প্রচ্ছদ অপরাধ ও বিচার ইউনূসের গোমর ফাঁস করছেন সাবেক উপদেষ্টা!

ইউনূসের গোমর ফাঁস করছেন সাবেক উপদেষ্টা!

কিছু মানুষকে অল্পদিন বোকা বানিয়ে রাখা যায়। কিন্তু সব মানুষকে চিরদিন বোকা বানিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

এই সত্যি যেন আবার প্রমাণিত হচ্ছে। গত দেড় বছর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের দায়িত্ব নিয়ে কী করেছেন, তার সব অন্ধকার অধ্যায় একে একে উন্মোচিত হচ্ছে। দেশ বদলের অঙ্গীকার করে তিনি শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেননি, দেশও বিক্রি করে দিয়েছেন। তার চেয়েও বড় কথা, যারা তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল তাদেরও বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন ড. ইউনূস।

ইউনূস তার দেড় বছরের শাসনে নিজেকে ছাড়া সবাইকে ধোঁকা দিয়েছেন।
নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র তিন মাসের মধ্যে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা একে একে ইউনূসের গোমর ফাঁস করে দিচ্ছেন। যার সর্বশেষ সংযোজন হলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি রীতিমতো হাটে হাঁড়ি ভেঙেছেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে সই হওয়া ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তিটি সইয়ের বিষয়ে বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতে সামান্যতমও যুক্ত ছিল না। এটাতে যুক্ত ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। কোনো কারণ হয়তো ছিল পেছনে, যে জন্য আমরা বাধ্য ছিলাম। কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে সই করার বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যথাযথ হতো।’
তৌহিদ হোসেনের এই বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ ড. ইউনূস করেননি।

এই বক্তব্য সঠিক হলে, ইউনূস রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যূনতম শিষ্টাচার ও রুলস অব বিজনেস মানেননি। উপদেষ্টামণ্ডলীকে অন্ধকারে রেখে তিনি এ ধরনের একটি চুক্তি করার নৈতিক ও আইনগত অধিকার রাখেন কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। কারণ, এর আগে ইউনূসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং কিচেন ক‍্যাবিনেটের সদস্য আসিফ নজরুল দাবি করেছিলেন যে এই চুক্তির বিষয়ে ইউনূস তাকে ডাকেননি। আরেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার দাবি করেছেন, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। কিন্তু চুক্তি ঠেকাতে পারেননি। এসব বক্তব্য একসঙ্গে যোগ করলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, ড. ইউনূস সরকার পরিচালনায় কারো মতামত তোয়াক্কা করেননি। বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে যা খুশি তা-ই করেছেন।
দ্বিতীয়ত, যেসব উপদেষ্টা এখন ইউনূসের অপকর্মের ফিরিস্তি দিচ্ছেন, তারাও এসব কাজের জন্য দায়ী। কারণ তখন যদি তারা এর প্রতিবাদ করতেন, জনগণের কাছে সত্যিটা তুলে ধরতেন, তাহলে জনগণ তাদের সততা ও নৈতিকতার প্রশংসা করত। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদে থেকে এর দায় এড়ানোর চেষ্টা শুধু তাদের দ্বৈত নীতির প্রমাণ নয়, সুবিধাবাদী চরিত্রেরও প্রকাশ। হালুয়া রুটির ভাগ পেতেই তারা তখন নীরব ছিলেন।

শুধু বাণিজ্য চুক্তি নয়, হামে শিশু মৃত্যু নিয়েও ইউনূসের সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতার পর্দা ফাঁস করে দিয়েছে ইউনিসেফ। ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অন্তত পাঁচটি চিঠিতে সম্ভাব্য টিকা-সংকটের কথা বলে সতর্ক করেছিল। তারা ১০টি মিটিংয়ে সরকারের কর্মকর্তাদের কাছে একই কথা জানিয়েছিল। ইউনিসেফ মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনায় দেশে সময়মতো টিকা আসেনি। সম্প্রতি, ইউনিসেফ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।

ইউনূস দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীরা তার নিয়োগকর্তা। অনেকই মনে করেন, ইউনূসই তাদের রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু এখন পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। জুলাই আন্দোলনের পর, শিক্ষার্থী এবং দেশের অভিভাবক হিসেবে তার প্রধান দায়িত্ব ছিল দেশে বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ইউনূস তার নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ছাত্রদের ব‍্যবহার করেছেন। তাদের নিজের মাসল বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে তিনি বিরুদ্ধমতকে দমন করার জন্য এসব শিক্ষার্থীকে মাঠে নামিয়েছিলেন। অথচ একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল, শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু ইউনূস নিজের স্বার্থে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের ব্যবহার করে, তাদের ইমেজ নষ্ট করেছেন। ইউনূস তাদের হাতে বইয়ের বদলে টেন্ডার আর টাকা তুলে দিয়েছিলেন। আজ জুলাই আন্দোলনের মাত্র দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে আন্দোলনকারীদের ইমেজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ইউনূসের কারণে। এখন যখন এইসব তরুণ নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত তখন ইউনূস নীরব। এনসিপি এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য ইউনূসকে মাঠে নামার আহ্বান জানান। কিন্তু নাহিদ ইসলামের ডাকে সাড়া দেননি ইউনূস।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দিয়ে ইউনূস বিএনপির প্রতি সুবিচার করেছেন বলে যারা মনে করেন, তারাও ভুলের রাজ‍্যে বসবাস করছেন। কারণ ইউনূস শেষ পর্যন্ত নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছেন। পর্দার আড়ালে তার আসল নিয়োগ কর্তারা তাকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছেন। কারণ ইউনূসকে দিয়ে তাদের যা যা করার পরিকল্পনা ছিল তার সব কিছুই হয়েছে। কিন্তু বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে এক গভীর সংকটের মধ্যে। দেশের অর্থনীতিকে ইউনূস ভয়াবহ খারাপ অবস্থায় নিয়ে গেছেন। বেসরকারি খাত মুখ থুবড়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউনূস শাসনামলে। এমনকি প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কও তলানিতে এসে দাঁড়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃঙ্খলা, সমাজ, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম—সর্বত্র এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ইউনূস নির্বাচন দিয়েছে। নতুন সরকার যেন এক মহাসমুদ্রে পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

দেড় বছর ইউনূস শুধু নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন। তার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আয়কর মওকুফ করিয়েছেন। দুর্নীতির মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, যা পেয়েছেন দুই পকেট ভর্তি করে নিয়েছেন। নিজের ছাড়া সবার ক্ষতি করেছেন ইউনূস। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন বাংলাদেশের। এককথায় বলা যায়, শান্তিতে নোবেলজয়ীর একটাই লক্ষ্য ছিল—ওলোটপাল্ট করে দে মা লুটেপুটে খাই।
সূত্র :কালেরকন্ঠ