
প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে দ্রুত গতিতে শক্তি সঞ্চয় করছে এল নিনো। আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, চলতি বছরের শরৎ বা শীতের মধ্যেই এটি ‘সুপার এল নিনো’য় রূপ নিতে পারে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের সর্বশেষ হালনাগাদে বলা হয়েছে, এল নিনো ‘শক্তিশালী’ বা ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ হওয়ার সম্ভাবনা এখন দুই-তৃতীয়াংশ।
কী এই এল নিনো?
এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ হয়ে উঠলে এবং বায়ুমণ্ডলের বায়ুপ্রবাহে পরিবর্তন এলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বের আবহাওয়ায়—কোথাও বাড়ে খরা ও তাপপ্রবাহ, বাড়ে দাবানল ও পানির সংকট; আবার অন্য কোথাও অতিবৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া আটলান্টিক মহাসাগরের ঘূর্ণিঝড় মৌসুম দুর্বল করে এল নিনো। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে।
‘সুপার এল নিনো’ কখন হয়?
সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয় এবং এটি স্থায়ী হয় ৯ থেকে ১২ মাস। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের একটি অংশের পানির তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে মাপা হয় এর তীব্রতা। গড় তাপমাত্রার তুলনায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে দুর্বল এল নিনো ধরা হয়। আর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি ছাড়ালে তাকে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ বা ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়।
বর্তমানে পানির গড় তাপমাত্রা ০.৫ ডিগ্রির সামান্য নিচে রয়েছে। তবে ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের সবশেষ মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী মাসেই এটি সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে। গ্রীষ্ম ও শরৎ জুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হবে এবং শীত পর্যন্ত স্থায়ী হবে—এমন সম্ভাবনা ৯৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলের গভীরে বিপুল পরিমাণ উষ্ণ পানি জমেছে, যা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসবে এবং এল নিনোকে আরও সক্রিয় করবে।
বাড়ছে ‘সুপার’ হওয়ার সম্ভাবনা
ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার বলছে, এল নিনো আসছে—এই পূর্বাভাসে আবহাওয়াবিদরা আত্মবিশ্বাসী। তবে সর্বোচ্চ শক্তি কত হবে তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে ‘সুপার এল নিনো’ আঘাত হানার সম্ভাবনা গত মাসে ছিল ২৫ শতাংশ, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে।
কেন্দ্রের বিজ্ঞানী মিশেল ল’হ্যুরো জানান, নিরক্ষীয় অঞ্চলের বাতাস দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রের তাপমাত্রা একসঙ্গে বাড়লে আরও শক্তিশালী এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে।
নির্ভরযোগ্য কিছু কম্পিউটার মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, চলতি বছরের সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনো’ ইতিহাসের সর্বোচ্চ শক্তিশালী হতে পারে। এর আগে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোটি ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। এ ছাড়া ১৯৯৭-৯৮, ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৭২-৭৩ সালেও ‘সুপার এল নিনো’ দেখা গিয়েছিল।
বিশ্বের কোথায় কী প্রভাব?
ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের পরিবর্তন: শক্তিশালী এল নিনোর কারণে আটলান্টিক অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও ঝড়ের সংখ্যা কমতে পারে। তবে বিপরীতে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে বেশি ঝড় হতে পারে, যা হাওয়াই ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঝুঁকি বাড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চল থেকে পশ্চিম কানাডা ও আলাস্কায় শীত তুলনামূলক উষ্ণ হয়; তবে মাঝেমধ্যে তীব্র শীতও দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বেশি বৃষ্টি ও তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়া দেখা যায়।
ভেজা, শুষ্ক ও চরম তাপমাত্রা: ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বৃষ্টি কমতে পারে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে বাড়ে খরার আশঙ্কা। দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে শীত উষ্ণ ও শুষ্ক হতে পারে। দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মে (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি) দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকায় খরা পরিস্থিতি তীব্র হতে পারে।
বাড়বে বৈশ্বিক তাপমাত্রা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়বে এবং ২০২৬ বা ২০২৭ সাল হতে পারে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। এনওএএ জানিয়েছে, চলতি বছর ইতিমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ পাঁচ বছরের একটি হওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই বেশি’।
সূত্র: সিএনএন













































