প্রচ্ছদ জাতীয় আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপি কি আদালতের ঘাড়েই বন্দুক রাখবে?

আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপি কি আদালতের ঘাড়েই বন্দুক রাখবে?

বেশি দিন আগের কথা নয়। গত বছর ১৫ মার্চ নতুন রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি’র এক শীর্ষ নেতা, হাসনাত আব্দুল্লাহ তার ফেসবুক পেজে একটি চমকপ্রদ পোস্ট দেন। “আওয়ামী লীগের চ্যাপ্টার ক্লোজড।”

হাসনাতের পোস্টে “ক্লোজড” শব্দটি ভুলভাবে লেখা হলেও, বার্তাটি স্পষ্ট ছিল— আওয়ামী লীগের দিন শেষ।

এনসিপি নেতার সেই পোস্টের পর এক বছরের কিছুটা বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে ‘ক্লোজড’ হওয়া তো দূরের কথা, আওয়ামী লীগ এখন ‘ভেরি মাচ ওপেন’ একটি টপিক।

ক্ষমতাচ্যুত হবার দুবছর এখনও পার হয়নি, কিন্তু এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ একটা অদ্ভুত অবস্থানে এসে ঝুলছে— রাজনীতির মাঠে দলটি নেই, কিন্তু দলটি নিয়ে আলোচনায় মাঠ সরগরম।

টেলিভিশন টকশোগুলোতে আওয়ামী লীগের কোনও প্রতিনিধি নেই, কিন্তু আলোচনা হচ্ছে দলটি নিয়ে। পত্র-পত্রিকায় আওয়ামী লীগের কোনও নেতার সাক্ষাৎকার বা প্রবন্ধ নেই, কিন্তু দলটি নিয়ে খবর, মতামত, বিশ্লেষণ চলছে অবিরাম (এই লেখাটিও তার আরেকটা প্রমাণ!)।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম ২০২৫ সালের ১০ মে এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। নিষেধাজ্ঞা আইনসিদ্ধ করার জন্য ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ, যেখানে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অর্থাৎ, বিএনপিও মনে করছে— আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখাই তাদের জন্য উপযুক্ত কৌশল।

হয়তো বিএনপির এই সিদ্ধান্ত কট্টরপন্থী জামায়াত এবং তাদের জোটসঙ্গী এনসিপির চাপে পড়েই নিতে হয়েছে। অথবা তারা হয়তো আসলেই মনে করছে— আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলে বিএনপির লাভ হবে, কারণ তখন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের জন্য বিএনপি ছাড়া আর কোনও গতি থাকবে না। তাদের আশা, প্রতিটি নির্বাচনই হবে ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারির মতো ধানের শীষের বিজয়োৎসব।

জাহেদ উর-রহমানের মন্তব্য

আওয়ামী লীগ নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ দিয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর-রহমানের একটি কথা। হতে পারে, তাঁর কথার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বা তাঁর কথার মাঝে অতিরিক্ত ‘ইঙ্গিত’ খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কথা যে আলোচনায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নাই।

ড. রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন যে, ‘‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত কেউ ব্যক্তিগতভাবে দাঁড়াতে চাইলে কোনও বাধা থাকবে না— যদি তিনি নির্বাচনে দাঁড়ানোর সব শর্ত পূরণ করেন।’’ তাঁর এই কথাকে অনেকেই আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরিয়ে আনতে সরকারের ‘পরিকল্পনার’ আভাস হিসেবে দেখেন।

তবে ড. রহমান তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে এই কথিত ‘পরিকল্পনার’ সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে, যেটা মূলত ইউনূস সরকারেরই কথা।

তাঁর এই কথার মধ্যে দিয়ে একটি জিনিস পরিষ্কার হয়েছে, আর তা হলো আওয়ামী লীগের প্রতি বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ইউনূস সরকার বা জামায়াত-এনসিপির দৃষ্টিভঙ্গির খুব একটা তফাত নেই।

এখানে একটা গ্রুপ, যেমন- জামায়াত এবং ধর্মীয় উগ্রবাদী কিছু সংগঠন সম্ভবত আদর্শের দিক থেকে আওয়ামী-বিহীন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। তারা পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য নেতৃত্ব দেওয়ায় আওয়ামী লীগকে কখনোই ক্ষমা করতে পারেনি।

ছাত্রদের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান আওয়ামী লীগকে চিরতরে কবর দেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ এই ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাছে এনে দেয়। মুহাম্মদ ইউনূস এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন।

বিএনপির স্বার্থ কোথায়?

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেটা ইউনূসের আমলেই হয়েছিল। বিএনপি অনেক ক্ষেত্রেই ইউনূস সরকারের কার্যক্রমের ‘কন্টিনিউইটি’ বজায় রাখছে এবং ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলাগুলো সেই নীতির উৎকৃষ্ট এক উদাহরণ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইউনূস সরকার এবং ট্রাইব্যুনালে তাদের নিয়োগ করা আইনজীবীদের যেরকম প্রতিশোধ-পরায়ণ বলে মনে হয়েছিল, বিএনপি সরকারের নিয়োগ করা আইনজীবীরাও কি একই পথে হাঁটছেন?

বিএনপির বিষয়টা আদর্শগত হতে পারে না। আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, আদর্শিক শত্রু নয়। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং জেনারেল জিয়ার ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ নিয়ে বিএনপি আর আওয়ামী লিগের মধ্যে প্রবল মতবিরোধ আছে ঠিকই। কিন্তু ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি কেন ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে নতুন করে লেখার চেষ্টা করে, সেটা বোঝা মুশকিল। অন্যদিকে, স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আদর্শ এবং অস্তিত্বের জন্য ১৯৭১ যে বিশেষ গুরুত্ব পাবে, তা বলাই বাহুল্য।

বিএনপি যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে যে, আগে ট্রাইব্যুনালে বিচার, তারপর আওয়ামী লীগের ফেরা বা না ফেরা নিয়ে আলোচনা, তাহলে প্রশ্ন আসবে— বিএনপি এই মামলা কীভাবে পরিচালনা করতে চায়। সরকার কি আওয়ামী লীগকে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করবে, নাকি একটি ‘নির্দোষ’ রায়ে তাদের কোনও আপত্তি থাকবে না?

আইনের শাসন, আদালতের স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে যে যত বুলিই আওরাক না কেন, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলায় সরকারের স্বার্থ যে বড় প্রভাব রাখে, তা অনস্বীকার্য।

ড. জাহেদ উর-রহমান শুধু তথ্য উপদেষ্টা নন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পলিসি এবং স্ট্রাটেজি উপদেষ্টাও বটে। অর্থাৎ, তাঁর কথায় যে সরকারের নীতির প্রতিফলন হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে তাঁর কথায় আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হলো। একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত সরকার আদালতের কোলে উঠিয়ে দিয়েছে। এর কারণ হতে পারে যে, বিএনপি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কথা অনুযায়ী, বিএনপি একটি ‘উদারপন্থী গণতান্ত্রিক দল।’ কিন্তু একটি বৃহৎ দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত, না হবে উদারপন্থী, না গণতান্ত্রিক। কিন্তু আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে সরকারকে জামায়াত-এনসিপির রোষানলে পড়তে হবে।

আদালতের দোহাই

বিএনপি এখন আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গুলি করতে চাইছে। ঠিক যেভাবে শেখ হাসিনা ২০১১ সালে উচ্চ আদালতের রায়ের কথা বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কারণ রাজনিতিকরা স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, তাদের দ্বারা সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। এই ব্যবস্থা বাতিলের রাজনৈতিক দায় এড়াতে হাসিনা আদালতের রায়ের দোহাই দেন।

আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপি এখন একই পথে হাঁটছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের নির্বাহী আদেশ, অধ্যাদেশ জারি এবং অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন— এই পুরো প্রক্রিয়া ছিল রাজনৈতিক। অথচ, আওয়ামী লীগের স্থায়ীভাবে ফেরা বা না ফেরার সিদ্ধান্ত বিএনপি নেবে আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে।

বিএনপির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, আদালতের রায়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আওয়ামী লীগ আকাশ থেকে পড়া কোনও দল নয়। বাংলাদেশ নামক দেশের জন্ম হয়েছে ৭৭ বছরের এই দলের হাতে। এই দলকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার অর্থ হবে দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া।

অন্যদিকে, আদালতের রায় আওয়ামী লীগের অনুকূলে গেলে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার কোনও ভিত্তি থাকবে না। তখন বিএনপিকে মোকাবিলা করতে হবে জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য উগ্রবাদী গোষ্ঠীর। আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে জামায়াত-এনসিপির সংঘাতও অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

আওয়ামী লীগ ট্রাইব্যুনালে মামলা কীভাবে লড়বে, বা আদৌ লড়বে কিনা, তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু আগামী দিনগুলোতে দলটি মাঠে তাদের কার্যক্রম— নিষিদ্ধ এবং বেআইনি হলেও, আরও জোরদার করার চেষ্টা করবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রমাণ

তবে, যত দিন নিষেধাজ্ঞা থাকবে, তত দিন প্রকাশ্য কার্যক্রম নেতাকর্মীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে— একদিকে পুলিশের অ্যাকশন, গ্রেফতার ইত্যাদি। অন্যদিকে পুলিশের ছত্রছায়ায় বিএনপি বা জামায়াত-এনসিপির হামলার আশঙ্কা। আওয়ামী লীগ যদি বিএনপিকে কার্যকর কোনও বার্তা দিতে চায়, তাহলে এই ঝুঁকি মাথায় নিয়েই দিতে হবে।

এক ধরনের বার্তা ইতোমধ্যেই দেওয়া হচ্ছে। এক সময়ের অগ্নিঝরা বক্তা তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেছেন। কোনও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা মিডিয়া হাইপ ছাড়াই তাদের জানাজায় যে ব্যাপক জনসমাগম হয়েছে, তা দেখে অনেকেই অবাক হয়েছেন। এই জনসমাগম আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, অথবা প্রয়াত নেতাদের প্রতি সম্মান দেখানতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের রাজনীতি, শেষ বিচারে, সংসদ বা আদালত নিয়ন্ত্রণ করে না। নিয়ন্ত্রণ করে রাজপথ। আর, প্রয়োজন মতো, ক্যান্টনমেন্ট। তবে ১৯৯০ এবং ২০২৪-এর দুই অভ্যুত্থান প্রমাণ করে যে, ক্যান্টনমেন্টও তাদের দিক-নির্দেশনা নেয় রাজপথের মতি-গতি দেখে। যেকথা অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ডিপ স্টেট কখনও স্রোতের বিপরীতে যায় না।’

এখনও পর্যন্ত, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, সন্দেহ আছে। এই প্রশ্ন এবং সন্দেহ দূর না করা পর্যন্ত অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা ক্যান্টনমেন্ট, কেউই আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে সিরিয়াসলি নেবে বলে মনে হয় না।

লেখক: বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান। বর্তমানে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও পডকাস্টার