
বিভীষিকাময় জুলাই গণহত্যার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে যখন গোটা জাতি শোকে কাতর, শহীদ ও আহতদের স্বজনদের শোকে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই পৈশাচিক এই গণহত্যা ও গণঅভ্যুত্থানকে নিয়ে মিডিয়া এবং সংস্কৃতি অঙ্গনের কিছু চিহ্নিত কুশীলব ও কালচারাল ফ্যাসিস্টদের চরম ঔদ্ধত্য ও আস্ফালন সাধারণ মানুষকে তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। জুলাইয়ের অমর শহীদ ও পঙ্গুত্ববরণকারী অকুতোভয় যোদ্ধাদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টকশোতে এদের অবমাননাকর মন্তব্য ও অপপ্রচার এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের ঘৃণ্য অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন দেশের নেটিজেনরা। এই ফ্যাসিবাদের দোসরদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার দাবি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল ঝড়ে পরিণত হয়েছে।
ইতিমধ্যেই এই ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুরু হয়েছে। জুলাই আন্দোলনকে কটাক্ষ, অবমাননাকর মন্তব্য ও অপপ্রচারের অভিযোগে দেশের বেশ কয়েকজন আলোচিত অভিনেত্রী, সাংবাদিক, উপস্থাপিকা ও মডেলের বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ (এসডিএফ) নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগগুলো দায়ের করা হয়।
থানায় দায়েরকৃত অভিযোগ ও নেটিজেনদের ক্ষোভের সূত্র ধরে জানা গেছে, অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন কালচারাল ফ্যাসিস্ট মেহের আফরোজ শাওন, মাহিয়া মাহি, শান্তা ফারজানা, চ্যানেল আইয়ের উপস্থাপিকা সোমা ইসলাম, আইনজীবী ও মডেল জান্নাতুল পিয়া, সাবেক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ও কলামিস্ট মোমিন মেহেদী, কথিত সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর, মডেল মারিয়া কিসপত্তা এবং মডেল ও অভিনেত্রী তুষ্টি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, উপস্থাপিকা সোমা ইসলাম বিভিন্ন টকশোতে জুলাই আন্দোলনকে অত্যন্ত ক্ষুদ্রভাবে উপস্থাপন করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং খুনি হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। মডেল ও আইনজীবী জান্নাতুল পিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই আন্দোলনকে কটাক্ষ করেছেন এবং আন্দোলনে হাত-পা হারানো আহত বীর যোদ্ধাদের ছোট করে ‘মব’ করার হুমকি দিয়েছেন।
সবচেয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে সাবেক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা মোমিন মেহেদী ও তার স্ত্রী শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে ঢাকা প্রেসক্লাব এলাকায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপ করেছেন এবং শহীদ আবু সাঈদকে ‘নেশাখোর’ বলে চরম অবমাননাকর ও মিথ্যা দাবি করেছেন। অন্যদিকে, সাংবাদিক আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংগঠনগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে জুলাই যোদ্ধাদের অপমান ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
এছাড়া মডেল মারিয়া কিসপত্তা জুলাই আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী আন্দোলন’ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে প্রচার করার চেষ্টা করছেন এবং অভিনেত্রী তুষ্টি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জুলাইকে ‘প্রতারণার মাস’ বলে আখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, “শেখ হাসিনা কাউকে মারেননি, কেউ শহীদ হয়নি, নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করে মারা গেছে।”
শহীদদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি, হাজারো মানুষ পঙ্গু হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন—এমন একটি সময়ে মিডিয়া ও কালচারাল ফ্যাসিস্টদের এই অভূতপূর্ব আস্ফালন দেশের মানুষকে চরমভাবে মর্মাহত ও ক্রুদ্ধ করেছে। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নেটিজেনরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলছেন, এই ফ্যাসিস্ট কুশীলবদের ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই। তারা গণহত্যার শিকার হওয়া শহীদদের এবং পঙ্গুত্ববরণকারী বীরদের রক্তের সাথে বেইমানি করছে। অবিলম্বে এদের গ্রেপ্তার করে সাইবার অপরাধ ও জুলাই অবমাননার কঠোরতম ধারায় বিচার করতে হবে।
শাহবাগ থানা পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, অভিযোগগুলোর সত্যতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কিত লিঙ্কগুলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ক্রাইম ইউনিটে (ডিবি সাইবার) পাঠানো হয়েছে। সাইবার বিভাগের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে এই কালচারাল ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে দেশের সচেতন নাগরিক ও নেটিজেনদের স্পষ্ট দাবি—জুলাইয়ের শহীদদের নিয়ে কোনো ধরনের তামাশা সহ্য করা হবে না এবং এদের অবিলম্বে দৃশ্যমান শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।












































