
একদিকে ছেলে-মেয়ের নিথর দেহ, অন্যদিকে নাতি-নাতনিদের নির্মম মৃত্যু- সব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ফিরোজা বেগম (৬০)। বুক চাপড়ে, বিলাপ করে তিনি শুধু বলছিলেন, আমার বাবারে মাইরা ফ্যালাইছে। আমার কলিজারে শেষ কইরা দিল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো রে আল্লাহ…। সন্তান-নাতি হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শারমিনের মা ফিরোজা বেগম।
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। হত্যার ঘটনার খবর আসার পরপরই মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজনের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস।
পরিবারের অভিযোগ, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জের ধরে স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে গলা কেটে হত্যা করেছে ফোরকান মোল্লা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শাহাদাত-ফিরোজা দম্পতির চার মেয়ে তিন ছেলে (সাত ছেলে মেয়ের) মধ্যে শারমিন আক্তার তৃতীয় ও রসুল মোল্লা সবার ছোট। বড় মেয়ে বিয়ের কয়েক বছর পর মারা যায়।
কাপাসিয়ায় স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে নৃশংসভাবে হত্যার পর মরদেহের পাশে একটি লিখিত অভিযোগপত্র (জিডির কপি) পাওয়া যায়। ওই কাগজে ঘাতক ফোরকান মোল্লা তার স্ত্রী শারমিনের বিরুদ্ধে পরকীয়া এবং তার শ্যালকের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছিলেন বলে জানা যায়। তবে এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে মুখ খুলেছেন গোপালগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আনিসুর রহমান। তিনি জানান, স্ত্রীকে দায়ী করে নিহতদের পাশে যে জিডির কপি পাওয়া গেছে তা সঠিক নয়। এমন কোনও জিডি গোপালগঞ্জ সদর থানায় হয়নি বলে জানান তিনি।
আনুমানিক ২০ বছর আগে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ি গ্রামের আতিয়ার মোল্লার ছেলে ফোরকান মোল্লার সঙ্গে ওই উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের শাহাদাত মোল্যার মেয়ে শারমিনের সঙ্গে সামাজিকভাবে বিয়ে হয়। কয়েক বছর শ্বশুরবাড়ি থাকার পর দাম্পত্য কলহ শুরু হলে শারমিনকে নিয়ে প্রথমে ঢাকা ও ছয় মাস আগে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় যায় ফোরকান। এ সময় নিজের প্রাইভেটকার চালিয়ে সংসার চালাত সে। রসুল মোল্লা তার বড় বোন ফাতেমা বেগমের বাসায় থেকে গাজীপুরের একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন।
এক বছর আগে পারিবারিক কলহ হলে শারমিন বাবার বাড়িতে চলে আসে। পরে ফোরকান শ্বশুরবাড়ির লোকদের বুঝিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানকে ফিরিয়ে নেয়। শুক্রবার ফোরকান মোল্লা চায়না কোম্পানিতে চাকরি দেয়ার কথা বলে শ্যালক রসুলকে ও ভাগনে রকিবকে তার ভাড়া বাসায় আসতে বলে। কিন্তু শ্যালক রসুল গেলেও ভাগনে গোপালগঞ্জ চলে আসে।
পরে শনিবার ভোরে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় রাউৎকোনা গ্রামের ফোরকান মিয়ার ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে গলা কেটে হত্যা করে। নিহতরা হলেন- গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের পাইকান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাত মোল্লার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩০) ছেলে রসুল মোল্লা (১৮), শারমিনের তিন মেয়ে মিম আক্তার (১৪), হাবিবা (১০), ফারিয়া (২)।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শারমিনের মা ফিরোজা বেগম বলেন, আমার বাজান নতুন জামা-প্যান্ট কিনছে। সেই জামা পরে হাসতে হাসতে বোনের বাসায় গেছে। কে জানত, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া! আমার রসুল আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন। তোরা আমার রসুলরে আইনা দে…। এ কথা বলেই আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পাশে থাকা স্বজনেরা তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সন্তানের শোকে মুহূর্তেই আবার ভেঙে পড়েন এই মা।
নিহত শারমিন ও রসুলের চাচা খবির মোল্লা বলেন, বাব-মায়ের সামনে সন্তানদের মেরে ফেললে বাবা-মা কিভাবে বেঁচে থাকে। আমার ভাই গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার)। অনেক কষ্ট করে অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে সন্তানদের বড় করেছে। রসুল মোল্লা গাজীপুরে একটি পোশাক তৈরি কারখানায় চাকরি করতো। থাকতো বড় বোন ফাতেমার বাসায়। শুক্রবার রসুল শারমিনের বাসায় যাওয়ার পর রাত ৮টায় মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সবাই ভেবেছিলো ফোনে হয়তো চার্জ নেই। ভোর সাড়ে ৫টায় জামাইয়ের ভাই (ফোরকান মোল্লার ভাই) জব্বার মোল্লা কল করে বলে শারমিনের বাসার সবাই মারা গেছে। কিভাবে মারা গেলো জানতে চাইলে সে বলে, তার ভাই তাদের কল করে জানিয়েছে পরিবারের সবাইকে শেষ করে ফ্যালাইছি আমাকে খুঁজলে আমাকে পাওয়া যাবে না বলে ফোন কেটে দেয়।
তিনি আরও জানান, সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ সেই সন্তানকে বাবা হয়ে কিভাবে মারতে পারে? সেকি মানুষ? ওই খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করছি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ আনা হলে পাইকান্দি গ্রামে দাফন করা হবে।












































