
এবারের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত পে স্কেল আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কাঠামোতে আনা হচ্ছে বড় পরিবর্তন। বহুল আলোচিত সেই নবম জাতীয় পে স্কেল নতুন অর্থবছর ১ জুলাই থেকে কার্যকরের জোর প্রস্তুতি চলছে।
গত ১১ জুন সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনার সময় পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা জোর দিয়ে বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, গত ১১ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, বেড়েছে মূল্যস্ফীতিও। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে ১ জুলাই থেকেই পে স্কেল বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি। তবে এটি বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে।
নতুন পে স্কেলেও বর্তমানের ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের জন্যও থাকছে বড় ধরনের চমক। বিশেষ করে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
বেতন-ভাতায় বরাদ্দ কত?
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ মোট ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে—
ক্যাডার কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য ১৩ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা
কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৩০ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ভাতার জন্য ৪৪ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে ৮৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অর্থমন্ত্রীর সংসদে প্রস্তাবিত বরাদ্দই চূড়ান্ত থাকছে এবং যেহেতু বর্তমান সরকার গ্রেডের পরিবর্তনের বিষয়ে এখনও কোনো পরিকল্পনার কথা জানায়নি সে হিসেবে পূর্বের বেতন কাঠামোই আপাতত বহাল থাকবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
১১ থেকে ২০ গ্রেডে বাড়ছে টিফিন ভাতা
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সরকারি কর্মচারীদের মাসিক টিফিন ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেলে নির্ধারিত ২০০ টাকার টিফিন ভাতা নতুন পে স্কেলে এক হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ১১ থেকে ২০ গ্রেডভুক্ত সরকারি কর্মচারী এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এ সুবিধা পাবেন। এতে বর্তমান ভাতার তুলনায় ৫ গুণ বা ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটবে।
প্রস্তাবিত নতুন পে স্কেল চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা মাসিক এক হাজার টাকা হারে টিফিন ভাতা পাবেন।
নতুন কাঠামোতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতন যা থাকছে
নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের মধ্যে ১:৮ অনুপাতে পার্থক্য রাখা হয়েছে। বর্তমানে যা ১:৯.০৭৬। এর আগের বেতনকাঠামোতেও একই অনুপাত রেখেছিল কমিশনগুলো।
এছাড়া সব পর্যায়ে দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণের মতো মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে নতুন বেতন কাঠামোতে। এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডে বাড়ি ভাড়াসহ মূল বেতনের সঙ্গে সব ভাতা যোগ করে দাঁড়াবে ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা।
গ্রেড ১: ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
গ্রেড ২: ৬৬,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
গ্রেড ৩: ৫৬,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
গ্রেড ৪: ৫০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা।
গ্রেড ৫: ৪৩,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৬ হাজার টাকা।
গ্রেড ৬: ৩৫,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭১ হাজার টাকা।
গ্রেড ৭: ২৯,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৮ হাজার টাকা।
গ্রেড ৮: ২৩,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৭ হাজার ২০০ টাকা।
গ্রেড ৯: ২২,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা।
গ্রেড ১০: ১৬,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২ হাজার টাকা।
গ্রেড ১১: ১২,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা।
গ্রেড ১২: ১১,৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা।
গ্রেড ১৩: ১১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ হাজার টাকা।
গ্রেড ১৪: ১০,২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা।
গ্রেড ১৫: ৯,৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২ হাজার ৮০০ টাকা।
গ্রেড ১৬: ৯,৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৯০০ টাকা।
গ্রেড ১৭: ৯,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার ৪০০ টাকা।
গ্রেড ১৮: ৮,৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার টাকা।
গ্রেড ১৯: ৮,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ৫০০ টাকা।
গ্রেড ২০: ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা।
পে কমিশনের আলোচনায় বর্তমানে দুটি বিকল্প গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমটি হলো অধিকাংশ গ্রেডে মূল বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং দ্বিতীয়টি হলো ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন দ্বিগুণ করার ব্যবস্থা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, চতুর্থ গ্রেডের অধ্যক্ষদের বর্তমান ৫০ হাজার টাকার বেসিক বেড়ে ৭৫ হাজার টাকা হতে পারে। ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপকদের ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার বেসিক বেড়ে ৫৩ হাজার ২৫০ টাকা হতে পারে। সপ্তম গ্রেডের প্রধান শিক্ষক ও উপাধ্যক্ষদের ২৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং নবম গ্রেডের প্রভাষকদের ২২ হাজার টাকা থেকে ৩৩ হাজার টাকায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের জন্য আরও বেশি সুবিধার আলোচনা চলছে। ১১তম গ্রেডের শিক্ষকদের বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার বেসিক দ্বিগুণ হলে ২৫ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে। ১৬তম গ্রেডের অফিস সহকারীদের ৯ হাজার ৩০০ টাকার বেতন বেড়ে ১৮ হাজার ৬০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়কদের ৮ হাজার ২৫০ টাকার বেতন বেড়ে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা হতে পারে।
নবম পে স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো পেনশন কাঠামোর পরিবর্তন। বর্তমানে যেসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কম পেনশন পাওয়া লাখো অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি আর্থিকভাবে উপকৃত হতে পারেন।
এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। একই সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেটও এটি।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আগস্ট বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগলেও জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা কার্যকর হবে। পরে গেজেট প্রকাশ হলে চাকরিজীবীরা জুলাই থেকে বকেয়াসহ বর্ধিত সুবিধা পাবেন। সর্বশেষ, অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহণ ব্যয়সহ প্রায় সব খাতে ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে। এ কারণে নতুন পে স্কেলে নিম্ন আয়ের কর্মীদের বেতন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।










































