প্রচ্ছদ জাতীয় যেভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ

যেভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ কূটনৈতিক বিজয়। অত্যন্ত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক নির্বাচনে ৯৯-৯১ ভোটে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে ঢাকার এ জয় কেবল একটি বৈশ্বিক পদপ্রাপ্তি নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার এক অনন্য দলিল। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই এক বছর মেয়াদে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ঠিক কতটা কূটনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে কূটনৈতিক মহলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু সংকটের এ জটিল সন্ধিক্ষণে জাতিসংঘের ‘বিশ্ব সংসদ’ খ্যাত ফোরামের এ পদের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

বিশ্বমঞ্চে এজেন্ডা নির্ধারণের অভূতপূর্ব সুযোগ: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির অন্যতম প্রধান ক্ষমতা হলো—অধিবেশনের মূল আলোচ্যসূচি বা ‘এজেন্ডা’ নির্ধারণ করা। বাংলাদেশ এখন বিশ্বমঞ্চের চালকের আসনে। ড. খলিলুর রহমান এরই মধ্যে তার মেয়াদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন, এসডিজি বাস্তবায়ন, উদীয়মান প্রযুক্তির (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) শাসন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের মতো ৬টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র ঘোষণা করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারবে, যা সাধারণ সময়ে অন্য কোনো ফোরামে এত বড় পরিসরে করা সম্ভব হতো না।

রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণ: বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বাংলাদেশের অবস্থান এ সংকটকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করার মোক্ষম সুযোগ দেবে। যদিও সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবগুলো নিরাপত্তা পরিষদের মতো বাধ্যতামূলক নয়, তবে সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারবে।

নতুন জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনে কৌশলগত প্রভাব: ড. খলিলুর রহমানের এ ঐতিহাসিক মেয়াদটি একটি বিশেষ কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সভাপতিত্বেই জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের চূড়ান্ত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে। বিশ্ব সংস্থার পরবর্তী শীর্ষ নেতা কে হবেন—সেই প্রক্রিয়ায় সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা থাকবে অত্যন্ত জোরালো। এর ফলে হবু মহাসচিব এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে, যার দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাবে ঢাকা।

জলবায়ু কূটনীতি ও বৈশ্বিক তহবিলের সুবিধা: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী দেশ এবং বৈশ্বিক ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর অন্যতম জোরালো কণ্ঠস্বর। সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল দ্রুত ছাড় করার বিষয়ে উন্নত দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারবে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবস্থান সুদৃঢ়করণ: বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষ সেনা প্রেরণকারী দেশগুলোর অন্যতম। ড. খলিলুর রহমান তার বক্তৃতায় বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ‘প্রতিরোধমূলক কূটনীতি’ ও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। এই সভাপতির পদ ব্যবহার করে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং শান্তিরক্ষীদের বাজেট ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা চালানো সম্ভব হবে।

চ্যালেঞ্জ এবং দূরদর্শী কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা: সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনি এই শীর্ষ পদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিশাল বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা। সভাপতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে পারেন না; তাকে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ অভিভাবক হতে হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট বা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার তীব্র ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এ সময়ে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বিশ্ব সংস্থাকে নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। ঢাকা যদি সফলভাবে এ ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ঢাকার ভাবমূর্তি বহুগুণ উজ্জ্বল হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও ‘সফট পাওয়ার’কে এক ধাক্কায় অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে।

সূত্র : কালবেলা