প্রচ্ছদ হেড লাইন শেরওয়ানির জন্য আড়াই ঘণ্টা ফ্লাইট আটকে রাখলেন বিমান কর্মকর্তা!

শেরওয়ানির জন্য আড়াই ঘণ্টা ফ্লাইট আটকে রাখলেন বিমান কর্মকর্তা!

রানওয়ের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল এয়ার অ্যাস্ট্রার উড়োজাহাজ। কেবিন ক্রুর নিরাপত্তা ঘোষণা শেষ। যাত্রীরা সিটবেল্ট বেঁধে অপেক্ষা করছেন উড্ডয়নের। ঠিক তখনই কেবিনের ভেতরে শুরু হয় অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতি। এক যাত্রী বেঁকে বসেছেন, ফ্লাইটটি থামাতে হবে। কারণ শেরওয়ানি বাসায় ফেলে এসেছেন তিনি।

কেবিন ক্রু তাকে জানান, জরুরি চিকিৎসা বা নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি ছাড়া ট্যাক্সিওয়ে (বিমানবন্দরের এমন একটি নির্দিষ্ট পথ, যেখানে বিমান রানওয়েতে উড্ডয়ন বা অবতরণের আগে ও পরে নিজস্ব ইঞ্জিনের সাহায্যে ধীরে ধীরে চলাচল করে) থেকে বিমান ফিরিয়ে আনার নিয়ম নেই।এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ওই যাত্রী। নিজের পরিচয় দেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফার্স্ট অফিসার হিসেবে। বের করেন পরিচয়পত্র। সেই পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে চাপ সৃষ্টি করেন বিমান থামাতে। শেষ পর্যন্ত সব নিয়ম, প্রটোকল ও প্রায় ১০০ যাত্রীর ভোগান্তি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী এয়ার অ্যাস্ট্রার ফ্লাইট ২এ-৪১৫ ট্যাক্সিওয়ে (বিমানবন্দরের এমন একটি নির্দিষ্ট পথ, যেখানে বিমান রানওয়েতে উড্ডয়ন বা অবতরণের আগে ও পরে নিজস্ব ইঞ্জিনের সাহায্যে ধীরে ধীরে চলাচল করে) থেকেই ঘুরিয়ে আবার টার্মিনালে ফিরিয়ে আনা হয়।

অ্যাভিয়েশন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত কোনো বাণিজ্যিক ফ্লাইট এভাবে ব্যক্তিগত কারণে ফিরিয়ে আনা আন্তর্জাতিক অ্যাভিয়েশন নীতিমালার পরিপন্থি। উড্ডয়নের ঠিক আগে একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট থামিয়ে দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহারেরই উদহারণ। একই সঙ্গে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বিধি এবং অপারেশনাল প্রটোকল লঙ্ঘন।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, নিরাপত্তার হুমকি, যান্ত্রিক ত্রুটি বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের নির্দেশ ছাড়া বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ট্যাক্সিওয়ে থেকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। কোনো যাত্রীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বিমান ফিরিয়ে আনা হলে সেটি অপারেশনাল সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা প্রটোকল এবং পেশাগত নৈতিকতা- এ তিন ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে যাত্রী নেমে গেলে তার লাগেজও নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী নামানো, পুনরায় সিকিউরিটি চেক এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার পূর্ণ তদন্ত করা উচিত। তিনি অন্য এয়ারলাইন্সের অফিসার হলেও এ ফ্লাইটের সাধারণ যাত্রী। সরকারি পরিচয় বা পদমর্যাদার প্রভাব খাটিয়ে যাত্রী নিরাপত্তা হুমকি তৈরির কারণে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, এটি খুব গুরুতর ঘটনা। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি বিষয়টির খোঁজখবর নিচ্ছি। তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ঘটনায় এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং সংশ্লিষ্ট বিমানের পাইলট উভয়কেই তদন্তের আওতায় আনা হবে।

যাত্রী হয়রানির বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।

সূত্রমতে, শুক্রবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এয়ার অ্যাস্ট্রার ফ্লাইটটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে উড্ডয়নের কথা ছিল। বোর্ডিং শেষে বিমানটি ট্যাক্সিওয়ে করলে হঠাৎ করেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফার্স্ট অফিসার গোলাম রাব্বি প্রিন্স ফ্লাইট থেকে নেমে যেতে চান। নিয়ম অনুযায়ী অনুরোধ জানানো হলেও বিমান না থামায় তিনি নিজের অফিসিয়াল পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেখিয়ে হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ককপিটে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন।

অভিযোগ রয়েছে, এয়ার অ্যাস্ট্রার দায়িত্বে থাকা পাইলট তার পূর্বপরিচিত হওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিমানটি থামানোর সিদ্ধান্ত নেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেই ফার্স্ট অফিসার গোলাম রাব্বি প্রিন্স পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে চট্টগ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। তবে তাড়াহুড়োয় নিজের শেরওয়ানি বাসায় ফেলে আসেন তিনি। এ কারণে উড্ডয়নের প্রস্তুতি চলাকালেই তিনি বিমান থেকে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার এ খামখেয়ালিপূর্ণ আচরণের কারণে ফ্লাইটে থাকা শিশু-বৃদ্ধসহ প্রায় ১০০ যাত্রীকে চরম ভোগান্তি ও দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়তে হয়।

সূত্র জানায়, যাত্রীদের প্রায় তিন ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় শেরওয়ানি এনে পুনরায় বিমানবন্দরে ফেরার পর দুপুর প্রায় ১টার দিকে ফ্লাইটটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেও যাত্রীদের জন্য এয়ার অ্যাস্ট্রার পক্ষ থেকে ন্যূনতম খাবার বা পানীয়ের ব্যবস্থাও করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন একাধিক যাত্রী।

আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) বিধি অনুযায়ী, গুরুতর জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া ট্যাক্সিওয়ের পর বিমান ফিরে আসার সুযোগ নেই। এমনকি কোনো যাত্রী মাঝপথে নেমে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে ওই যাত্রীর সব লাগেজও বিমান থেকে নামিয়ে (অফলোড) পুনরায় নিরাপত্তা পরীক্ষা (সিকিউরিটি রিচেক) করতে হয়। এতে ফ্লাইটের আগের ক্লিয়ারেন্স বাতিল হয়ে যায় এবং নতুন করে স্লট নিতে হয়। অভিযোগ উঠেছে, একজন কর্মকর্তার পরিচয়পত্রের প্রভাবের কারণে এয়ার অ্যাস্ট্রা এসব নিরাপত্তা প্রটোকল লঙ্ঘন করেছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, একজন যাত্রী— তিনি অন্য একটি এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা হলেও এ ফ্লাইটে সাধারণ যাত্রী ছিলেন। হট্টগোল করলেই পাইলট কেন বিমান ফিরিয়ে আনলেন— সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাইলট ইন কমান্ড এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) তাকে ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যাত্রী’ হিসেবে রিপোর্ট করেছিলেন কিনা, নাকি সহকর্মী পাইলটের পরিচয়ের কারণে প্রচলিত প্রটোকল লঙ্ঘন করা হয়েছে, সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার।

এ ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও এয়ার অ্যাস্ট্রা— উভয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী যাত্রীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।

ফ্লাইটে থাকা এক যাত্রী আফসানা সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, আমার জরুরি প্রয়োজনে দুপুর ১২টার মধ্যে চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা ছিল। সে অনুযায়ী সময় বিবেচনা করেই টিকিট কেটেছিলাম। কিন্তু ওই ব্যক্তির খামখেয়ালিপনা ও ক্ষমতার দাপটে আমার মতো পুরো বিমানের যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। যে কাজের জন্য চট্টগ্রামে যাচ্ছিলাম, সেটিই আর করতে পারিনি। এখন এ ক্ষতির দায় কে নেবে? এয়ার অ্যাস্ট্রা ক্ষতিপূরণ না দিলে তাদের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকারে মামলা করব বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, যাত্রীদের কিছুটা দুর্ভোগ হয়েছে, সেটি আমরা অস্বীকার করছি না। তবে কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।