই ও মো. বাচ্চু তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

মাহাবুব হোসেনের দাবি, ২০২১ সালে দেশে এসে তিনি উচ্চ আদালতে একটি রিটে স্বাক্ষর করেন। ওই সময় বরিশাল সদর উপজেলার কর্ণকাঠি এলাকায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি জমি দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে আরও দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু এক যুগ পার হলেও তিনি জমি, মূলধন কিংবা ব্যবসার কোনো হিসাব বুঝে পাননি।

তিনি বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে প্রবাস থেকে যতবারই যোগাযোগ করেছি, ততবারই বলা হয়েছে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কিছু করা সম্ভব নয়।

মাহাবুব আরও বলেন, গত ৫ জুলাই বিষয়টি নিয়ে সমঝোতার কথা ছিল। লিটুর অনুরোধে ৪ জুলাই দেশে ফিরি। পরে বরিশালে এসে জানতে পারি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে। লিটু যা করেছে, সেটি অবশ্যই ভুল। তবে আমাদের সঙ্গে যে প্রতারণা করা হয়েছে, সেটিরও বিচার হওয়া উচিত।

তার ভাষ্য, আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুধু লিটুর পরিবার বা তিনি একাই করছেন না; প্রতিষ্ঠানের আরও অনেক বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক অংশীদার একই ধরনের অভিযোগ করে আসছেন।

উল্লেখ্য, আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

সূত্র : কালবেলা