
চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময়ও হয়তো ভাবেননি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হবে। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা একজন ক্রিকেটার হয়েও তাকে শুনতে হবে—‘তুই আসামি, তুই চুপ।’
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের অফ স্পিনার নাঈম হাসান। একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম। আমার পরিচিত মানুষ ছিল, ফোন গেছে, অনেকে খোঁজ নিয়েছে। কিন্তু এ ঘটনা যদি কোনো সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘটত, তাহলে তার কী হতো?’
নাঈমের প্রশ্নটি শুধু তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নয়; এটি যেন সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে একটি বড় প্রশ্নও তুলে দেয়।
জাতীয় দলের এই ক্রিকেটারের ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে শুক্রবার রাতে নগরের লালখানবাজার এলাকায় পৌঁছানোর পর তাকে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। তিনি সহযোগিতা করলেও পরিচয় দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে তাকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলে তা আমলে নেওয়া হয়নি।
নাঈম বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি আমি জাতীয় দলের ক্রিকেটার। কিন্তু কেউ শুনতে চায়নি। উল্টো আমাকে আসামি বলা হয়েছে। পরে থানায় নিয়েও হেনস্তা করা হয়েছে।’
থানায় বসে যখন একের পর এক ফোন আসতে শুরু করে, তখন পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। পুলিশ বুঝতে পারে, যাকে সন্দেহভাজন হিসেবে ধরে আনা হয়েছে, তিনি দেশের পরিচিত একজন ক্রিকেটার। কিন্তু নাঈমের মনে তখন অন্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমি তো শেষ পর্যন্ত নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে পেরেছি। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, যার জন্য ফোন করার কেউ নেই, পরিচয় দেওয়ার মতো পরিচিতি নেই, তাহলে তিনি কীভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন?’
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো নাঈম নিজেও জানেন না। তবে তার অভিজ্ঞতা নতুন করে সামনে এনেছে আরেকটি বাস্তবতা—ভুল তথ্য, অতিউৎসাহী অভিযান কিংবা পরিচয় যাচাইয়ের ঘাটতির শিকার শুধু একজন জাতীয় ক্রিকেটার নন; প্রতিদিন অনেক সাধারণ মানুষও হতে পারেন।
নাঈমের চোখের জল তাই কেবল একজন ক্রিকেটারের অপমানবোধের প্রকাশ নয়; সেটি যেন সেইসব অচেনা মানুষের পক্ষ থেকেও উচ্চারিত একটি প্রশ্ন, যাদের গল্প কখনো শিরোনাম হয় না।
‘আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম। কিন্তু সাধারণ মানুষ হলে কী হতো?’—চট্টগ্রামের একটি থানায় ঘটে যাওয়া এক রাতের ঘটনা শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নই রেখে গেল।
পুলিশের দাবি, ‘চোরাচালানের তথ্য’ পেয়ে অভিযান। ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। নগর পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। তবে তথ্য যাচাইয়ে ভুল এবং দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।
খুলশী থানার ওসি আরিফুল ইসলাম বলেন, পুরো ঘটনার জন্য মূলত দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই দায়ী। একটি সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে থানার সেকেন্ড অফিসার জানতে পারেন যে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চোরাচালানের মালামাল সরবরাহ করা হচ্ছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই এসআই শফিক অভিযান পরিচালনা করেন।
ওসি বলেন, ‘তথ্য ছিল যে একটি সিএনজির মাধ্যমে চোরাচালান সরবরাহ করা হচ্ছে। যেহেতু তথ্যটি একটি সংস্থার কাছ থেকে এসেছিল, তাই এসআই শফিক সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালান। কিন্তু তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই নাঈম হাসানকে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে আসেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘থানায় আনার পর আমি তাকে দেখে চিনতে পারি। তখনই বুঝতে পারি ভুল হয়েছে। এরপর সঙ্গে সঙ্গে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’
ওসির ভাষ্য অনুযায়ী, পরদিন সকালে নাঈম হাসানের ব্যাগ ও ব্যক্তিগত মালপত্রও তল্লাশি করা হয়। তবে সেখানে কোনো ধরনের অবৈধ বা সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বলে জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। একজন নিরপরাধ মানুষ, বিশেষ করে জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়ার পর আমি থানায় গিয়ে প্রাথমিক তদন্ত করেছি। তদন্তে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ভুলের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট এসআইকে ক্লোজ করা হয়েছে।’
ডিসি আরও বলেন, ‘বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দায়িত্বহীনতা বরদাশত করা হবে না।’
পুলিশের এই বক্তব্যের মধ্যেই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—যদি শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের পরিচিত ক্রিকেটার নাঈম হাসানকেই যাচাই ছাড়া চোরাচালানের সন্দেহে থানায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এমন ভুলের ঝুঁকি কতটা? সেই প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে অনেকেই।












































