
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিজেপিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। সোমবার (৮ জুন) দুপুর ১২টার দিকে দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে শুরু হওয়া এই বৈঠকে জোটের ২৫টি শরিক দল অংশ নেয়। বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে বিরোধী ঐক্য আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। একইসঙ্গে বৈঠকে ‘ভোট লুটের’ অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দেয়াসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট ও ভাঙনের জল্পনাও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
সোমবারের এই বৈঠকে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি (এসপি), তৃণমূল কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি), ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম), সিপিআই(এম), সিপিআই, আরএসপি, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ, কেরালা কংগ্রেস, ন্যাশনাল কনফারেন্স, লোক দল, ফরওয়ার্ড ব্লক, রাষ্ট্রীয় লোকতান্ত্রিক পার্টি, এনসিপি (শারদ পাওয়ার), শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)সহ ২৫টি জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল অংশ নেয়।
তবে ডিএমকে ও আম আদমি পার্টি বৈঠকে অংশ নেয়নি। মূলত সম্প্রতি তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়ের দল টিভিকেকে সমর্থন দেয়ার কারণে আগেই বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দেয় ডিএমকে। অন্যদিকে জোটে থাকলেও রাজ্যসভার আসন বণ্টন নিয়ে কংগ্রেসের ওপর ক্ষুব্ধ জেএমএমও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সিপিআই(এম) বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও আগে থেকেই এ নিয়ে কড়া চিঠি দিয়েছিল।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, ওমর আবদুল্লাহ, তেজস্বী যাদব, অখিলেশ যাদব এবং তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ জোটের শীর্ষ নেতারা।
বৈঠক শেষে জোটের আহ্বায়ক মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ‘ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক অত্যন্ত সফল হয়েছে। ২৫টি দলের শীর্ষ নেতারা এতে অংশ নিয়েছেন এবং সবাই গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা পাঁচটি বিষয়ে একমত হয়েছি। আগামী দিনে এই ইস্যুগুলো সামনে রেখেই আমরা একসঙ্গে আন্দোলন ও রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাব।’
বৈঠকে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার অভিযোগ তোলেন খাড়গে। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ওপর আক্রমণ এখনও অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের ভয় দেখাতে এবং তাদের কণ্ঠরোধ করতে ইডি, সিবিআইসহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’
খাড়গের দাবি, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পররাষ্ট্রনীতিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই মোদি সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী জোটের ঐক্য আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
বৈঠকে যে পাঁচটি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—
১. বিরোধী জোটের সদস্যরা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে চিঠি পাঠাবেন। চিঠিতে এসআইআর প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ত্রুটি এবং ‘ভোট লুট’-এর অভিযোগ তুলে ধরা হবে।
২. নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সিবিএসই পরীক্ষায় ওএসএম পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের বিষয়টি গুরুত্ব পায় বৈঠকে। এ কারণে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করা হবে।
৩. ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং কৃষকদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে দ্রুত সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দেয়া হবে।
৪. আগামীতে ইন্ডিয়া জোটের শরিকরা প্রতি দুই মাস অন্তর বৈঠক করবে। পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৮ আগস্ট হায়দরাবাদে।
৫. সংসদের আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশন চলাকালে ইন্ডিয়া জোটের সদস্যরা প্রতিদিন সকালে বৈঠক করবেন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে সংসদে অংশ নেবেন।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর এই প্রথম ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে অংশ নিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে বৈঠক শেষে এখন পর্যন্ত মমতার কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরুর আগেই জোটের নেতারা উঠে যান। সে সময় দেখা যায়, সবার আগে বৈঠকস্থল ত্যাগ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালে ইন্ডিয়া জোটে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখার চেষ্টা করলেও এদিন তিনি পুরো সংবাদ সম্মেলনজুড়ে নীরব ছিলেন।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে। বিধানসভার পর লোকসভাতেও দলটি বিভক্ত হওয়ার আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে অংশ নিতে হলেও রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। রাজনৈতিক মহলের মতে, জোটের বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও দলের অভ্যন্তরীণ সংকট তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।








































